বাংলাদেশ ০৬:০০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
নোটিশ :

সাংবাদিক নিয়োগ চলছে,, সাংবাদিক নিয়োগ চলছে,,০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০, ০১৭১২-৪৪৬৩০৬,০১৭১১-০০৬২১৪ সম্পাদক

     
ব্রেকিং নিউজ ::
মিরপুরে মোটরসাইকেলের তেলের ট্যাংকের ভেতর ফেনসিডিল সহ আটক-০১ শাশুড়িকে বাঁচাতে গিয়ে অন্তঃসত্ত্বা পুত্রবধূ ভেসে গেলেন হাওরের জলে। শিবপুরে স্মার্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কর্মচারী ফেডারেশনের সম্মেলন অনুষ্ঠিত কুষ্টিয়ায় দুই মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত-১, আহত-৩ বোয়ালখালীতে পুকুরে ডুবে যুবকের মৃত্যু এম.আই. টেলিভিশন’ এর ৩য় বর্ষপূর্তি উদযাপন একদফা দাবি নিয়ে আবারো রেললাইন অবরোধে রাবি শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করলো কুবির অর্থনীতি বিভাগ বিসিএস প্রশ্ন ফাঁস করে কোটি টাকার জমি কিনেছেন শাহাদাত আপন মামা কর্তৃক কিশোরী ভাগনীকে ধর্ষণ মামলার পলাতক প্রধান আসামী জগন্নাথ বিশ্বাসকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। ধনবাড়ীতে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ ৩ মাদক কারবারি আটক বিপুল পরিমাণে গাঁজাভর্তি ট্রাকসহ ০২শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব। বাবুগঞ্জে রাস্তার ভোগান্তিতে পথ চলা বন্ধ শিক্ষার্থীরা চরম দুর্ভোগে। রাজশাহীর বাগমারায় অনলাইন জুয়ার কালো থাবায় নিঃস্ব হচ্ছে তরুণ-যুব সমাজ ফেনী ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত 

সাংবাদিকতার বিষয় জানুন শিখুন – পর্ব -২

  • নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৩:২২:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মার্চ ২০২৪
  • ১৯৯৩ বার পড়া হয়েছে

 

 

 

 

 

সংবাদের কাঠামো

কয়েকটি উপাদান নিয়ে একটি সংবাদের কাঠামো গড়ে ওঠে। বিষয়গুলো হচ্ছে।

১. শিরোনাম বা হেডলাইন

২. সংবাদ সূচনা বা ইন্ট্রো বা লিভ

৩. সংবাদের বাকি অংশ বা বডি

৪. উপসংহার

হেডলাইন কী

হেডলাইন বা শিরোনাম হলো সংবাদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। সংবাদের ওপরে অল্প কথায় একটি সংবাদের বিষয়বস্তু (content) সম্পর্কে পাঠককে ধারণা দেয়া হয়ে থাকে। এটিই হেডলাইন। একে সংবাদের ‘বিজ্ঞাপন’ বলা যেতে পারে।

আরো সহজ কথায় শিরোনাম হলো সংবাদের ওপরে থাকা অল্প কথায় সংবাদটি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। একটি ইন্ট্রো বা লিড (সংবাদ সূচনা) যেমন কম কথায় পুরো সংবাদটির মূল কথাটি তুলে ধরে, শিরোনাম তেমনি আরো কম কথায় সংবাদের মূল বিষয়বস্তুটি পাঠককে জানিয়ে দেয়। ইন্ট্রোকে বলা হয় লিড (Lead) আর শিরোনামকে বলা হয় সুপারলিড (Superlead)। সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠাটিকে বলা হয় Show Window আর সেই Show Window এর মতোই শিরোনামও গুরুত্বপূর্ণ। শিরোনামের ব্যাপারে তাই বলা হয়: Headlines are the best samples of the best items।

সাংবাদিকতার বিষয় জানুন শিখুন – পর্ব -১

https://banglaralonews.com/archives/96981 

 

কেন হেডলাইন বা হেডলাইনের উদ্দেশ্য

সংবাদপত্রের ইতিহাস বা সংবাদের ইতিহাস যতোদিনের পুরনো, হেডলাইন বা শিরোনাম ততোটা পুরনো নয়। সাংবাদিকতার একেবারে শুরুর দিকে সংবাদের সঙ্গে কোনো শিরোনাম লেখার চল ছিলো না, শুধু খবরগুলো একের পর এক পাতায় বসিয়ে ছাপা হতো। কিন্তু ক্রমেই সংবাদের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন পড়লো, সংবাদের পাঠক বাড়লো।

সেই সঙ্গে দেখা দিলো খবরগুলোকে পাঠকের সামনে আলাদা করে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা। দিন দিন পাঠকের ব্যস্ততা আর রুচি ও আগ্রহের ভিন্নতার কদর বাড়তে লাগলো। আর এসব কারণে প্রতিটি সংবাদকে আলাদা ও সুবিন্যস্ত করে ছাপাবার প্রয়োজনও বাড়তে লাগলো। এসব প্রয়োজন মেটানোর তাগিদের সঙ্গে সঙ্গে প্রচলন হলো শিরোনামের। অল্প কথায় একটি ঘটনা জানিয়ে দেয়া থেকে শুরু করে পৃষ্ঠাসজ্জায় নান্দনিকতা আনা এই সব ধরনের প্রয়োজনই মেটাতে লাগলো সংবাদের শিরোনাম।

বলা হয়ে থাকে The main objective of headline is to tell and to sell। অর্থাৎ রংশ্লিষ্ট সংবাদটিতে কী আছে তা অল্প কথায় বলে দেয়া ও পাঠককে ওই সংবাদটি স্বর্ণার আকৃষ্ট করার মাধ্যমে পত্রিকার কাটতি বাড়ানো এটি হচ্ছে শিরোনামের মূল উচ্ছে পাঠো কাজ। শিরোনাম লেখার উদ্দেশ্য কী অর্থাৎ শিরোনাম কেন লেখা হয়, এটি না জানলে ভালো শিরোনাম লেখা সম্ভব হয় না। এখানে সংবাদের শিরোনামের গুরুত্বপূর্ণ কিছু উদ্দেশ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

শিরোনাম পাঠককে কোনো বিষয়, ঘটনা বা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে। পাঠককে অত্যন্ত সংক্ষেপে একটি ঘটনা সম্পর্কে জানিয়ে দেয়।

প্রতিদিনের বিভিন্ন খবরের মধ্যে গুণগত পার্থক্য (gradation) তৈরি করে। শিরোনাম পাঠককে পুরো সংবাদ পাঠে আকৃষ্ট করে। পত্রিকার পাতার সৌন্দর্য বাড়ায়।

 

হেডলাইনের কাজ

আগেই বলা হয়েছে, হেডলাইন বা শিরোনাম সংবাদপত্রের বা সংবাদের মতো পুরনো নয়। সাংবাদিকতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, একেবারেই প্রথমদিকের সংবাদপত্রে সংবাদে কোনো শিরোনাম থাকতো না। সারবদ্ধ করে সংবাদগুলো উপস্থাপন করা হতো। কিন্তু ক্রমেই সংবাদের সংখ্যা বাড়তে লাগলো অর্থাৎ বেশি করে সংবাদ ছাপার প্রয়োজন দেখা দিল।

এতে সংবাদপত্রের পাতায় সংবাদগুলোকে আলাদা করে চেনানো কঠিন হয়ে উঠতে লাগলো। আবার বাস্তবতার নিরীখে একটি সংবাদের চেয়ে অন্য একটি সংবাদকে আলাদা করে কম বা বেশি গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিল। বেশি সংবাদের কারণে সংবাদপত্রের পাতার চেহারাও হয়ে উঠতে লাগলো অনেক বেশি এলোমেলো।

এসব বাস্তবতার মধ্যে পড়ে আস্তে আস্তে সংবাদের শিরোনাম লেখার প্রচলন হয়। আর বর্তমান যুগে এসে আরো অনেক কারণে শিরোনাম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শিরোনাম কী কী কাজ করে বা এর ভূমিকাগুলো কী, এদিকে নজর দিলে শিরোনামের গুরুত্ব স্পষ্ট করে বোঝা সম্ভব হবে। আর শিরোনামের কাজ কী, বা কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা যাবে শিরোনামের এই কাজগুলো জানা ও বোঝার মাধ্যমে :

 

শিরোনাম সংবাদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরে। একটি সংবাদের ভেতরে কি আছে অর্থাৎ একটি ঘটনা খুব সংক্ষেপে পাঠককে বুঝতে সাহায্য করে ওই সংবাদের সঙ্গে যুক্ত শিরোনাম।

প্রতিটি সংবাদকে আলাদা করে চিনতে সাহায্য করে। সংবাদপত্রের একটি পৃষ্ঠায় অনেক সংবাদ থাকে। শিরোনামের মাধ্যমেই প্রতিটি সংবাদকে আলাদা করে চেনা যায়।

পাঠকের সময় বাঁচায়। বর্তমান কর্মজীবন বেশ ব্যস্ত। দিন দিন জীবন কঠিন হচ্ছে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাঠকের ব্যস্ততাও বাড়ছে। এ ছাড়া পাঠকের মধ্যে একাধিক সংবাদপত্র পড়ার প্রবণতাও বাড়ছে। এসব কারণে অনেক সময় পাঠকের পক্ষে গোটা সংবাদ পড়ার সময় বা সুযোগ হয়ে ওঠে না। এ বাস্তবতায় একটি শিরোনাম পাঠকের জানার আগ্রহকে কিছুটা হলেও মেটাতে পারে। শিরোনামে চোখ বুলিয়েই পাঠক কিছুটা ধারণা করে নিতে পারে, ওই দিনের মূল ঘটনা কী কী।

পাঠককে সংবাদ পড়তে আগ্রহী করে তোলে। শিরোনামে মূল তথ্যটি দেখার পর পাঠকের মনে একটি সংবাদের পুরো অংশ পড়ে দেখার আগ্রহ তৈরি হতে পারে। একটি ভালো, চমৎকার শিরোনাম অনেক সময় অনাগ্রহী পাঠককেও একটি সংবাদ পড়তে আগ্রহী করে তুলতে পারে।

সংবাদের বিষয়বস্তু সংক্ষেপে তুলে ধরে। ঠিক কী বিষয়ে ওই নির্দিষ্ট সংবাদটি লেখা হয়েছে, এ বিষয়ে পাঠককে ধারণা দিতে পারে।

পাঠকের পছন্দের সংবাদটি বাছাইয়ে সহায়তা করে। সব পাঠকের চাহিদা ও আগ্রহ এক নয়। কেউ রাজনীতির সংবাদে আগ্রহী, কেউ বিনোদন, কেউ অর্থনীতি, কেউ কৃষি, কেউ খেলা বা কেউ শিক্ষা বিষয়ক সংবাদে আগ্রহী। শিরোনাম পড়েই পাঠকেরা নিজেদের পছন্দের বা প্রয়োজনের সংবাদটি পড়ার জন্যে বাছাই করে নিতে পারে।

সংবাদের গুরুত্ব তুলে ধরে। শিরোনাম দেখে অনেক সময় পাঠকেরা বুঝে নিতে পারে, ওই দিনের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ কোটি বা কী কী। কতো কলামে লেখা হলো, কয় লাইনে লেখা হলো, কী রঙে লেখা হলো ইত্যাদি বিষয় থেকে এটি বুঝে নেয়া যায়। এক কলামের চেয়ে তিন/চার কলাম বা ব্যানার শিরোনামে সংবাদের গুরুত্ব যে অনেক বেশি, তা সহজেই বুঝে নেয়া যায়।

নির্দিষ্ট দিনের সংবাদপত্রে কী কী বিষয় আছে সেটি জানতে সহায়তা করে। একটি নির্দিষ্ট দিনের সংবাদপত্রে থাকা সবগুলো সংবাদ পড়া বেশ কষ্টকর। সময়-সুযোগের অভাবের কারণে অনেকের পক্ষে তা অসম্ভবও। এ পরিস্থিতিতে শুধু শিরোনামগুলোর দিকে চোখ বুলিয়ে সহজেই পাঠকেরা এ বিষয়ে একটি ধারণা পেয়ে যেতে পারে।

কোন সংবাদটি অবশ্যই পড়া-জানা উচিত তা বুঝতে সহায়ক হয়। উপস্থাপনার ধরন অনুযায়ী পাঠক জেনে নিতে পারে, ওই দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কোনটি বা কী কী। সব সংবাদে চোখ বুলানোর সুযোগ না থাকলেও দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা জেনে নিতে পাঠকের সুবিধা হয়।

সংবাদপত্রের সৌন্দর্য বাড়ায়। শিরোনাম ছাড়া এলোমেলো বা ঠাসাঠাসি করে শুধু সংবাদ ছাপা হলে সংবাদপত্রের পৃষ্ঠার চেহারাও তেমন দৃষ্টিনন্দন হবে না। এতে পাঠকের চোখে ও মনে অস্বস্তি সৃষ্টি হয়। কিন্তু প্রতিটি সংবাদকে শিরোনাম দিয়ে আলাদা করে উপস্থাপন করা হলে অন্যান্য উপকার পাওয়ার পাশাপাশি পৃষ্ঠাটি দেখতেও দৃষ্টিনন্দন হয়।

পৃষ্ঠাসজ্জায় সহায়তা করে। শিরোনাম থাকার ফলে সংবাদপত্রের পৃষ্ঠাসজ্জার কাজটিও সহজ হয়। সংবাদগুলোকে সহজেই আকার ও গুরুত্ব অনুযায়ী আলাদা করে চেনা যায়, পৃষ্ঠায় সেভাবে উপস্থাপন করা যায়।

প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সহায়তা করে। এটি হেডলাইনের অন্যতম ও অনন্য একটি বৈশিষ্ট্য। একটি ঘটনা ঘটলে এর সংবাদ সব পত্রিকাই ছাপাবে। কিন্তু কোন পত্রিকাটির হেডলাইন কতো চমৎকার হলো, সেটি অবশ্যই আলোচিত হবে। সংবাদ লেখায় অনেক সময় চমৎকারিত্ব দেখানোর সুযোগ খুব-একটা থাকে না। কিন্তু হেডলাইন মোটামুটি সবসময়ই এ সুযোগটি খোলা রাখে। এভাবে চমৎকারিত্বের মাধ্যমে হেডলাইন পাঠকদের আকৃষ্ট করার মধ্য দিয়ে বাজারে অন্যান্য পত্রিকার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করে দেয়।

 

হেডলাইনের উপাদান

সংবাদের মতোই শিরোনামেরও মূল উপাদান ‘SWIH’ বা Who, What, When, Where Why & How অর্থাৎ ‘ষড়-ক’ বা কে, কী, কখন, কোথায়, কেন ও কীভাবে। শিরোনামে শুধু এই প্রশ্নগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ দু-একটি প্রশ্নের উত্তর বলে দেয়া হয়। এক্ষেত্রে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপাদানটিকেই সাধারণত শিরোনামের জন্যে বেছে নেয়া হয়।

 

হার্ড নিউজের হেডলাইনের বৈশিষ্ট্য

হার্ড নিউজের শিরোনামের কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ ধরনের খবরের শিরোনাম লেখার সময় এসব বৈশিষ্ট্য আরোপের চেষ্টা করা হয়। এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হলো:

একটি মাত্র বাক্যে শিরোনামটি লেখার চেষ্টা করা। তবে যদি বেশি কলামের স্টোরি হয় তবে এ কথা বেশি প্রযোজ্য, সিঙ্গেল কলামে লেখা সংবাদের ক্ষেত্রে একাধিক বাক্য চলে।

১ থেকে ৯ শব্দের মধ্যে লেখার চেষ্টা করতে হয়। সবচেয়ে কম কথায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলে দিতে হয়।

শিরোনামের ভাষাটি খুবই সহজবোধ্য হতে হবে। একবার পড়েই যেন সবাই মূল কথাটি বুঝে নিতে পারে।

সহজপাঠ্য ও আকর্ষণীয় হতে হবে। শিরোনাম সবসময় কর্তৃবাচ্যে (active voice) লেখার চেষ্টা করতে হবে। এতে হেডলাইনটি বেশি সমর্থ হয়। যেমন: ‘সন্ত্রাসীদের গুলিতে ব্যবসায়ীর মৃত্যু’ – এভাবে না লিখে লিখতে হবে ‘ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করল সন্ত্রাসীরা’ বা শুধু ‘ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা’

 

শিরোনাম সবসময় বর্তমান কালে (present tense) লেখার চেষ্টা করতে হবে।

এতেও শিরোনাম জোরদার হয়। যেমন। ‘প্রতিষ্ঠানের টাকা লুট করে পালিয়েছিলেন ম্যানেজার’ এভাবে না লিখে এভাবে লেখা যেতে পারে।

‘প্রতিষ্ঠানের টাকা লুট করে পালালেন ম্যানেজার’। শিরোনাম ভাষা ও ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ হতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে শিরোনামের বেলায় ব্যাকরণের নিয়ম শিথিলযোগ্য, তবে এর মানে ভুল বা অশুদ্ধ কিছু লেখা নয়।

শিরোনাম অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠ হবে। কোনো ভণিতা নয়, হেডলাইনে তথ্য জানানোর ভঙ্গি যতোটা সম্ভব সোজা হতে হবে।

শিরোনামে তথ্য দেয়ার সময় যতোটা সম্ভব জটিলতা পরিহার করতে হবে। যা বলার দরকার তা সহজ করে ও ভণিতা ছাড়া বলে দিতে হবে।

শিরোনাম অল্প কথায় লিখলেও এমনভাবে লিখতে হবে নেন তা একই সঙ্গে ব্যাখ্যামূলক ও অর্থগুণসম্পন্ন (অল্প কথাতেই জরুরি সব বিষয় থাকা) হয়।

 

হেডলাইন লেখার সময় বিবেচ্য

একটি সংবাদের হেডলাইন বা শিরোনাম লেখার সময় প্রথমেই ভাবতে হবে, ওই সংবাদটি কেন লেখা হচ্ছে, সংবাদটিতে নতুন কী আছে ও এটি না ছাপলে কী ক্ষতি হবে। এখানে যে উত্তর পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই এর শিরোনাম লেখার রসদ পাওয়া যাবে।

অনেকগুলো সংবাদের মধ্য থেকে যেমন প্রকাশযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সংবাদ বেছে নেয়া হয়, ঠিক তেমনি বাছাইকৃত একটি সংবাদের অনেক গুলো তথ্যের মধ্যে সবচেয়ে জরুরি তথ্যটি বের করে আনতে হবে। ওই তথ্য দিয়েই লিখতে হবে শিরোনাম।

 

হেডলাইনের আকার

শিরোনামের আকার অর্থাৎ শিরোনাম কতো লাইনে বা কতো শব্দে লিখতে হবে, এটি নিয়ে অনেক ধরনের ব্যাখ্যা ও প্রস্তাব রয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও নবীন কর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক বেশি। তত্ত্বগতভাবে বিভিন্ন রীতি-নীতি রয়েছে, তবে এখনকার বাস্তব প্রেক্ষাপটে এর একটি বড় অংশই আর প্রয়োগের উপযুক্ত নয়।

এ ছাড়া বাংলাদেশে সাংবাদিকতা বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যেখানে শিরোনাম লেখার প্রয়োজন রয়েছে (যেমন- বিজ্ঞাপনের কপি), সে বিষয়ে মৌলিক বই প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নেই। বই বা লেখা যা কিছু পাওয়া যায়, এর বেশিরভাগই হলো বিদেশি বইয়ের অনুবাদ বা সেগুলোর আদলে লেখা। তাই ইংরেজি বা বিদেশি অন্য কোনো ভাষায় সাংবাদিকতার প্রেক্ষাপটে লেখা বইপত্র বা রীতি-নীতি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ও বাংলা ভাষায় প্রয়োগ করতে গেলে বিভ্রান্তি ঘটাই স্বাভাবিক।

প্রথমেই আসা যাক- শিরোনাম বা হেডলাইন কতো লাইনে হবে। এজন্যে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম বা ধরা-বাঁধা কোনো সূত্র নেই। সংবাদটি সম্পর্কে সংক্ষেপে ধারণা দেয়াই হেডলাইনের মূল কাজ। ওই কাজটি করতে যে কয়টি শব্দ লেখা দরকার, তা করতে হবে। আর ওই শব্দগুলো লিখতে যে কয়টি লাইন করা দরকার, সেটিও করতে হবে। এখানে উল্লেখ্য, একটি সংবাদকে কী ট্রিটমেন্ট (news treatment) দেয়া হচ্ছে অর্থাৎ কতো কলাম জুড়ে ছাপা হচ্ছে, এর ওপর ভিত্তি করে একই হেডলাইন বিভিন্ন সংখ্যক লাইন ধারণ করতে পারে। যেমন।

 

‘ছিনতাইকারীর গুলিতে রাজধানীতে নিহত ২’

দুই কলামজুড়ে লিখলে এটি একটিমাত্র লাইনে ধরে যাবে। এক কলামে লিখলে এটি ভেঙে একাধিক লাইনে চলে যাবে। যেমন।

‘ছিনতাইকারীর গুলিতে রাজধানীতে নিহত ২’

এর মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার কাজ করে। এখন সংবাদপত্রের পৃষ্ঠাসজ্জায় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ঘটেছে বেশ ব্যাপক আকারে। সেই সঙ্গে এসেছে ধারণাগত পরিবর্তনও। পাশাপাশি রয়েছে পৃষ্ঠাসজ্জার নানা জটিলতা ও এর থেকে বাঁচার প্রাণান্তকর চেষ্টা।

পৃষ্ঠাসজ্জা করতে গিয়ে অনেক সময় দেখা যায়, একাধিক লাইনে লেখা হেডলাইনসহ একটি সংবাদ পাতায় বসানোর জন্যে যথেষ্ট জায়গা খালি নেই। তখন প্রথমে সংবাদটিকে কেটে-ছেঁটে একটু কমিয়ে ছোট করে আনার চেষ্টা করা হয়।

এরপরও কাজ না হলে অর্থাৎ সংবাদটি থেকে বাদ দেয়ার মতো কোনো অংশ না পাওয়া গেলে তখন হেডলাইন থেকে শব্দ কমিয়ে বা শব্দসংখ্যা ঠিক রেখেই লাইন কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। আবার এর উল্টোটিও ঘটে।

যদি এতটাই অল্প জায়গা খালি থেকে যায় ও সেখানে অন্য একটি সংবাদ বসানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা না থাকে, আবার ওই সংবাদেও নতুন করে কিছু যোগ করে সেটির আকার বাড়ানোর সুযোগ বা সময় না থাকে, তখন হেডলাইনের লাইনের সংখ্যা আগের চেয়ে বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।

এ ক্ষেত্রে আগের হেডলাইনের শব্দসংখ্যা পর্যাপ্ত না হলে নতুন করে শব্দও এতে জুড়ে দেয়া হয়। হেডলাইন কতো শব্দে লিখতে হবে, এখানেও একই কথা প্রযোজ্য। কোনো কোনো লেখক ১ থেকে ৯ শব্দের মধ্যে হেডলাইন লেখার কথা বলেছেন। কেউ পরামর্শ দিয়েছেন হেডলাইনের সংখ্যা ১১ শব্দের মধ্যে সীমিত রাখতে। কোথাও কোথাও এ সংখ্যা বলা হয়েছে ১৪। কিন্তু বাস্তবে লাইনের ক্ষেত্রে যেমন প্রয়োজন অনুযায়ী প্রয়োগ হচ্ছে, তেমনি শব্দের সংখ্যার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটছে।

এভাবে আসলে কেতাবি কায়দা-কানুন সবসময় মেনে চলা সম্ভব হয়ে ওঠে না, আর এর প্রয়োজনও পড়ে না। বর্তমানে, বিশেষ করে বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক, বেশিরভাগ সাংবাদিকই পাওয়া যাবে যারা সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন না।

এমনকি স্কুল- কলেজের গণ্ডি পেরোনোর পর কারো কারো আর পরবর্তী স্তরে আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেয়া হয়নি। আবার সাংবাদিকতায় আসার পর যে এ বিষয়ে তারা নিজের আগ্রহেও বিষয়ে বই-পত্র ঘেঁটেছেন, তা-ও হয়তো নয়। তাদের পক্ষে হেডলাইন লেখার এসব নিয়ম-কানুন জানার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।

কিন্তু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় তার বেশ ভালো হেডলাইন লেখায় পারদর্শী হয়ে গেছেন। তাই পুঁথিগত নিয়ম-কানুন মালার ব্যাপারটি আসলে সবসময় বাধ্যতামূলক নয়। তবে অবশ্যই মনে রাখা দরকার, এর মানে এই নয় যে এসব নিয়ম-কানুন ভুল বা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় কিছু। বরং সেগুলো জেনে-বুঝে রাখলে পরে নিয়ম মেনে ও না মেনে- দুভাবেই ভালো হেডলাইন লেখা যায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে।

আসলে ব্যাপার হচ্ছে, শুধু চেষ্টা করা উচিত, সবচেয়ে কম কথায় কতো ভালো করে একটি তথ্য হেডলাইনে তুলে ধরা যায়। এর সঙ্গে পৃষ্ঠাসজ্জার দিকগুলোর সমন্বয় রেখে যে কয়টি লাইন বা শব্দ লেখার দরকার পড়ে, লিখতে হবে। এতে যদি পুঁথিগত তত্ত্ব ভাঙার দরকার পড়ে, ভাঙতে হবে। মনে রাখা দরকার, ভালো হেডলাইন লেখার প্রয়োজনে হেডলাইন লেখার নিয়ম ভাঙাও একটি বড় স্বীকৃত নিয়ম।

 

হেডলাইন লেখার নিয়ম-কানুন

হেডলাইন লেখার কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে। এগুলো অনুসরণ করলে ভালো হেডলাইন লেখা যায়। তবে দেশ ও লেখকভেদে এসব নিয়ম-কানুনে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়ম উল্লেখ করা হলো:

হেডলাইনের কাজই হচ্ছে কম কথায় সংবাদটি সম্পর্কে ধারণা দেয়া। তাই কম কথাতেই লেখার চেষ্টা করতে হবে। হেডলাইন অযথা বেশি শব্দে না লেখাই ভালো। কম কথায় লিখলে অস্পষ্টতা তৈরি হলে প্রয়োজনে শব্দের সংখ্যা বাড়ানো যাবে।

একবার পড়েই যেন অর্থ বোঝা যায়, এমন সহজ করে হেডলাইন লিখতে হবে।

হেডলাইনে কখনোই কঠিন শব্দ ব্যবহার করা চলবে না। পড়তে বা বুঝতে অসুবিধা হয়- হেডলাইনে এমন শব্দ লিখলে পাঠক বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।

সংবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি দিয়েই হেডলাইন লেখার চেষ্টা করতে হবে। হেডলাইনে একই সঙ্গে শোল্ডার ও কিকার ব্যবহার না করাই ভালো।

হেডলাইনে কখনোই অনেক বেশি তথ্য দেয়া ঠিক নয়। এতে হেডলাইন বড় ও জটিল আকার ধারণ করে এবং পুরো সংবাদ পাঠে পাঠকের অনাগ্রহ তৈরি হতে পারে।

হেডলাইনে 5W1H-এর মধ্যে সবচেয়ে জরুরি অংশটির উল্লেখ থাকতে হবে। হেডলাইন যথাসম্ভব কর্তৃবাচো ও প্রত্যক্ষ উক্তিতে (active voice) লেখার চেষ্টা করতে হবে। এতে হেডলাইনের জোর বাড়ে। যেমন। ‘সন্ত্রাসীদের গুলিতে গেল ব্যবসায়ীর প্রাণ’-এভাবে না লিখে ‘ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করল সন্ত্রাসীরা’-এভাবে লিখলে হেডলাইন অনেক বেশি জোরালো ও কার্যকর হয়।

বর্তমান কালে (present tense) লেখার চেষ্টা করতে হবে। তা সম্ভব না হলে অর্থাৎ এতে অর্থের তারতম্য ঘটার আশঙ্কা থাকলে সুদূর অতীতে না লিখে যতোটা সম্ভব নিকট অতীত কাল দিয়ে লেখার চেষ্টা করা দরকার। এতেও হেডলাইন জোরালো হয়। যেমন ‘ত্রাণের টাকা চুরি করে পালিয়ে গিয়েছিলেন এমপি’ – এভাবে না লিখে ‘ত্রাণের টাকা চুরি করে পালালেন এমপি’ লিখলে ভালো হয়। এভাবে

হেডলাইনে অখ্যাত বা কম পরিচিত-অপরিচিত জায়গা চিহ্নিত করে দিতে হবে। যেমন। ‘দুপচাঁচিয়ায় শিবিরের ৩ নেতা-কর্মী আটক’ বললে অনেকে না- ও চিনতে পারে। তাই বলতে হবে ‘বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় শিবিরের ৩ নেতা- কর্মী আটক’। কিংবা প্রথমে শুধু বগুড়া বলে পরে ইন্ট্রো-তে বগুড়ার কোথায়, তা বলা যেতে পারে।

সর্বোপরি, হেডলাইন কেন লেখা হয় আর এর কাজ কী, সেটি মাথায় রেখেই হেডলাইন লিখতে হবে। হেডলাইন লেখার উদ্দেশ্যটি বুঝতে পারলে ও সময়মতো সেটি মনে করতে পারলেই আসলে একটি ভালো হেডলাইন লেখা সম্ভব।

American Writers & Artists নামের একটি কর্তৃপক্ষ কপিরাইটিং বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেয়ার সময় হেডলাইন লেখার একটি বিশেষ কৌশল প্রয়োগ করে। কৌশলটি ‘The Four Us’ হিসেবে পরিচিত। এটি হলো:

১. Be USEFUL to the reader

২. Provide him with a sense of URGENCY

৩. Convey the idea that the main benefit is somehow UNIQUE and

৪. Do all of the above in an ULTRA-SPECIFIC way.

কপিরাইটার ও লেখক Clayton Makepeace তাঁর এক লেখায় ৬টি প্রশ্নের উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, হেডলাইন লেখা শুরু করার আগে নিজেকে ওই প্রশ্নগুলো করতে হবে। তাহলে একটি ভালো হেডলাইন লেখা সম্ভব। প্রশ্নগুলো হলো:

১. Does your headline offer the reader a reward for reading?

২. What specifics could you add to make your headline more intriguing and believable?

৩. Does your headline trigger a strong, actionable emotion the reader already has about the subject at hand?

৪. Does your headline present a proposition that will instantly get your prospect nodding his or her head?

৫. Could your headline benefit from the inclusion of a proposed transaction?

৬. Could you add an element of intrigue to drive the prospect into your opening copy?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজের কাছে কী পাওয়া যাচ্ছে তা বিবেচনা করলে একটি ভালো হেডলাইন লেখার দিকনির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে।

 

হেডলাইনের প্রকারভেদ

হেডলাইন লেখার স্টাইল

হেডলাইন বা শিরোনাম লেখার অনেক ধরনের স্টাইল রয়েছে। পত্রিকার নিজস্ব পৃষ্ঠাসজ্জা নীতি অনুযায়ী অনেক সময় শিরোনাম লেখার ধরন বা স্টাইলে ভিন্নতা আসতে পারে। তবে এর সুযোগ খুব কম। ব্যবহারিক দিক থেকে ট্রিটমেন্টের ব্যাপারটি দেখলে সিঙ্গেল কলাম (S/C), ডাবল কলাম (D/C), ট্রিপল কলাম (3/C), ফোর কলাম (4/C) – এভাবে চলতে থাকবে। শিরোনাম লিখতে সাধারণভাবে সংবাদপত্রে মূলত দুই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। যেমন:

১. উল্লম্ব (vertical emphasis)

২. আনুভূমিক (horizontal emphasis)

হেডলাইনের গঠন কাঠামো গঠন কাঠামো অনুযায়ী হেডলাইন নিম্নোক্ত ৩ ধরনের হতে পারে:

১. পিরামিড কাঠামো

২. উল্টো পিরামিড কাঠামো

৩. মিশ্র পিরামিড কাঠামো

 

পিরামিড কাঠামো

এ কাঠামোয় লেখা হেডলাইন ওপর থেকে নিচের দিকে ক্রমশ প্রশস্ত হতে থাকে। যেমন:

যাত্রাবাড়িতে দুর্বৃত্তদের হাতে দুই ব্যবসায়ীর মৃত্যু

উল্টো পিরামিড কাঠামো উটকাঠামোয় লেখা শিরোনাম ওপর থেকে নিচের দিকে ক্রমশ অপ্রশস্ত বা ছোট হতে। থাকে। যেমন।

যাত্রাবাড়িতে দুর্বৃত্তদের হাতে ব্যবসায়ীর মৃত্যু

 

মিশ্র পিরামিড কাঠামো

এ কাঠামোয় লেখা শিরোনাম ওপর থেকে নিচের দিকে ক্রমশ অপ্রশস্ত হয়ে আবারো প্রশস্ত হয়ে শেষ হয়। যেমন:

রাজধানীর যাত্রাবাড়িতে দুর্বৃত্তদের হাতে দুই ডিশ ব্যবসায়ীর মৃত্যু

 

হেডলাইন বিন্যাসে ভারসাম্য

হেডলাইন বিন্যাসে মূলত নিম্নোক্ত দুই ধরনের ভারসাম্য দেখা যায়।

১. কেন্দ্রমুখী ভারসাম্য (centre balance)

২. কেন্দ্র বহির্মুখী ভারসাম্য (off-centre balance)

কেন্দ্রমুখী ভারসাম্যে লেখা শিরোনামের আকারের কয়েকটি উদাহরণ হতে পারে:

 

রাজধানীতে ১০ লাখ টাকা ছিনতাই

অথবা

মিরপুরে প্রকাশ্যে গুলি করে দুই লাখ টাকা ও গাড়ি ছিনতাই

অথবা

মিরপুরে প্রকাশ্যে দুজনকে ছিনতাই

 

 

বিভিন্ন ধরনের হেডলাইন লেখা

হেডলাইনের প্রকারভেদ বিভিন্ন আঙ্গিকে হতে পারে। নানা দিক থেকে একে বিভিন্নভাবে বিচক করা যায়। এর কোনো কোনোটি পূর্বোক্ত ধরনগুলোর একাধিক শ্রেণীতে পড়ে। সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্যের দিকটি বাদ দিয়ে আলাদাভাবে আলোচনা করলে ব্যবহারিক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্রকারগুলো নিম্নরূপ।

ক্লাশ লেফট বা লেফট অ্যালাইনড

ফ্লাশ রাইট বা রাইট অ্যালাইনড ও

সেন্টার ব্যালেন্সড

ওয়েস্টলাইন বা কটিরেখ

 

পৃষ্ঠাসজ্জার সময় হেডলাইনের লাইনগুলো কিভাবে বিন্যস্ত করা হয়, এর ওপর ভিত্তি করে এ বরনগুলো তৈরি হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, তত্ত্বগতভাবে ‘ফ্লাশ লেফট’ ও ফ্লাশ রাইটা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে বিভিন্ন সংবাদপত্র অফিসে পৃষ্ঠাসজ্জার সময় এদের সাধারণত যথাক্রমে ‘লেফট অ্যালাইনড’ ও ‘রাইট অ্যালাইনড’ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়ে থাকে।

 

লেফট অ্যালাইনড হেডলাইন

এ ধরনের হেডলাইনের প্রতিটি লাইন বাম দিক থেকে শুরু হয়ে ডান দিকে সরে যায়। বাম দিকে প্রতিটি লাইন একই অবস্থান থেকে শুরু হয়। সংবাদপত্রে এ ধরনের হেডলাইন সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়। এর কাঠামোটি দেখতে নিম্নরূপ হতে পারে।

 

এখানের হেডলাইনের একটি উদাহরণ হতে পারে।

নওগাঁয় শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুলের অভিযোগে ভাংচুর

 

রাইট অ্যালাইনড হেডলাইন

এ ধরনের হেডলাইনের প্রতিটি লাইন ডান দিকে মিল রেখে লেখা হয়। বাম দিকে অসমান থাকলেও প্রতিটি লাইন ডান দিকে একই অবস্থানে গিয়ে মিলে যায়। সংবাদপত্রে সাবারণত একেবারে শেষের কলামে বিশেষ ধরনের কোনো সংবাদ বা ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সম্পূর্ণ কলামটিকে আলাদা করে বোঝাতে ওই কলামের সংবাদগুলোর হেডলাইন এবং সংবাদও এ কৌশলে লেখা হয়। এর কাঠামোটি দেখতে নিম্নরূপ।

এ ধরনের কাঠামোর হেডলাইনের একটি উদাহরণ হতে পারে:

 

নওগাঁয় শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুলের অভিযোগে ভাংচুর

 

সেন্টার ব্যালেন্সড্ হেডলাইন

এভাবে লেখা হেডলাইনের বাক্য তথা লাইনগুলো মাঝখানে ভারসাম্যে থাকে। ডান ও বাম দিকে এর কোনো ভারসাম্য থাকে না। এর কাঠামোটি দেখতে নিম্নরূপ হতে পারে।

 

এ ধরনের কাঠামোতে লেখা হেডলাইনের উদাহরণ হতে পারে:

 

নওগাঁয় শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল থাকার অভিযোগে ভাংচুর

 

এ ধরনের (সেন্টার ব্যালেন্সড্) হেডলাইন আজকাল খুব একটা ব্যবহার করা হয় না। কিছুদিন আগেও এটি খুব ব্যবহৃত হতো। ইদানিং এ কাঠামোয় হেডলাইন লেখার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে।

 

ওয়েস্টলাইন বা কটিরেখ হেডলাইন

এভাবে লেখা হেডলাইন দেখতে অনেকটা সেন্টার ব্যালেন্সড হেডলাইনের মতো। তবে এর মাঝখানের লাইনটির দৈর্ঘ্য এর ওপর ও নিচের লাইনের চেয়ে একটু ছোট থাকে।

এর কাঠামোটি দেখতে নিম্নরূপ হতে পারে:

এর একটি উদাহরণ হতে পারে।

নওগাঁয় শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নে ভুল থাকার অভিযোগে ভাংচুর

দেখতে অনেকটা মানুষের কটিদেশ অর্থাৎ কোমরের মতো হওয়ায় এর এমন নামকরণ হয়েছে। এর বাক্য তথা লাইনগুলো মাঝখানে ভারসাম্যে থাকে। ডান ও বাম দিকে এর কোনো ভারসাম্য থাকে না।

 

স্টেপড বা সিঁড়ি হেডলাইন

এ ধরনের হেডলাইনে বাক্য তথা লাইনগুলো একটি থেকে অন্যটি একটু করে সরে যেতে থাকে। এর কাঠামোটি দেখতে নিম্নরূপ হতে পারে:

এ ধরনের কাঠামোতে লেখা হেডলাইনের উদাহরণ হতে পারে:

নওগাঁয় শিক্ষক নিয়োগ

পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল থাকার

অভিযোগে ভাংচুর

একসময় খুব ব্যবহার হলেও এ ধরনের কাঠামোর হেডলাইন এখন আর চোখে পড়ে না।

 

হেডলাইনের আরো কিন্তু ধরুন

(Banner) যা ফলাও হেডলাইন।

কোনো কোবের সংবাদ প্রতি প্লায়েন্ট এ উপস্থাপন করা যায় না। এ ধরনের গুরুত্ববহ সংবাদের হেডলাইন সাধারণত ৬ থেকে ৮ কলাম জুড়ে হাপা হয়। তখন একে বাবার বা স্বলাও শিরোনাম বলে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো দলের জয়ের খবর, ক্রিকেট দলের বড় কোলে টুর্ণামেন্ট ভয়ের খবর, একটি দেশের অন্য একটি দেশে আগ্রাসন বা আক্রমণের খবর এ ধরনের দিয়োনাথে হয়ে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রে ব্যানার শিরোনামকে ডেকার (Decker) বা স্ট্রিমার (Suster)-ও বলা হয়।

 

স্কাইলাইন (Skyline) বা উড়ালরেখা হেডলাইন

তখনো কখনো এমন কোনো ঘটনা ঘটতে পারে যার গুরুত্ব ব্যানার শিরোনাম দিয়েও যেন ঠিকভাবে প্রকাশ করা যায় না। এসব ঘটনায় অনেক সময় পত্রিকাগুলো নেমপ্লেটকে নিচে নামিয়ে দিয়ে এর ওপরে পুরো ৮ কলাম জুড়ে শিরোনাম বসিয়ে দেয়। এ ধরনের শিরোনামই হলো স্কাইলাইন বা উড়ালরেখা শিরোনাম।

 

ব্রুসলাইন (Crossline) হেডলাইন

এ ধরনের শিরোনাম সাধারণত একটি লাইনে হয় ও লাইনটি কলামের বাম থেকে ডান দিকে বিস্তৃত থাকে। সাধারণত এক কলাম জুড়েই এ ধরনের শিরোনাম লেখা হয়।

 

ব্যাংক (Bank) ও ডেক (Deck)

কোনো শিরোনামের যদি দুটি অংশ থাকে তবে ওপরের অংশকে ডেক ও নিচের অংশকে ব্যাংক বলে। ডেককে অনেক সময় আইব্রো (cycbrow) বা ওভারহেড (overhead)- বলে।

 

শোল্ডার (Shoulder) বা কিকার (Kicker)

কোনো শিরোনামের একাধিক অংশ থাকলে মূল শিরোনামের ওপরে সংবাদের ঘটনার পটভূমি বা পরিচয় নির্দেশক অংশটিকে শোল্ডার বা কিকার বলে। যেমন:

অপহৃত শিশুকে হত্যা বিচার চেয়ে মিরপুরে এলাকাবাসীর বিক্ষোভ

 

ট্যাপলাইন (Strapline)

একটি শিরোনামের ওপরে পরিচিতি বা নির্দেশক অংশটিকে দীর্ঘায়িত না করে একটি বা দুটি শব্দে বলে দেয়া হলে সেটিকে স্ট্র্যাপলাইন বলে।

 

সংস্কৃতি বিষয়ক কোনো সংবাদের ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘ শিরোনামের ওপর শুধু ‘সংস্কৃতি’ কথাটি লিখে দিয়ে সংবাদের ধরনটি বুঝিয়ে দেয়া হলে সেটি স্ট্যাপলাইনের উদাহরণ হবে।

 

হ্যাংগার (Hanger)

ফলাও বা এ ধরনের বড় কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে মূল শিরোনামে মূল কথাটি বলে দিয়ে নিচে একটু ছোট হরফে আরো কিছু তথ্য অনেক সময় দিয়ে দেয়া হয়। সেগুলো হ্যাংগার।

 

সাব হেড (Sub head)

একটি শিরোনামের নিচে শুরু হওয়া সংবাদের ভেতর যদি আরো অনেক ঘটনাকে আলাদা করে ছোট শিরোনাম দিয়ে চিহ্নিত করে দেয়া হয় তবে নতুন ওই প্রতিটি শিরোনামকে সাব হেড বলে।

 

জাম্প (Jump) ও জাম্প হেড (Jump head)

অনেক সংবাদ একটি পাতার যেখানে শুরু হয়, সেখানেই শেষ না হয়ে ভেতরে অন্য কোনো পাতায় গিয়ে শেষ হয়। মূলত প্রথম ও শেষ পাতার সংবাদের ক্ষেত্রেই এমনটি দেখা যায়। সংবাদের যে অংশটি ভেতরে অন্য কোনো পাতায় চলে যায়, সেটি হলো জাম্প বা জাম্পলাইন (jumpline) এবং সেখানে সংবাদটিকে চিহ্নিত করে দিতে ছোট করে যে শিরোনামটি লেখা হয়, সেটি হলো জাম্প হেড।

 

রিভার্স প্লেট (Reverse plate)

সাধারণত সাদা কাগজের ওপর কালো কালিতে শিরোনাম লেখা হয়। কিন্তু কখনো কখনো সংবাদটিকে আলাদা করে গুরুত্ব দিতে কালো রঙের ওপর সাদা হরফে শিরোনাম লেখা হয়ে থাকে। এটিকে বলে রিভার্স প্লেট।

 

বক্স প্লেট (Box plate)

যদি কোনো শিরোনামকে একটি বক্স বা বেষ্টনীর মধ্যে আনা হয় তবে সেটিকে বক্স প্লেট বলে।

 

অর্থের দিক থেকে হেডলাইনের প্রকারভেদ

তত্ত্বগতভাবে এগুলো কোনো প্রকারভেদ নয়। তবে বাস্তবতার আলোকে অর্থাৎ ব্যবহারিক পর্যায়ে সাংবাদিকতার নানা ক্ষেত্রে যেভাবে হেডলাইন লেখা হয়ে থাকে, সেদিক থেকে অর্থের ভিত্তিতে হেডলাইনগুলোকে এভাবে শ্রেণীবদ্ধ করার ব্যাপারে আমি ব্যক্তিগতভাবে পক্ষপাতী:

প্রত্যক্ষ হেডলাইন (Headline with direct meaning) ও

পরোক্ষ হেডলাইন (Headline with indirect meaning)

 

 

প্রত্যক্ষ হেডলাইন

সংবাদ মাধ্যমগুলো খাঁটলে দেখা যাবে, এগুলোতে সেখা সখা বেশিরভাগ সংবাদের হেডলাইনই সরাসরি অর্থ বহন করে। এগুলোকে এ শ্রেণীতে ফেলা যেতে পারে। যেমন:

ডিসিসির জ্বালানি খরচ মাসে কোটি টাকা বেড়ে গেছে

এই হেডলাইনে কোনো ভণিতা না করে অর্থাৎ পরোক্ষ বা রূপক শব্দ বা কথা না বলে সরাসরি মূল তথ্যটি বলে দেয়া হয়েছে। তাই এদেরকে ‘প্রত্যক্ষ হেডলাইন’ বলা যেতে

 

 

পরোক্ষ হেডলাইন

অনেক সময় কিছু সংবাদের হেডলাইনে সরাসরি মূল কথা না লিখে একটু ভণিতা করে, ভিন্ন আঙ্গিকে লেখার চেষ্টা করা হয়। এ ধরনের হেডলাইনে প্রবাদ-প্রবচন বা বাগধারা থেকে শুরু করে নানা ধরনের রূপক শব্দ বা শব্দগুচ্ছ প্রয়োগ করা হয়। এগুলোকে “পরোক্ষ হেডলাইন’ এর শ্রেণীতে ফেলা যেতে পারে।

বিভিন্ন দিনে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত এ ধরনের কয়েকটি হেডলাইন দেখা যেতে পারে:

 

শিশুটির কী দোষ!

কী দোষ ছিল ফুটফুটে শিশুটির!

নিষ্পাপ এই শিশুটির কী দোষ?

বাকপ্রতিবন্ধী শিশুটি কী দোষ করেছিল!

প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি যে লাউ সেই কদু!

চোর বটে!

একের পাপে অন্যের সাজা!

 

এগুলোর কোনোটি দিয়েই মূল কথাটি বোঝার কোনো উপায় নেই, এজন্যে পুরো সংবাদটি পড়তে হবে। হেডলাইন লেখার বহুল প্রচলিত তত্ত্ব বা নিয়ম-কানুন এখানে মানা হয়নি। বরং কেতাবি নিয়ম কিছুটা উপেক্ষা করে হেডলাইনগুলোকে পাঠকের কাছে আরো বেশি আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। এভাবে লেখা হেডলাইনকে ‘পরোক্ষ হেডলাইন’ বলা যেতে পারে।

 

 

মো: গোলাম মাওলা শাওন
প্রকাশক ও সম্পাদক
দৈনিক বাংলার আলো নিউজ

চলবে

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

আপলোডকারীর তথ্য

Banglar Alo News

hello
জনপ্রিয় সংবাদ

মিরপুরে মোটরসাইকেলের তেলের ট্যাংকের ভেতর ফেনসিডিল সহ আটক-০১

সাংবাদিকতার বিষয় জানুন শিখুন – পর্ব -২

আপডেট সময় ০৩:২২:০৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মার্চ ২০২৪

 

 

 

 

 

সংবাদের কাঠামো

কয়েকটি উপাদান নিয়ে একটি সংবাদের কাঠামো গড়ে ওঠে। বিষয়গুলো হচ্ছে।

১. শিরোনাম বা হেডলাইন

২. সংবাদ সূচনা বা ইন্ট্রো বা লিভ

৩. সংবাদের বাকি অংশ বা বডি

৪. উপসংহার

হেডলাইন কী

হেডলাইন বা শিরোনাম হলো সংবাদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। সংবাদের ওপরে অল্প কথায় একটি সংবাদের বিষয়বস্তু (content) সম্পর্কে পাঠককে ধারণা দেয়া হয়ে থাকে। এটিই হেডলাইন। একে সংবাদের ‘বিজ্ঞাপন’ বলা যেতে পারে।

আরো সহজ কথায় শিরোনাম হলো সংবাদের ওপরে থাকা অল্প কথায় সংবাদটি সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। একটি ইন্ট্রো বা লিড (সংবাদ সূচনা) যেমন কম কথায় পুরো সংবাদটির মূল কথাটি তুলে ধরে, শিরোনাম তেমনি আরো কম কথায় সংবাদের মূল বিষয়বস্তুটি পাঠককে জানিয়ে দেয়। ইন্ট্রোকে বলা হয় লিড (Lead) আর শিরোনামকে বলা হয় সুপারলিড (Superlead)। সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠাটিকে বলা হয় Show Window আর সেই Show Window এর মতোই শিরোনামও গুরুত্বপূর্ণ। শিরোনামের ব্যাপারে তাই বলা হয়: Headlines are the best samples of the best items।

সাংবাদিকতার বিষয় জানুন শিখুন – পর্ব -১

https://banglaralonews.com/archives/96981 

 

কেন হেডলাইন বা হেডলাইনের উদ্দেশ্য

সংবাদপত্রের ইতিহাস বা সংবাদের ইতিহাস যতোদিনের পুরনো, হেডলাইন বা শিরোনাম ততোটা পুরনো নয়। সাংবাদিকতার একেবারে শুরুর দিকে সংবাদের সঙ্গে কোনো শিরোনাম লেখার চল ছিলো না, শুধু খবরগুলো একের পর এক পাতায় বসিয়ে ছাপা হতো। কিন্তু ক্রমেই সংবাদের সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজন পড়লো, সংবাদের পাঠক বাড়লো।

সেই সঙ্গে দেখা দিলো খবরগুলোকে পাঠকের সামনে আলাদা করে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা। দিন দিন পাঠকের ব্যস্ততা আর রুচি ও আগ্রহের ভিন্নতার কদর বাড়তে লাগলো। আর এসব কারণে প্রতিটি সংবাদকে আলাদা ও সুবিন্যস্ত করে ছাপাবার প্রয়োজনও বাড়তে লাগলো। এসব প্রয়োজন মেটানোর তাগিদের সঙ্গে সঙ্গে প্রচলন হলো শিরোনামের। অল্প কথায় একটি ঘটনা জানিয়ে দেয়া থেকে শুরু করে পৃষ্ঠাসজ্জায় নান্দনিকতা আনা এই সব ধরনের প্রয়োজনই মেটাতে লাগলো সংবাদের শিরোনাম।

বলা হয়ে থাকে The main objective of headline is to tell and to sell। অর্থাৎ রংশ্লিষ্ট সংবাদটিতে কী আছে তা অল্প কথায় বলে দেয়া ও পাঠককে ওই সংবাদটি স্বর্ণার আকৃষ্ট করার মাধ্যমে পত্রিকার কাটতি বাড়ানো এটি হচ্ছে শিরোনামের মূল উচ্ছে পাঠো কাজ। শিরোনাম লেখার উদ্দেশ্য কী অর্থাৎ শিরোনাম কেন লেখা হয়, এটি না জানলে ভালো শিরোনাম লেখা সম্ভব হয় না। এখানে সংবাদের শিরোনামের গুরুত্বপূর্ণ কিছু উদ্দেশ্য সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

শিরোনাম পাঠককে কোনো বিষয়, ঘটনা বা পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করে। পাঠককে অত্যন্ত সংক্ষেপে একটি ঘটনা সম্পর্কে জানিয়ে দেয়।

প্রতিদিনের বিভিন্ন খবরের মধ্যে গুণগত পার্থক্য (gradation) তৈরি করে। শিরোনাম পাঠককে পুরো সংবাদ পাঠে আকৃষ্ট করে। পত্রিকার পাতার সৌন্দর্য বাড়ায়।

 

হেডলাইনের কাজ

আগেই বলা হয়েছে, হেডলাইন বা শিরোনাম সংবাদপত্রের বা সংবাদের মতো পুরনো নয়। সাংবাদিকতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, একেবারেই প্রথমদিকের সংবাদপত্রে সংবাদে কোনো শিরোনাম থাকতো না। সারবদ্ধ করে সংবাদগুলো উপস্থাপন করা হতো। কিন্তু ক্রমেই সংবাদের সংখ্যা বাড়তে লাগলো অর্থাৎ বেশি করে সংবাদ ছাপার প্রয়োজন দেখা দিল।

এতে সংবাদপত্রের পাতায় সংবাদগুলোকে আলাদা করে চেনানো কঠিন হয়ে উঠতে লাগলো। আবার বাস্তবতার নিরীখে একটি সংবাদের চেয়ে অন্য একটি সংবাদকে আলাদা করে কম বা বেশি গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিল। বেশি সংবাদের কারণে সংবাদপত্রের পাতার চেহারাও হয়ে উঠতে লাগলো অনেক বেশি এলোমেলো।

এসব বাস্তবতার মধ্যে পড়ে আস্তে আস্তে সংবাদের শিরোনাম লেখার প্রচলন হয়। আর বর্তমান যুগে এসে আরো অনেক কারণে শিরোনাম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শিরোনাম কী কী কাজ করে বা এর ভূমিকাগুলো কী, এদিকে নজর দিলে শিরোনামের গুরুত্ব স্পষ্ট করে বোঝা সম্ভব হবে। আর শিরোনামের কাজ কী, বা কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা যাবে শিরোনামের এই কাজগুলো জানা ও বোঝার মাধ্যমে :

 

শিরোনাম সংবাদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি তুলে ধরে। একটি সংবাদের ভেতরে কি আছে অর্থাৎ একটি ঘটনা খুব সংক্ষেপে পাঠককে বুঝতে সাহায্য করে ওই সংবাদের সঙ্গে যুক্ত শিরোনাম।

প্রতিটি সংবাদকে আলাদা করে চিনতে সাহায্য করে। সংবাদপত্রের একটি পৃষ্ঠায় অনেক সংবাদ থাকে। শিরোনামের মাধ্যমেই প্রতিটি সংবাদকে আলাদা করে চেনা যায়।

পাঠকের সময় বাঁচায়। বর্তমান কর্মজীবন বেশ ব্যস্ত। দিন দিন জীবন কঠিন হচ্ছে, সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পাঠকের ব্যস্ততাও বাড়ছে। এ ছাড়া পাঠকের মধ্যে একাধিক সংবাদপত্র পড়ার প্রবণতাও বাড়ছে। এসব কারণে অনেক সময় পাঠকের পক্ষে গোটা সংবাদ পড়ার সময় বা সুযোগ হয়ে ওঠে না। এ বাস্তবতায় একটি শিরোনাম পাঠকের জানার আগ্রহকে কিছুটা হলেও মেটাতে পারে। শিরোনামে চোখ বুলিয়েই পাঠক কিছুটা ধারণা করে নিতে পারে, ওই দিনের মূল ঘটনা কী কী।

পাঠককে সংবাদ পড়তে আগ্রহী করে তোলে। শিরোনামে মূল তথ্যটি দেখার পর পাঠকের মনে একটি সংবাদের পুরো অংশ পড়ে দেখার আগ্রহ তৈরি হতে পারে। একটি ভালো, চমৎকার শিরোনাম অনেক সময় অনাগ্রহী পাঠককেও একটি সংবাদ পড়তে আগ্রহী করে তুলতে পারে।

সংবাদের বিষয়বস্তু সংক্ষেপে তুলে ধরে। ঠিক কী বিষয়ে ওই নির্দিষ্ট সংবাদটি লেখা হয়েছে, এ বিষয়ে পাঠককে ধারণা দিতে পারে।

পাঠকের পছন্দের সংবাদটি বাছাইয়ে সহায়তা করে। সব পাঠকের চাহিদা ও আগ্রহ এক নয়। কেউ রাজনীতির সংবাদে আগ্রহী, কেউ বিনোদন, কেউ অর্থনীতি, কেউ কৃষি, কেউ খেলা বা কেউ শিক্ষা বিষয়ক সংবাদে আগ্রহী। শিরোনাম পড়েই পাঠকেরা নিজেদের পছন্দের বা প্রয়োজনের সংবাদটি পড়ার জন্যে বাছাই করে নিতে পারে।

সংবাদের গুরুত্ব তুলে ধরে। শিরোনাম দেখে অনেক সময় পাঠকেরা বুঝে নিতে পারে, ওই দিনের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ কোটি বা কী কী। কতো কলামে লেখা হলো, কয় লাইনে লেখা হলো, কী রঙে লেখা হলো ইত্যাদি বিষয় থেকে এটি বুঝে নেয়া যায়। এক কলামের চেয়ে তিন/চার কলাম বা ব্যানার শিরোনামে সংবাদের গুরুত্ব যে অনেক বেশি, তা সহজেই বুঝে নেয়া যায়।

নির্দিষ্ট দিনের সংবাদপত্রে কী কী বিষয় আছে সেটি জানতে সহায়তা করে। একটি নির্দিষ্ট দিনের সংবাদপত্রে থাকা সবগুলো সংবাদ পড়া বেশ কষ্টকর। সময়-সুযোগের অভাবের কারণে অনেকের পক্ষে তা অসম্ভবও। এ পরিস্থিতিতে শুধু শিরোনামগুলোর দিকে চোখ বুলিয়ে সহজেই পাঠকেরা এ বিষয়ে একটি ধারণা পেয়ে যেতে পারে।

কোন সংবাদটি অবশ্যই পড়া-জানা উচিত তা বুঝতে সহায়ক হয়। উপস্থাপনার ধরন অনুযায়ী পাঠক জেনে নিতে পারে, ওই দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কোনটি বা কী কী। সব সংবাদে চোখ বুলানোর সুযোগ না থাকলেও দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা জেনে নিতে পাঠকের সুবিধা হয়।

সংবাদপত্রের সৌন্দর্য বাড়ায়। শিরোনাম ছাড়া এলোমেলো বা ঠাসাঠাসি করে শুধু সংবাদ ছাপা হলে সংবাদপত্রের পৃষ্ঠার চেহারাও তেমন দৃষ্টিনন্দন হবে না। এতে পাঠকের চোখে ও মনে অস্বস্তি সৃষ্টি হয়। কিন্তু প্রতিটি সংবাদকে শিরোনাম দিয়ে আলাদা করে উপস্থাপন করা হলে অন্যান্য উপকার পাওয়ার পাশাপাশি পৃষ্ঠাটি দেখতেও দৃষ্টিনন্দন হয়।

পৃষ্ঠাসজ্জায় সহায়তা করে। শিরোনাম থাকার ফলে সংবাদপত্রের পৃষ্ঠাসজ্জার কাজটিও সহজ হয়। সংবাদগুলোকে সহজেই আকার ও গুরুত্ব অনুযায়ী আলাদা করে চেনা যায়, পৃষ্ঠায় সেভাবে উপস্থাপন করা যায়।

প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সহায়তা করে। এটি হেডলাইনের অন্যতম ও অনন্য একটি বৈশিষ্ট্য। একটি ঘটনা ঘটলে এর সংবাদ সব পত্রিকাই ছাপাবে। কিন্তু কোন পত্রিকাটির হেডলাইন কতো চমৎকার হলো, সেটি অবশ্যই আলোচিত হবে। সংবাদ লেখায় অনেক সময় চমৎকারিত্ব দেখানোর সুযোগ খুব-একটা থাকে না। কিন্তু হেডলাইন মোটামুটি সবসময়ই এ সুযোগটি খোলা রাখে। এভাবে চমৎকারিত্বের মাধ্যমে হেডলাইন পাঠকদের আকৃষ্ট করার মধ্য দিয়ে বাজারে অন্যান্য পত্রিকার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করে দেয়।

 

হেডলাইনের উপাদান

সংবাদের মতোই শিরোনামেরও মূল উপাদান ‘SWIH’ বা Who, What, When, Where Why & How অর্থাৎ ‘ষড়-ক’ বা কে, কী, কখন, কোথায়, কেন ও কীভাবে। শিরোনামে শুধু এই প্রশ্নগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ দু-একটি প্রশ্নের উত্তর বলে দেয়া হয়। এক্ষেত্রে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপাদানটিকেই সাধারণত শিরোনামের জন্যে বেছে নেয়া হয়।

 

হার্ড নিউজের হেডলাইনের বৈশিষ্ট্য

হার্ড নিউজের শিরোনামের কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এ ধরনের খবরের শিরোনাম লেখার সময় এসব বৈশিষ্ট্য আরোপের চেষ্টা করা হয়। এসব বৈশিষ্ট্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হলো:

একটি মাত্র বাক্যে শিরোনামটি লেখার চেষ্টা করা। তবে যদি বেশি কলামের স্টোরি হয় তবে এ কথা বেশি প্রযোজ্য, সিঙ্গেল কলামে লেখা সংবাদের ক্ষেত্রে একাধিক বাক্য চলে।

১ থেকে ৯ শব্দের মধ্যে লেখার চেষ্টা করতে হয়। সবচেয়ে কম কথায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটি বলে দিতে হয়।

শিরোনামের ভাষাটি খুবই সহজবোধ্য হতে হবে। একবার পড়েই যেন সবাই মূল কথাটি বুঝে নিতে পারে।

সহজপাঠ্য ও আকর্ষণীয় হতে হবে। শিরোনাম সবসময় কর্তৃবাচ্যে (active voice) লেখার চেষ্টা করতে হবে। এতে হেডলাইনটি বেশি সমর্থ হয়। যেমন: ‘সন্ত্রাসীদের গুলিতে ব্যবসায়ীর মৃত্যু’ – এভাবে না লিখে লিখতে হবে ‘ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করল সন্ত্রাসীরা’ বা শুধু ‘ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা’

 

শিরোনাম সবসময় বর্তমান কালে (present tense) লেখার চেষ্টা করতে হবে।

এতেও শিরোনাম জোরদার হয়। যেমন। ‘প্রতিষ্ঠানের টাকা লুট করে পালিয়েছিলেন ম্যানেজার’ এভাবে না লিখে এভাবে লেখা যেতে পারে।

‘প্রতিষ্ঠানের টাকা লুট করে পালালেন ম্যানেজার’। শিরোনাম ভাষা ও ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ হতে হবে। কিছু ক্ষেত্রে শিরোনামের বেলায় ব্যাকরণের নিয়ম শিথিলযোগ্য, তবে এর মানে ভুল বা অশুদ্ধ কিছু লেখা নয়।

শিরোনাম অবশ্যই বস্তুনিষ্ঠ হবে। কোনো ভণিতা নয়, হেডলাইনে তথ্য জানানোর ভঙ্গি যতোটা সম্ভব সোজা হতে হবে।

শিরোনামে তথ্য দেয়ার সময় যতোটা সম্ভব জটিলতা পরিহার করতে হবে। যা বলার দরকার তা সহজ করে ও ভণিতা ছাড়া বলে দিতে হবে।

শিরোনাম অল্প কথায় লিখলেও এমনভাবে লিখতে হবে নেন তা একই সঙ্গে ব্যাখ্যামূলক ও অর্থগুণসম্পন্ন (অল্প কথাতেই জরুরি সব বিষয় থাকা) হয়।

 

হেডলাইন লেখার সময় বিবেচ্য

একটি সংবাদের হেডলাইন বা শিরোনাম লেখার সময় প্রথমেই ভাবতে হবে, ওই সংবাদটি কেন লেখা হচ্ছে, সংবাদটিতে নতুন কী আছে ও এটি না ছাপলে কী ক্ষতি হবে। এখানে যে উত্তর পাওয়া যাবে, সেখান থেকেই এর শিরোনাম লেখার রসদ পাওয়া যাবে।

অনেকগুলো সংবাদের মধ্য থেকে যেমন প্রকাশযোগ্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সংবাদ বেছে নেয়া হয়, ঠিক তেমনি বাছাইকৃত একটি সংবাদের অনেক গুলো তথ্যের মধ্যে সবচেয়ে জরুরি তথ্যটি বের করে আনতে হবে। ওই তথ্য দিয়েই লিখতে হবে শিরোনাম।

 

হেডলাইনের আকার

শিরোনামের আকার অর্থাৎ শিরোনাম কতো লাইনে বা কতো শব্দে লিখতে হবে, এটি নিয়ে অনেক ধরনের ব্যাখ্যা ও প্রস্তাব রয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও নবীন কর্মীদের মধ্যে এ নিয়ে প্রশ্ন ও বিতর্ক বেশি। তত্ত্বগতভাবে বিভিন্ন রীতি-নীতি রয়েছে, তবে এখনকার বাস্তব প্রেক্ষাপটে এর একটি বড় অংশই আর প্রয়োগের উপযুক্ত নয়।

এ ছাড়া বাংলাদেশে সাংবাদিকতা বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যেখানে শিরোনাম লেখার প্রয়োজন রয়েছে (যেমন- বিজ্ঞাপনের কপি), সে বিষয়ে মৌলিক বই প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই নেই। বই বা লেখা যা কিছু পাওয়া যায়, এর বেশিরভাগই হলো বিদেশি বইয়ের অনুবাদ বা সেগুলোর আদলে লেখা। তাই ইংরেজি বা বিদেশি অন্য কোনো ভাষায় সাংবাদিকতার প্রেক্ষাপটে লেখা বইপত্র বা রীতি-নীতি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ও বাংলা ভাষায় প্রয়োগ করতে গেলে বিভ্রান্তি ঘটাই স্বাভাবিক।

প্রথমেই আসা যাক- শিরোনাম বা হেডলাইন কতো লাইনে হবে। এজন্যে নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম বা ধরা-বাঁধা কোনো সূত্র নেই। সংবাদটি সম্পর্কে সংক্ষেপে ধারণা দেয়াই হেডলাইনের মূল কাজ। ওই কাজটি করতে যে কয়টি শব্দ লেখা দরকার, তা করতে হবে। আর ওই শব্দগুলো লিখতে যে কয়টি লাইন করা দরকার, সেটিও করতে হবে। এখানে উল্লেখ্য, একটি সংবাদকে কী ট্রিটমেন্ট (news treatment) দেয়া হচ্ছে অর্থাৎ কতো কলাম জুড়ে ছাপা হচ্ছে, এর ওপর ভিত্তি করে একই হেডলাইন বিভিন্ন সংখ্যক লাইন ধারণ করতে পারে। যেমন।

 

‘ছিনতাইকারীর গুলিতে রাজধানীতে নিহত ২’

দুই কলামজুড়ে লিখলে এটি একটিমাত্র লাইনে ধরে যাবে। এক কলামে লিখলে এটি ভেঙে একাধিক লাইনে চলে যাবে। যেমন।

‘ছিনতাইকারীর গুলিতে রাজধানীতে নিহত ২’

এর মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার কাজ করে। এখন সংবাদপত্রের পৃষ্ঠাসজ্জায় প্রযুক্তিগত পরিবর্তন ঘটেছে বেশ ব্যাপক আকারে। সেই সঙ্গে এসেছে ধারণাগত পরিবর্তনও। পাশাপাশি রয়েছে পৃষ্ঠাসজ্জার নানা জটিলতা ও এর থেকে বাঁচার প্রাণান্তকর চেষ্টা।

পৃষ্ঠাসজ্জা করতে গিয়ে অনেক সময় দেখা যায়, একাধিক লাইনে লেখা হেডলাইনসহ একটি সংবাদ পাতায় বসানোর জন্যে যথেষ্ট জায়গা খালি নেই। তখন প্রথমে সংবাদটিকে কেটে-ছেঁটে একটু কমিয়ে ছোট করে আনার চেষ্টা করা হয়।

এরপরও কাজ না হলে অর্থাৎ সংবাদটি থেকে বাদ দেয়ার মতো কোনো অংশ না পাওয়া গেলে তখন হেডলাইন থেকে শব্দ কমিয়ে বা শব্দসংখ্যা ঠিক রেখেই লাইন কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। আবার এর উল্টোটিও ঘটে।

যদি এতটাই অল্প জায়গা খালি থেকে যায় ও সেখানে অন্য একটি সংবাদ বসানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গা না থাকে, আবার ওই সংবাদেও নতুন করে কিছু যোগ করে সেটির আকার বাড়ানোর সুযোগ বা সময় না থাকে, তখন হেডলাইনের লাইনের সংখ্যা আগের চেয়ে বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়।

এ ক্ষেত্রে আগের হেডলাইনের শব্দসংখ্যা পর্যাপ্ত না হলে নতুন করে শব্দও এতে জুড়ে দেয়া হয়। হেডলাইন কতো শব্দে লিখতে হবে, এখানেও একই কথা প্রযোজ্য। কোনো কোনো লেখক ১ থেকে ৯ শব্দের মধ্যে হেডলাইন লেখার কথা বলেছেন। কেউ পরামর্শ দিয়েছেন হেডলাইনের সংখ্যা ১১ শব্দের মধ্যে সীমিত রাখতে। কোথাও কোথাও এ সংখ্যা বলা হয়েছে ১৪। কিন্তু বাস্তবে লাইনের ক্ষেত্রে যেমন প্রয়োজন অনুযায়ী প্রয়োগ হচ্ছে, তেমনি শব্দের সংখ্যার ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটছে।

এভাবে আসলে কেতাবি কায়দা-কানুন সবসময় মেনে চলা সম্ভব হয়ে ওঠে না, আর এর প্রয়োজনও পড়ে না। বর্তমানে, বিশেষ করে বাংলাদেশের কথাই ধরা যাক, বেশিরভাগ সাংবাদিকই পাওয়া যাবে যারা সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন না।

এমনকি স্কুল- কলেজের গণ্ডি পেরোনোর পর কারো কারো আর পরবর্তী স্তরে আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেয়া হয়নি। আবার সাংবাদিকতায় আসার পর যে এ বিষয়ে তারা নিজের আগ্রহেও বিষয়ে বই-পত্র ঘেঁটেছেন, তা-ও হয়তো নয়। তাদের পক্ষে হেডলাইন লেখার এসব নিয়ম-কানুন জানার সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে।

কিন্তু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় তার বেশ ভালো হেডলাইন লেখায় পারদর্শী হয়ে গেছেন। তাই পুঁথিগত নিয়ম-কানুন মালার ব্যাপারটি আসলে সবসময় বাধ্যতামূলক নয়। তবে অবশ্যই মনে রাখা দরকার, এর মানে এই নয় যে এসব নিয়ম-কানুন ভুল বা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় কিছু। বরং সেগুলো জেনে-বুঝে রাখলে পরে নিয়ম মেনে ও না মেনে- দুভাবেই ভালো হেডলাইন লেখা যায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে।

আসলে ব্যাপার হচ্ছে, শুধু চেষ্টা করা উচিত, সবচেয়ে কম কথায় কতো ভালো করে একটি তথ্য হেডলাইনে তুলে ধরা যায়। এর সঙ্গে পৃষ্ঠাসজ্জার দিকগুলোর সমন্বয় রেখে যে কয়টি লাইন বা শব্দ লেখার দরকার পড়ে, লিখতে হবে। এতে যদি পুঁথিগত তত্ত্ব ভাঙার দরকার পড়ে, ভাঙতে হবে। মনে রাখা দরকার, ভালো হেডলাইন লেখার প্রয়োজনে হেডলাইন লেখার নিয়ম ভাঙাও একটি বড় স্বীকৃত নিয়ম।

 

হেডলাইন লেখার নিয়ম-কানুন

হেডলাইন লেখার কিছু নিয়ম-কানুন রয়েছে। এগুলো অনুসরণ করলে ভালো হেডলাইন লেখা যায়। তবে দেশ ও লেখকভেদে এসব নিয়ম-কানুনে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়। এখানে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়ম উল্লেখ করা হলো:

হেডলাইনের কাজই হচ্ছে কম কথায় সংবাদটি সম্পর্কে ধারণা দেয়া। তাই কম কথাতেই লেখার চেষ্টা করতে হবে। হেডলাইন অযথা বেশি শব্দে না লেখাই ভালো। কম কথায় লিখলে অস্পষ্টতা তৈরি হলে প্রয়োজনে শব্দের সংখ্যা বাড়ানো যাবে।

একবার পড়েই যেন অর্থ বোঝা যায়, এমন সহজ করে হেডলাইন লিখতে হবে।

হেডলাইনে কখনোই কঠিন শব্দ ব্যবহার করা চলবে না। পড়তে বা বুঝতে অসুবিধা হয়- হেডলাইনে এমন শব্দ লিখলে পাঠক বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে।

সংবাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি দিয়েই হেডলাইন লেখার চেষ্টা করতে হবে। হেডলাইনে একই সঙ্গে শোল্ডার ও কিকার ব্যবহার না করাই ভালো।

হেডলাইনে কখনোই অনেক বেশি তথ্য দেয়া ঠিক নয়। এতে হেডলাইন বড় ও জটিল আকার ধারণ করে এবং পুরো সংবাদ পাঠে পাঠকের অনাগ্রহ তৈরি হতে পারে।

হেডলাইনে 5W1H-এর মধ্যে সবচেয়ে জরুরি অংশটির উল্লেখ থাকতে হবে। হেডলাইন যথাসম্ভব কর্তৃবাচো ও প্রত্যক্ষ উক্তিতে (active voice) লেখার চেষ্টা করতে হবে। এতে হেডলাইনের জোর বাড়ে। যেমন। ‘সন্ত্রাসীদের গুলিতে গেল ব্যবসায়ীর প্রাণ’-এভাবে না লিখে ‘ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করল সন্ত্রাসীরা’-এভাবে লিখলে হেডলাইন অনেক বেশি জোরালো ও কার্যকর হয়।

বর্তমান কালে (present tense) লেখার চেষ্টা করতে হবে। তা সম্ভব না হলে অর্থাৎ এতে অর্থের তারতম্য ঘটার আশঙ্কা থাকলে সুদূর অতীতে না লিখে যতোটা সম্ভব নিকট অতীত কাল দিয়ে লেখার চেষ্টা করা দরকার। এতেও হেডলাইন জোরালো হয়। যেমন ‘ত্রাণের টাকা চুরি করে পালিয়ে গিয়েছিলেন এমপি’ – এভাবে না লিখে ‘ত্রাণের টাকা চুরি করে পালালেন এমপি’ লিখলে ভালো হয়। এভাবে

হেডলাইনে অখ্যাত বা কম পরিচিত-অপরিচিত জায়গা চিহ্নিত করে দিতে হবে। যেমন। ‘দুপচাঁচিয়ায় শিবিরের ৩ নেতা-কর্মী আটক’ বললে অনেকে না- ও চিনতে পারে। তাই বলতে হবে ‘বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় শিবিরের ৩ নেতা- কর্মী আটক’। কিংবা প্রথমে শুধু বগুড়া বলে পরে ইন্ট্রো-তে বগুড়ার কোথায়, তা বলা যেতে পারে।

সর্বোপরি, হেডলাইন কেন লেখা হয় আর এর কাজ কী, সেটি মাথায় রেখেই হেডলাইন লিখতে হবে। হেডলাইন লেখার উদ্দেশ্যটি বুঝতে পারলে ও সময়মতো সেটি মনে করতে পারলেই আসলে একটি ভালো হেডলাইন লেখা সম্ভব।

American Writers & Artists নামের একটি কর্তৃপক্ষ কপিরাইটিং বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেয়ার সময় হেডলাইন লেখার একটি বিশেষ কৌশল প্রয়োগ করে। কৌশলটি ‘The Four Us’ হিসেবে পরিচিত। এটি হলো:

১. Be USEFUL to the reader

২. Provide him with a sense of URGENCY

৩. Convey the idea that the main benefit is somehow UNIQUE and

৪. Do all of the above in an ULTRA-SPECIFIC way.

কপিরাইটার ও লেখক Clayton Makepeace তাঁর এক লেখায় ৬টি প্রশ্নের উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, হেডলাইন লেখা শুরু করার আগে নিজেকে ওই প্রশ্নগুলো করতে হবে। তাহলে একটি ভালো হেডলাইন লেখা সম্ভব। প্রশ্নগুলো হলো:

১. Does your headline offer the reader a reward for reading?

২. What specifics could you add to make your headline more intriguing and believable?

৩. Does your headline trigger a strong, actionable emotion the reader already has about the subject at hand?

৪. Does your headline present a proposition that will instantly get your prospect nodding his or her head?

৫. Could your headline benefit from the inclusion of a proposed transaction?

৬. Could you add an element of intrigue to drive the prospect into your opening copy?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নিজের কাছে কী পাওয়া যাচ্ছে তা বিবেচনা করলে একটি ভালো হেডলাইন লেখার দিকনির্দেশনা পাওয়া যেতে পারে।

 

হেডলাইনের প্রকারভেদ

হেডলাইন লেখার স্টাইল

হেডলাইন বা শিরোনাম লেখার অনেক ধরনের স্টাইল রয়েছে। পত্রিকার নিজস্ব পৃষ্ঠাসজ্জা নীতি অনুযায়ী অনেক সময় শিরোনাম লেখার ধরন বা স্টাইলে ভিন্নতা আসতে পারে। তবে এর সুযোগ খুব কম। ব্যবহারিক দিক থেকে ট্রিটমেন্টের ব্যাপারটি দেখলে সিঙ্গেল কলাম (S/C), ডাবল কলাম (D/C), ট্রিপল কলাম (3/C), ফোর কলাম (4/C) – এভাবে চলতে থাকবে। শিরোনাম লিখতে সাধারণভাবে সংবাদপত্রে মূলত দুই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। যেমন:

১. উল্লম্ব (vertical emphasis)

২. আনুভূমিক (horizontal emphasis)

হেডলাইনের গঠন কাঠামো গঠন কাঠামো অনুযায়ী হেডলাইন নিম্নোক্ত ৩ ধরনের হতে পারে:

১. পিরামিড কাঠামো

২. উল্টো পিরামিড কাঠামো

৩. মিশ্র পিরামিড কাঠামো

 

পিরামিড কাঠামো

এ কাঠামোয় লেখা হেডলাইন ওপর থেকে নিচের দিকে ক্রমশ প্রশস্ত হতে থাকে। যেমন:

যাত্রাবাড়িতে দুর্বৃত্তদের হাতে দুই ব্যবসায়ীর মৃত্যু

উল্টো পিরামিড কাঠামো উটকাঠামোয় লেখা শিরোনাম ওপর থেকে নিচের দিকে ক্রমশ অপ্রশস্ত বা ছোট হতে। থাকে। যেমন।

যাত্রাবাড়িতে দুর্বৃত্তদের হাতে ব্যবসায়ীর মৃত্যু

 

মিশ্র পিরামিড কাঠামো

এ কাঠামোয় লেখা শিরোনাম ওপর থেকে নিচের দিকে ক্রমশ অপ্রশস্ত হয়ে আবারো প্রশস্ত হয়ে শেষ হয়। যেমন:

রাজধানীর যাত্রাবাড়িতে দুর্বৃত্তদের হাতে দুই ডিশ ব্যবসায়ীর মৃত্যু

 

হেডলাইন বিন্যাসে ভারসাম্য

হেডলাইন বিন্যাসে মূলত নিম্নোক্ত দুই ধরনের ভারসাম্য দেখা যায়।

১. কেন্দ্রমুখী ভারসাম্য (centre balance)

২. কেন্দ্র বহির্মুখী ভারসাম্য (off-centre balance)

কেন্দ্রমুখী ভারসাম্যে লেখা শিরোনামের আকারের কয়েকটি উদাহরণ হতে পারে:

 

রাজধানীতে ১০ লাখ টাকা ছিনতাই

অথবা

মিরপুরে প্রকাশ্যে গুলি করে দুই লাখ টাকা ও গাড়ি ছিনতাই

অথবা

মিরপুরে প্রকাশ্যে দুজনকে ছিনতাই

 

 

বিভিন্ন ধরনের হেডলাইন লেখা

হেডলাইনের প্রকারভেদ বিভিন্ন আঙ্গিকে হতে পারে। নানা দিক থেকে একে বিভিন্নভাবে বিচক করা যায়। এর কোনো কোনোটি পূর্বোক্ত ধরনগুলোর একাধিক শ্রেণীতে পড়ে। সাদৃশ্য বা বৈসাদৃশ্যের দিকটি বাদ দিয়ে আলাদাভাবে আলোচনা করলে ব্যবহারিক দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত প্রকারগুলো নিম্নরূপ।

ক্লাশ লেফট বা লেফট অ্যালাইনড

ফ্লাশ রাইট বা রাইট অ্যালাইনড ও

সেন্টার ব্যালেন্সড

ওয়েস্টলাইন বা কটিরেখ

 

পৃষ্ঠাসজ্জার সময় হেডলাইনের লাইনগুলো কিভাবে বিন্যস্ত করা হয়, এর ওপর ভিত্তি করে এ বরনগুলো তৈরি হয়েছে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, তত্ত্বগতভাবে ‘ফ্লাশ লেফট’ ও ফ্লাশ রাইটা উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে বিভিন্ন সংবাদপত্র অফিসে পৃষ্ঠাসজ্জার সময় এদের সাধারণত যথাক্রমে ‘লেফট অ্যালাইনড’ ও ‘রাইট অ্যালাইনড’ হিসেবেই উল্লেখ করা হয়ে থাকে।

 

লেফট অ্যালাইনড হেডলাইন

এ ধরনের হেডলাইনের প্রতিটি লাইন বাম দিক থেকে শুরু হয়ে ডান দিকে সরে যায়। বাম দিকে প্রতিটি লাইন একই অবস্থান থেকে শুরু হয়। সংবাদপত্রে এ ধরনের হেডলাইন সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়। এর কাঠামোটি দেখতে নিম্নরূপ হতে পারে।

 

এখানের হেডলাইনের একটি উদাহরণ হতে পারে।

নওগাঁয় শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুলের অভিযোগে ভাংচুর

 

রাইট অ্যালাইনড হেডলাইন

এ ধরনের হেডলাইনের প্রতিটি লাইন ডান দিকে মিল রেখে লেখা হয়। বাম দিকে অসমান থাকলেও প্রতিটি লাইন ডান দিকে একই অবস্থানে গিয়ে মিলে যায়। সংবাদপত্রে সাবারণত একেবারে শেষের কলামে বিশেষ ধরনের কোনো সংবাদ বা ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সম্পূর্ণ কলামটিকে আলাদা করে বোঝাতে ওই কলামের সংবাদগুলোর হেডলাইন এবং সংবাদও এ কৌশলে লেখা হয়। এর কাঠামোটি দেখতে নিম্নরূপ।

এ ধরনের কাঠামোর হেডলাইনের একটি উদাহরণ হতে পারে:

 

নওগাঁয় শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুলের অভিযোগে ভাংচুর

 

সেন্টার ব্যালেন্সড্ হেডলাইন

এভাবে লেখা হেডলাইনের বাক্য তথা লাইনগুলো মাঝখানে ভারসাম্যে থাকে। ডান ও বাম দিকে এর কোনো ভারসাম্য থাকে না। এর কাঠামোটি দেখতে নিম্নরূপ হতে পারে।

 

এ ধরনের কাঠামোতে লেখা হেডলাইনের উদাহরণ হতে পারে:

 

নওগাঁয় শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল থাকার অভিযোগে ভাংচুর

 

এ ধরনের (সেন্টার ব্যালেন্সড্) হেডলাইন আজকাল খুব একটা ব্যবহার করা হয় না। কিছুদিন আগেও এটি খুব ব্যবহৃত হতো। ইদানিং এ কাঠামোয় হেডলাইন লেখার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাচ্ছে।

 

ওয়েস্টলাইন বা কটিরেখ হেডলাইন

এভাবে লেখা হেডলাইন দেখতে অনেকটা সেন্টার ব্যালেন্সড হেডলাইনের মতো। তবে এর মাঝখানের লাইনটির দৈর্ঘ্য এর ওপর ও নিচের লাইনের চেয়ে একটু ছোট থাকে।

এর কাঠামোটি দেখতে নিম্নরূপ হতে পারে:

এর একটি উদাহরণ হতে পারে।

নওগাঁয় শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নে ভুল থাকার অভিযোগে ভাংচুর

দেখতে অনেকটা মানুষের কটিদেশ অর্থাৎ কোমরের মতো হওয়ায় এর এমন নামকরণ হয়েছে। এর বাক্য তথা লাইনগুলো মাঝখানে ভারসাম্যে থাকে। ডান ও বাম দিকে এর কোনো ভারসাম্য থাকে না।

 

স্টেপড বা সিঁড়ি হেডলাইন

এ ধরনের হেডলাইনে বাক্য তথা লাইনগুলো একটি থেকে অন্যটি একটু করে সরে যেতে থাকে। এর কাঠামোটি দেখতে নিম্নরূপ হতে পারে:

এ ধরনের কাঠামোতে লেখা হেডলাইনের উদাহরণ হতে পারে:

নওগাঁয় শিক্ষক নিয়োগ

পরীক্ষার প্রশ্নপত্রে ভুল থাকার

অভিযোগে ভাংচুর

একসময় খুব ব্যবহার হলেও এ ধরনের কাঠামোর হেডলাইন এখন আর চোখে পড়ে না।

 

হেডলাইনের আরো কিন্তু ধরুন

(Banner) যা ফলাও হেডলাইন।

কোনো কোবের সংবাদ প্রতি প্লায়েন্ট এ উপস্থাপন করা যায় না। এ ধরনের গুরুত্ববহ সংবাদের হেডলাইন সাধারণত ৬ থেকে ৮ কলাম জুড়ে হাপা হয়। তখন একে বাবার বা স্বলাও শিরোনাম বলে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো দলের জয়ের খবর, ক্রিকেট দলের বড় কোলে টুর্ণামেন্ট ভয়ের খবর, একটি দেশের অন্য একটি দেশে আগ্রাসন বা আক্রমণের খবর এ ধরনের দিয়োনাথে হয়ে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রে ব্যানার শিরোনামকে ডেকার (Decker) বা স্ট্রিমার (Suster)-ও বলা হয়।

 

স্কাইলাইন (Skyline) বা উড়ালরেখা হেডলাইন

তখনো কখনো এমন কোনো ঘটনা ঘটতে পারে যার গুরুত্ব ব্যানার শিরোনাম দিয়েও যেন ঠিকভাবে প্রকাশ করা যায় না। এসব ঘটনায় অনেক সময় পত্রিকাগুলো নেমপ্লেটকে নিচে নামিয়ে দিয়ে এর ওপরে পুরো ৮ কলাম জুড়ে শিরোনাম বসিয়ে দেয়। এ ধরনের শিরোনামই হলো স্কাইলাইন বা উড়ালরেখা শিরোনাম।

 

ব্রুসলাইন (Crossline) হেডলাইন

এ ধরনের শিরোনাম সাধারণত একটি লাইনে হয় ও লাইনটি কলামের বাম থেকে ডান দিকে বিস্তৃত থাকে। সাধারণত এক কলাম জুড়েই এ ধরনের শিরোনাম লেখা হয়।

 

ব্যাংক (Bank) ও ডেক (Deck)

কোনো শিরোনামের যদি দুটি অংশ থাকে তবে ওপরের অংশকে ডেক ও নিচের অংশকে ব্যাংক বলে। ডেককে অনেক সময় আইব্রো (cycbrow) বা ওভারহেড (overhead)- বলে।

 

শোল্ডার (Shoulder) বা কিকার (Kicker)

কোনো শিরোনামের একাধিক অংশ থাকলে মূল শিরোনামের ওপরে সংবাদের ঘটনার পটভূমি বা পরিচয় নির্দেশক অংশটিকে শোল্ডার বা কিকার বলে। যেমন:

অপহৃত শিশুকে হত্যা বিচার চেয়ে মিরপুরে এলাকাবাসীর বিক্ষোভ

 

ট্যাপলাইন (Strapline)

একটি শিরোনামের ওপরে পরিচিতি বা নির্দেশক অংশটিকে দীর্ঘায়িত না করে একটি বা দুটি শব্দে বলে দেয়া হলে সেটিকে স্ট্র্যাপলাইন বলে।

 

সংস্কৃতি বিষয়ক কোনো সংবাদের ক্ষেত্রে একটি দীর্ঘ শিরোনামের ওপর শুধু ‘সংস্কৃতি’ কথাটি লিখে দিয়ে সংবাদের ধরনটি বুঝিয়ে দেয়া হলে সেটি স্ট্যাপলাইনের উদাহরণ হবে।

 

হ্যাংগার (Hanger)

ফলাও বা এ ধরনের বড় কোনো ঘটনার ক্ষেত্রে মূল শিরোনামে মূল কথাটি বলে দিয়ে নিচে একটু ছোট হরফে আরো কিছু তথ্য অনেক সময় দিয়ে দেয়া হয়। সেগুলো হ্যাংগার।

 

সাব হেড (Sub head)

একটি শিরোনামের নিচে শুরু হওয়া সংবাদের ভেতর যদি আরো অনেক ঘটনাকে আলাদা করে ছোট শিরোনাম দিয়ে চিহ্নিত করে দেয়া হয় তবে নতুন ওই প্রতিটি শিরোনামকে সাব হেড বলে।

 

জাম্প (Jump) ও জাম্প হেড (Jump head)

অনেক সংবাদ একটি পাতার যেখানে শুরু হয়, সেখানেই শেষ না হয়ে ভেতরে অন্য কোনো পাতায় গিয়ে শেষ হয়। মূলত প্রথম ও শেষ পাতার সংবাদের ক্ষেত্রেই এমনটি দেখা যায়। সংবাদের যে অংশটি ভেতরে অন্য কোনো পাতায় চলে যায়, সেটি হলো জাম্প বা জাম্পলাইন (jumpline) এবং সেখানে সংবাদটিকে চিহ্নিত করে দিতে ছোট করে যে শিরোনামটি লেখা হয়, সেটি হলো জাম্প হেড।

 

রিভার্স প্লেট (Reverse plate)

সাধারণত সাদা কাগজের ওপর কালো কালিতে শিরোনাম লেখা হয়। কিন্তু কখনো কখনো সংবাদটিকে আলাদা করে গুরুত্ব দিতে কালো রঙের ওপর সাদা হরফে শিরোনাম লেখা হয়ে থাকে। এটিকে বলে রিভার্স প্লেট।

 

বক্স প্লেট (Box plate)

যদি কোনো শিরোনামকে একটি বক্স বা বেষ্টনীর মধ্যে আনা হয় তবে সেটিকে বক্স প্লেট বলে।

 

অর্থের দিক থেকে হেডলাইনের প্রকারভেদ

তত্ত্বগতভাবে এগুলো কোনো প্রকারভেদ নয়। তবে বাস্তবতার আলোকে অর্থাৎ ব্যবহারিক পর্যায়ে সাংবাদিকতার নানা ক্ষেত্রে যেভাবে হেডলাইন লেখা হয়ে থাকে, সেদিক থেকে অর্থের ভিত্তিতে হেডলাইনগুলোকে এভাবে শ্রেণীবদ্ধ করার ব্যাপারে আমি ব্যক্তিগতভাবে পক্ষপাতী:

প্রত্যক্ষ হেডলাইন (Headline with direct meaning) ও

পরোক্ষ হেডলাইন (Headline with indirect meaning)

 

 

প্রত্যক্ষ হেডলাইন

সংবাদ মাধ্যমগুলো খাঁটলে দেখা যাবে, এগুলোতে সেখা সখা বেশিরভাগ সংবাদের হেডলাইনই সরাসরি অর্থ বহন করে। এগুলোকে এ শ্রেণীতে ফেলা যেতে পারে। যেমন:

ডিসিসির জ্বালানি খরচ মাসে কোটি টাকা বেড়ে গেছে

এই হেডলাইনে কোনো ভণিতা না করে অর্থাৎ পরোক্ষ বা রূপক শব্দ বা কথা না বলে সরাসরি মূল তথ্যটি বলে দেয়া হয়েছে। তাই এদেরকে ‘প্রত্যক্ষ হেডলাইন’ বলা যেতে

 

 

পরোক্ষ হেডলাইন

অনেক সময় কিছু সংবাদের হেডলাইনে সরাসরি মূল কথা না লিখে একটু ভণিতা করে, ভিন্ন আঙ্গিকে লেখার চেষ্টা করা হয়। এ ধরনের হেডলাইনে প্রবাদ-প্রবচন বা বাগধারা থেকে শুরু করে নানা ধরনের রূপক শব্দ বা শব্দগুচ্ছ প্রয়োগ করা হয়। এগুলোকে “পরোক্ষ হেডলাইন’ এর শ্রেণীতে ফেলা যেতে পারে।

বিভিন্ন দিনে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত এ ধরনের কয়েকটি হেডলাইন দেখা যেতে পারে:

 

শিশুটির কী দোষ!

কী দোষ ছিল ফুটফুটে শিশুটির!

নিষ্পাপ এই শিশুটির কী দোষ?

বাকপ্রতিবন্ধী শিশুটি কী দোষ করেছিল!

প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি যে লাউ সেই কদু!

চোর বটে!

একের পাপে অন্যের সাজা!

 

এগুলোর কোনোটি দিয়েই মূল কথাটি বোঝার কোনো উপায় নেই, এজন্যে পুরো সংবাদটি পড়তে হবে। হেডলাইন লেখার বহুল প্রচলিত তত্ত্ব বা নিয়ম-কানুন এখানে মানা হয়নি। বরং কেতাবি নিয়ম কিছুটা উপেক্ষা করে হেডলাইনগুলোকে পাঠকের কাছে আরো বেশি আকর্ষণীয় করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। এভাবে লেখা হেডলাইনকে ‘পরোক্ষ হেডলাইন’ বলা যেতে পারে।

 

 

মো: গোলাম মাওলা শাওন
প্রকাশক ও সম্পাদক
দৈনিক বাংলার আলো নিউজ

চলবে