‘একটি আক্ষেপই তাড়া করে ফিরছে, কেউ যদি আব্বুকে বসতে দিতেন’
নিজস্ব প্রতিবেদক
মেট্রোরেলে যাতায়াতের সময় অসুস্থ হয়ে বাবার মৃত্যুর ঘটনায় আশপাশের মানুষের মানবিক আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় সদস্য নাকিবুর রহমান। তার অভিযোগ, অসুস্থ বোধ করে বসতে চাইলেও বাবাকে কেউ আসন ছেড়ে দেননি। পরে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় স্ট্রোক করে মেট্রোরেলের ভেতরেই পড়ে যান তিনি এবং অল্প সময়ের মধ্যে মারা যান।
গত ২৪ অক্টোবর দুপুরে শাহবাগ থেকে উত্তরা যাওয়ার পথে শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়া স্টেশনের মধ্যবর্তী এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছেন নাকিবুর রহমান।
নাকিবুর রহমানের বাবা নজীবুর রহমান জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। ২৪ অক্টোবর বিকেলে মেট্রোরেলে অসুস্থ হয়ে তার মৃত্যু হয়। বাবার মৃত্যুর পর একটি আক্ষেপই তাড়া করে ফিরছে ছেলে নাকিবুরকে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) তিনি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘ছেলে হিসেবে আজীবন একটাই আক্ষেপ থাকবে, কেউ যদি আব্বুকে বসতে দিতেন। তাহলে হয়তো বাবা এভাবে নিচে না পড়ে, কারও কোলে মাথা রেখে মারা যেতে পারতেন।’
নাকিবুর রহমান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য। পাশাপাশি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।
তিনি জানান, ২৪ অক্টোবর সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের একটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে যান তার বাবা। অনুষ্ঠান শেষে বেলা তিনটার দিকে শাহবাগ মেট্রোস্টেশন থেকে উত্তরার উদ্দেশে মেট্রোরেলে ওঠেন তিনি। তার সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক। তার কাছ থেকেই তিনি এ ঘটনা শুনেছেন।
কয়েক দিনের ছুটি শেষ হওয়ায় সেদিন মেট্রোরেলে প্রচণ্ড ভিড় ছিল। বসার আসন না পেয়ে দুজনই ভেতরের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ভিড়ের মধ্যে ঠেলাঠেলিতে একপর্যায়ে তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।
নাকিবুর রহমান জানান, বেলা সাড়ে তিনটার দিকে মেট্রোরেল শেওড়াপাড়া এলাকায় পৌঁছালে ঠেলাঠেলির মধ্যে তার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় সিটে বসে থাকা যাত্রীদের কাছে কয়েকবার বসার সুযোগ চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কেউ সাড়া দেননি। এর এক থেকে দুই মিনিটের মধ্যে তিনি মেঝেতে পড়ে যান।
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা যাত্রীরা তাকে ধরে তোলার চেষ্টা করেন। শোরগোল শুনে বাবার সহকর্মীও পরে সেখানে আসেন। অন্য যাত্রীদের সহায়তায় পরীক্ষা শেষে বুঝতে পারেন, নজীবুর রহমান বেঁচে নেই। নাকিবুরের ধারণা, মেট্রোরেলের ভেতরে পড়ে যাওয়ার সময়ই তার বাবার মৃত্যু হয়েছিল।
নাকিবুর রহমান জানান, তার বাবার ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ ছিল। বাবাকে মেট্রোরেলের উত্তরা উত্তর স্টেশনে নামানোর পর আনসার সদস্যদের সহায়তায় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করা হয়।
পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালে নেওয়া হয়। বাবার সহকর্মীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে সেখানে যান তিনি। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে চিকিৎসকেরা তার বাবাকে আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত ঘোষণা করেন। বাবার মৃত্যুর সময় পরিবারের কেউ পাশে ছিলেন না।
নাকিবুর জানান, তার মা ও ছোট ভাই ওমরাহ পালনে সৌদি আরবে ছিলেন। সৌদি আরবের বিমানের টিকিটসংক্রান্ত জটিলতায় তারা সময়মতো দেশে ফিরতে পারেননি। তার বোন পরিবার নিয়ে নিউজিল্যান্ডে থাকেন। আরেক ভাইও সেখানে পড়াশোনা করেন। তারাও বাবার মৃত্যুর পর দেশে আসতে পারেননি। পরিবারের এই সদস্যদের ছাড়াই বরিশালের গৌরনদী উপজেলায় গ্রামের বাড়িতে নজীবুর রহমানকে দাফন করা হয়।
বাবার মৃত্যুর ঘটনা বলতে গিয়ে নাকিবুর বলেন, ‘আমি কাউকে দোষারোপ করছি না। যে কেউ এমন পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন। বয়স্ক মানুষের প্রতি আমাদের সবার সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। তাদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করুন।’