ঢাকা , শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬ , ২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সারা বছরের পরিশ্রমেও মিলছে না খরচ, ধানের দাম নিয়ে দু'শ্চি'ন্তা'য় কৃষক

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-১১-০৬ ১১:৫১:০১
সারা বছরের পরিশ্রমেও মিলছে না খরচ, ধানের দাম নিয়ে দু'শ্চি'ন্তা'য় কৃষক সারা বছরের পরিশ্রমেও মিলছে না খরচ, ধানের দাম নিয়ে দু'শ্চি'ন্তা'য় কৃষক
নিজস্ব প্রতিবেদক

মাঠজুড়ে পাকা ধানের সোনালি আভা। কোথাও চলছে ধান কাটা, কোথাও কাটা ধান ঘরে তোলার ব্যস্ততা। সারা বছরের পরিশ্রমের ফসল ঘরে তুলতে ব্যস্ত সাতক্ষীরার কৃষকরা। তবে ফসল ঘরে উঠলেও স্বস্তি নেই তাদের। উৎপাদন খরচের তুলনায় ধানের বাজারদর কম হওয়ায় এবার লোকসানের শঙ্কায় পড়েছেন চাষিরা। কৃষকদের হিসাবে, প্রতি বিঘা জমিতে আমন ধান উৎপাদনে খরচ হচ্ছে ২৩ থেকে ২৪ হাজার টাকা। এক বিঘায় গড়ে ১০ থেকে ১২ বস্তা ধান পাওয়া যাচ্ছে। ৬০ কেজির প্রতি বস্তা ধান বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকায়। এতে এক বিঘা জমির ধান বিক্রি করে সর্বোচ্চ আয় হচ্ছে ২১ হাজার ৬০০ টাকা। ফলে খড় বিক্রির আয় বাদ দিলে অনেক কৃষকেরই ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ উঠছে না। সাতক্ষীরা সদর

উপজেলার নারানজোল গ্রামের কৃষক আজারুল ইসলাম বলেন, প্রতি বিঘা জমিতে এবার ধান উৎপাদনে প্রায় ২৪ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এক বিঘায় গড়ে ১০ থেকে ১২ বস্তা ধান পাওয়া যায়। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচ তোলা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, সারা বছর এত কষ্ট করে চাষাবাদ করি, অথচ ফসল বিক্রি করে খরচই তুলতে পারছি না। তাহলে সারা বছর খাব কী, সংসার চালাব কীভাবে? এভাবে চলতে থাকলে না খেয়ে দিন কাটাতে হবে। একসময় বাধ্য হয়ে চাষাবাদই বন্ধ করে দিতে হবে। ধান কাটার মৌসুমে বাড়তি শ্রমিক খরচও কৃষকদের ওপর চাপ তৈরি করেছে। কৃষক পলাশ হোসেন বলেন, এক বিঘা জমির ধান কেটে বেঁধে দিতে প্রায় ৩ হাজার টাকা শ্রমিক খরচ হচ্ছে। সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ৫ ঘণ্টার কাজের জন্য একজন শ্রমিককে ৫০০ টাকা এবং বিকেলের পালায় একই সময়ের কাজের জন্য ৩০০ টাকা দিতে হচ্ছে। তিনি বলেন, একজন পুরুষ শ্রমিককে সকাল-বিকেল মিলিয়ে ৮ ঘণ্টা কাজের জন্য ৮০০ টাকা এবং নারী শ্রমিককে ৭ ঘণ্টার কাজের জন্য ৭০০ টাকা দিতে হচ্ছে। শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় ধান ঘরে তোলার খরচও বাড়ছে। কলারোয়া উপজেলার কৃষক আতাউর রহমান বলেন, গত বছরের তুলনায় উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হলেও ধানের দাম বেড়েছে মাত্র ১০০ টাকা। অনেক কৃষক ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেন। ধান কাটার পর ঋণ পরিশোধ ও সংসারের প্রয়োজন মেটাতে তাঁদের বাধ্য হয়ে প্রচলিত বাজারদরেই ধান বিক্রি করতে হয়। ঝাউডাঙ্গা ধানবাজারে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষক রিপন হোসেন বলেন, আজ ৬০ কেজির এক বস্তা ধান ১ হাজার ৬৩০ টাকায় বিক্রি

করেছি। এক বস্তা সার কিনতে ডিলারের কাছে গেলে বলে সার নেই। সরকার যদি সারের বিষয়ে আমাদের প্রতি একটু খেয়াল করে, তাহলে কৃষকদের সুবিধা হয়। ধানের চাহিদা কম থাকায় বাজারে দাম বাড়ছে না বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরাও। ব্যবসায়ী অশিষ ঘোষ বলেন, ধান বিক্রি নেই, চালও অবিক্রি পড়ে আছে। ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা দরে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে কৃষক না খেয়ে মরার মতো অবস্থায় পড়ছে। চাল বিক্রি নেই, ধান বিক্রি নেই—মানুষ খাবে কী করে? তিনি বলেন, চাতালে ধানের চাহিদা কম। ব্যবসায়ীদের গুদামেও ধান মজুত রয়েছে। ফলে নতুন করে ধান কেনার আগ্রহ কম থাকায় বাজারে ধানের দামও বাড়ছে না। কৃষকদের দাবি, উৎপাদন খরচ বিবেচনায় ধানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা এবং কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করার ব্যবস্থা করতে হবে। সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ ইকবাল আহমেদ বলেন, এবার সাতক্ষীরা জেলায় ৯৯ হাজার ১৬০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০ হেক্টর বেশি। অনুকূল বৃষ্টিপাতের কারণে কৃষকদের সেচ খরচ কমেছে। তবে প্রতি বিঘায় ধান উৎপাদনে খরচ হয়েছে ২৩ থেকে ২৪ হাজার টাকা। তিনি বলেন, এবার প্রতি হেক্টরে গড়ে ৪ দশমিক ৪৭ টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৪ লাখ ৩ হাজার টন ধান উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। কৃষকের উৎপাদন খরচ বিবেচনায় প্রতি কেজি ধান ৩৫ টাকায় বিক্রি করতে না পারলে তারা লাভবান হতে পারবেন না। এর কম দামে বিক্রি করলে লোকসানে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে ধানের পাশাপাশি খড় বিক্রি করে কিছুটা ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ধান কাটার মৌসুমে মাঠজুড়ে ফসল ঘরে তোলার ব্যস্ততা থাকলেও বাজারদর নিয়ে স্বস্তিতেনেই কৃষকরা।

উৎপাদন খরচ, শ্রমিকের মজুরি ও কৃষি উপকরণের ব্যয়ের সঙ্গে ধানের বর্তমান বাজারদরের ব্যবধানই এখন তাদের বড় দুশ্চিন্তা। ফলে সারা বছরের পরিশ্রমের ফসল ঘরে তুলেও লাভের মুখ দেখার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না সাতক্ষীরার কৃষকরা।


নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ