ঢাকা , শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ , ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গরুর ভাইরাস এবার মানুষের শরীরে ফ্রান্সে শামন্ডা ভাইরাসে প্রথম মানব সংক্রমণ: বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা?

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-১০-৩১ ০১:৪৬:০৮
গরুর ভাইরাস এবার মানুষের শরীরে ফ্রান্সে শামন্ডা ভাইরাসে প্রথম মানব সংক্রমণ: বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা? গরুর ভাইরাস এবার মানুষের শরীরে ফ্রান্সে শামন্ডা ভাইরাসে প্রথম মানব সংক্রমণ: বাংলাদেশের জন্য কী শিক্ষা?
নিজস্ব প্রতিবেদক

অধ্যাপক ড. এম. আরিফুল ইসলাম প্রাণী কল্যাণ ও আচরণ ল্যাবরেটরি, মেডিসিন বিভাগ ভেটেরিনারি অনুষদ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২ -------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------- গবাদিপশুর রোগ হিসেবে পরিচিত শামন্ডা ভাইরাস (Shamonda virus) এবার প্রথমবারের মতো মানুষের শরীরে শনাক্ত হয়েছে। ২২ অক্টোবর ২০২৬ ফ্রান্সের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, গুরুতর অসুস্থ ও মারাত্মকভাবে রোগপ্রতিরোধক্ষমতাহীন (severely immunocompromised) এক রোগীর শরীরে ভাইরাসটির সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। রোগীটি অক্টোবরের শুরুতে মারা যান। তবে ভাইরাসটি

তাঁর মৃত্যুর কারণ ছিল, নাকি আগে থেকেই থাকা গুরুতর অসুস্থতার সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক ছিল, তা নির্ধারণে তদন্ত চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ও ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র (ECDC) ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করছে। কে আক্রান্ত হয়েছিলেন? ফরাসি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত ব্যক্তি লিওঁর Hospices Civils de Lyon-এ একটি গুরুতর রোগের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন এবং তাঁর রোগপ্রতিরোধক্ষমতা অত্যন্ত দুর্বল ছিল। ৭ অক্টোবর ২০২৬ কর্তৃপক্ষ তাঁর সংক্রমণের বিষয়ে অবহিত হয়। একাধিক জৈবিক নমুনায় ভাইরাস শনাক্ত হওয়ায় সংক্রমণ নিশ্চিত হয়। ফরাসি কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক ধারণা, পূর্ব ফ্রান্সে সংক্রমিত কিউলিকয়েডিস (Culicoides) নামের ক্ষুদ্র রক্তচোষা মিজ বা biting midge-এর কামড়ে তিনি সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন। তবে এটিই চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত সংক্রমণপথ নয়; অন্য সম্ভাবনাও তদন্ত করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত মানুষে-মানুষে সংক্রমণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শামন্ডা ভাইরাস কী? শামন্ডা ভাইরাস Peribunyaviridae পরিবারের Orthobunyavirus গণের এবং Simbu serogroup-এর অন্তর্ভুক্ত। একই serogroup-এ আকাবানে (Akabane) ও শ্মালেনবার্গ (Schmallenberg) ভাইরাসও রয়েছে। ১৯৬৫ সালে নাইজেরিয়ায় গরু থেকে ভাইরাসটি প্রথম বিচ্ছিন্ন করা হয়। পরে আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চল ও জাপানে প্রাণীতে এর উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। ইউরোপে ২০২৬ সালের গ্রীষ্মে গবাদিপশুতে ভাইরাসটি প্রথম শনাক্ত হয়। ECDC-এর তথ্য অনুযায়ী, জুন থেকে প্রাণীতে অসুস্থতার লক্ষণ দেখা যায় এবং জুলাইয়ের শেষ দিকে ভাইরাস শনাক্ত করা হয়। পরবর্তী সময়ে অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ফ্রান্স, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড, ইতালি, লিখটেনস্টাইন, লুক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, স্পেন ও সুইজারল্যান্ডসহ জার্সিতে প্রাণীর মধ্যে শনাক্তের খবর পাওয়া যায়। ওরোপুশ (Oropouche) ভাইরাসের সঙ্গে শামন্ডা ভাইরাসের তুলনা করা হলেও দুটিকে এক ভাইরাস বা একই রোগ হিসেবে দেখা ঠিক নয়।

উভয়ই Orthobunyavirus গণের সদস্য হলেও তাদের সংক্রমণ, রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্যগত প্রভাব আলাদা। শামন্ডা ভাইরাসে মানুষের রোগ সম্পর্কে বর্তমানে তথ্য অত্যন্ত সীমিত। প্রাণীর কী ক্ষতি করে? শামন্ডা ভাইরাস প্রধানত গরুকে আক্রান্ত করে; ভেড়া, ছাগল, ঘোড়া ও আলপাকাসহ অন্যান্য প্রাণীতেও সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। আক্রান্ত গরুর জ্বর, ডায়রিয়া, অবসন্নতা, ক্ষুধামন্দা ও দুধ উৎপাদন কমে যেতে পারে। প্রজননজনিত সমস্যার মধ্যে গর্ভপাত ও ভ্রূণের জন্মগত বিকৃতির খবর রয়েছে। তবে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়া ২০২৬ সালের ভাইরাস-ভ্যারিয়েন্টের পূর্ণ রোগতাত্ত্বিক প্রভাব এখনো গবেষণাধীন। এসব লক্ষণ অন্য রোগেও দেখা যায়; তাই শুধু লক্ষণ দেখে শামন্ডা ভাইরাস নিশ্চিত করা যায় না, প্রয়োজন পরীক্ষাগারভিত্তিক রোগ নির্ণয়। ভাইরাসটি সাধারণত সংক্রমিত Culicoides মিজের কামড়ের মাধ্যমে প্রাণী থেকে প্রাণীতে ছড়ায়। গর্ভাবস্থায় মায়ের শরীর থেকে ভ্রূণে সংক্রমণের প্রমাণও রয়েছে। সরাসরি প্রাণী-থেকে-প্রাণীতে সংক্রমণের প্রমাণ বর্তমানে নেই। WOAH-এর তথ্য অনুযায়ী, শামন্ডা ভাইরাসের বিরুদ্ধে বাণিজ্যিকভাবে অনুমোদিত টিকা এখনো নেই। মানুষের জন্য কতটা ঝুঁকি? একটি মানব সংক্রমণ শনাক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে বৈজ্ঞানিকভাবে

গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তবে একে এখনই ব্যাপক জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখার কারণ নেই। WHO ও ফরাসি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ মূল্যায়নে সাধারণ জনগোষ্ঠীর জন্য কোনো শনাক্ত জনস্বাস্থ্যঝুঁকি পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, এটি প্রথম নথিভুক্ত মানব সংক্রমণ; ফলে মানুষের মধ্যে রোগের ধরন, সংক্রমণের সম্ভাবনা এবং ঝুঁকির মাত্রা সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো নেই। এ ঘটনায় রোগীর গুরুতর রোগপ্রতিরোধক্ষমতা-হ্রাস একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট। তবে একজন রোগীর ঘটনা থেকে সব রোগপ্রতিরোধক্ষমতাহীন ব্যক্তির ঝুঁকি, কিংবা সুস্থ মানুষের ঝুঁকি, কোনোটিই নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না। শ্মালেনবার্গ ভাইরাসের মতো একই serogroup-এর অন্য ভাইরাসের পূর্ব অভিজ্ঞতা সহায়ক হতে পারে, কিন্তু তা শামন্ডা ভাইরাসের মানব-ঝুঁকির সরাসরি প্রমাণ নয়। বাংলাদেশের জন্য বার্তা বাংলাদেশে শামন্ডা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার কোনো নির্ভরযোগ্য প্রকাশিত বা সরকারি প্রতিবেদন এই লেখার প্রস্তুতিকালে পাওয়া যায়নি। তবে ‘শনাক্তের প্রতিবেদন নেই’ - এর অর্থ ‘ভাইরাস নেই’ নয়। বিশেষ করে নিয়মিত ভাইরাসভিত্তিক নজরদারি, Culicoides প্রজাতি শনাক্তকরণ এবং উপযুক্ত পরীক্ষাগার পরীক্ষা সীমিত হলে কোনো সংক্রমণ অচিহ্নিত থেকে যেতে পারে। তাই বাংলাদেশে ভাইরাসটির উপস্থিতি আছে, এমন দাবি করা যেমন ঠিক হবে না, তেমনি নজরদারি ছাড়া অনুপস্থিতিও নিশ্চিত করা যায় না। আফ্রিকার মিসরে ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় ৫৪০টি গরুর নমুনার মধ্যে ২৪.৪ শতাংশে আকাবানে ভাইরাসের অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়। এটি আকাবানে ভাইরাসের সংস্পর্শের প্রমাণ; শামন্ডা ভাইরাসের উপস্থিতির প্রমাণ নয়। সুদানের ২০২০ সালের গবেষণায় ১৮৪টি গরুর নমুনায় Simbu serogroup-এর অ্যান্টিবডির সামগ্রিক হার ছিল ৮৬.৪ শতাংশ; বিভিন্ন রাজ্যে হার ৬৯.২ থেকে ১০০ শতাংশের মধ্যে ছিল। গবেষণায় ব্যবহৃত ELISA একাধিক Simbu-group ভাইরাসের অ্যান্টিবডি শনাক্ত করতে পারে। তাই এ ফলাফলকে শামন্ডা ভাইরাসের নির্দিষ্ট seroprevalence হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বাংলাদেশে গাভীর গর্ভপাত, মৃত বা বিকৃত বাছুর জন্ম, জ্বর-ডায়রিয়া এবং হঠাৎ দুধ কমে যাওয়ার ঘটনা দেখা গেলে প্রচলিত কারণগুলোর পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী Simbu-group ভাইরাসের সম্ভাবনাও গবেষণায় বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে এসব লক্ষণের ভিত্তিতে শামন্ডা ভাইরাস ধরে নেওয়া যাবে না। খামারিদের জন্য পাঁচটি পরামর্শ গোয়ালঘর ও আশপাশের ভেজা, কাদাযুক্ত এবং জৈব পদার্থসমৃদ্ধ স্থান পরিষ্কার ও ব্যবস্থাপনা করুন। জমে থাকা পানি, ফুটো পানির পাত্র, ভেজা গোবর, পচা ঘাস ও খাদ্যের অবশিষ্টাংশ জমতে দেবেন না। Culicoides-এর প্রজননস্থল প্রজাতিভেদে ভিন্ন; শুধু পানি সরালেই সব মিজ নিয়ন্ত্রণ হবে না।

গবাদিপশুর ঘরে মিজের প্রবেশ ও পশুর সঙ্গে সংস্পর্শ কমাতে উপযুক্ত জাল, বায়ু চলাচল এবং পরিচ্ছন্ন আবাসন ব্যবস্থার দিকে নজর দিন। কীটনাশক বা রিপেলেন্ট ব্যবহারের আগে প্রাণিচিকিৎসক/কীটতত্ত্ব বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। গাভীর গর্ভপাত, মৃত বা বিকৃত বাছুর জন্ম, জ্বর, ডায়রিয়া কিংবা হঠাৎ দুধ কমে যাওয়ার ঘটনা তারিখসহ নথিবদ্ধ করুন এবং দ্রুত প্রাণিচিকিৎসককে জানান। প্রয়োজনে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষাগারে পাঠানোর ব্যবস্থা করুন। খামারে কাজের সময় কামড়ানো মিজ থেকে সুরক্ষার জন্য শরীর ঢাকা পোশাক ও উপযুক্ত রিপেলেন্ট ব্যবহার করুন। বিশেষ করে ভোর ও সন্ধ্যায় মিজের সংস্পর্শ কমানোর ব্যবস্থা নিন; তবে সক্রিয়তার সময় প্রজাতি ও পরিবেশভেদে বদলাতে পারে। গুজব বা নিজে নিজে রোগ নির্ণয় না করে উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ প্রাণিচিকিৎসক এবং সরকারি রোগনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে অস্বাভাবিক রোগ বা প্রজননজনিত ঘটনার খবর দিন।


নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ