ঋণ, সহায়তা হ্রাস ও কর্মসংস্থান নিয়ে সমাধান মেলেনি
ঋণ, সহায়তা হ্রাস ও কর্মসংস্থান নিয়ে সমাধান মেলেনি
নিজস্ব প্রতিবেদক
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা শেষ হলেও বৈশ্বিক সংঘাত, ঋণের বাড়তি বোঝা, উন্নয়ন সহায়তা কমে যাওয়া এবং কর্মসংস্থানের সংকট মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রত্যাশিত সমাধান মেলেনি। সপ্তাহব্যাপী আলোচনার পরও এসব সংকটের জন্য নতুন ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের ঘাটতি রয়ে গেছে। ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি আপাতত স্থিতিশীল থাকলেও নিম্ন আয়ের দেশগুলোর সামনে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, ইউক্রেন যুদ্ধ, ঋণ পরিশোধের বাড়তি ব্যয় এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই শেষ হয়েছে সভা। রোববার (১৮ অক্টোবর) প্রকাশিত মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের ধাক্কা সামলে চললেও সেই স্থিতিস্থাপকতার সুফল সব দেশ সমানভাবে পাচ্ছে না। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর জন্য ঋণের খরচ ও মূল্যস্ফীতির চাপ উন্নয়ন ব্যয় সংকুচিত করছে। আরও পড়ুন চাকরি পাবে না ৮০ কোটি তরুণ সহায়তার আশ্বাস, অর্থায়নে অনিশ্চয়তা : দরিদ্র দেশগুলোর প্রাপ্তি কী? উচ্চশিক্ষিত তরুণদের ২৯ শতাংশ বেকার, কর্মসংস্থান নিশ্চিত বড় চ্যালেঞ্জ বিজ্ঞাপন ১২
থেকে ১৮ অক্টোবর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের কুইন সিরিকিত ন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত এ সভায় বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর, নীতিনির্ধারক ও উন্নয়ন সহযোগীরা অংশ নেন। বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি, সরকারি ঋণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং কর্মসংস্থান ছিল আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরামর্শের বড় অংশজুড়ে ছিল বাজেট ঘাটতি কমানো, অর্থনৈতিক সংস্কার ত্বরান্বিত করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ। কিন্তু ঋণের চাপ, উন্নয়ন সহায়তার অনিশ্চয়তা ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মতো বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা রয়ে গেছে। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর নীতি ও সিদ্ধান্তের প্রভাবও পড়ছে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ওপর। ঋণের ব্যয় বাড়ছে, মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হচ্ছে এবং এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের কারণে অর্থনৈতিকভাবে আরও পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রচলিত পরামর্শই দেওয়া হয়েছে। বিজ্ঞাপন সমাপনী দিনে আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা বলেন, বাজেটের ভারসাম্যহীনতার ক্ষেত্রে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোই বড় সমস্যার উৎস। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মোট ঋণের মাত্রা কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে বন্ডের মুনাফা বা ইল্ড বেড়ে যাওয়ায় তাদের ঋণ নেওয়ার খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি বলেন, নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ঋণ পরিশোধের ব্যয় এক দশক আগের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে সরকারি রাজস্বের প্রায় ১৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এর ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি খাতে ব্যয়ের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো দেশের
ঋণের পরিমাণ কমলেও আন্তর্জাতিক বাজারে সুদের হার বেড়ে গেলে ঋণ পরিশোধের ব্যয় বাড়তে পারে। উন্নত দেশগুলোর আর্থিক নীতির প্রভাব এভাবেই উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। উন্নত দেশগুলো নিজেদের সংকটেই ব্যস্ত উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো নিজেদের বাজেটসংক্রান্ত সমস্যা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় উন্নয়ন সহায়তা অনেক ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাচ্ছে না এমন বক্তব্য আসে বিশিষ্টজনের বক্তব্যে। আটলান্টিক কাউন্সিলের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট জশ লিপস্কি মনে করেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সহায়তা করার কার্যকর পথনির্দেশনা তৈরির সুযোগ থাকলেও এবারের সভা তা কাজে লাগাতে পারেনি। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো নিজেরাই যখন আর্থিক সংকটের ঝুঁকিতে থাকে, তখন উন্নয়নশীল বিশ্বের সমস্যা সমাধানে তাদের পক্ষে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এসব দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি, যেখানে উন্নয়ন সহায়তা অনেক সময় অগ্রাধিকার হারাচ্ছে। অন্যদিকে কলম্বিয়ার সাবেক অর্থমন্ত্রী এবং বর্তমানে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্সের গবেষক মাউরিসিও কার্দেনাস বলেন, অনেক নীতিনির্ধারকের মধ্যে বড় ধরনের সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় কীভাবে এগোতে হবে, তার সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই। কার্দেনাসের মতে, এআইয়ের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক সচেতন হলেও সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত পরামর্শের অভাব রয়েছে। ভূরাজনৈতিক বিরোধেও বাধাগ্রস্ত সহযোগিতা আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কার্যক্রমে ভূরাজনৈতিক বিরোধও প্রভাব ফেলছে। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর
থেকে দুই প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে জটিল করে তুলেছে। ব্যাংককে অনুষ্ঠিত আইএমএফের স্টিয়ারিং কমিটির বৈঠকে রাশিয়ার অর্থমন্ত্রীর বক্তব্যের সময় প্রায় অর্ধেক প্রতিনিধি কক্ষ ছেড়ে চলে যান। কমিটির প্রধান ও সৌদি আরবের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-জাদআনের ব্যাংককে পৌঁছাতেও নিরাপত্তাজনিত পরিস্থিতির প্রভাব পড়ে। রিয়াদের বিমানবন্দরে হুথি হামলার কারণে তাঁর যাত্রা ব্যাহত হয় এবং তাঁকে স্থলপথে কাতারে গিয়ে সেখান থেকে বিমানে যাত্রা করতে হয় বলে জানা গেছে। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ইয়র্কের অধ্যাপক কেট পিকেট উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে শুধু কঠোর কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর না দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার মতে, বৈষম্য বাড়লে এবং দারিদ্র্য গভীর হলে দীর্ঘমেয়াদে সমাজ ও অর্থনীতির ব্যয় আরও বাড়বে। কোনো অর্থনীতিকে শুধু স্থিতিশীল বললেই হবে না; সেই স্থিতিশীলতার সুফল কারা পাচ্ছে, সেটিও দেখতে হবে। অর্থাৎ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও যদি তার সুফল মূলত ধনী ও সুবিধাভোগী শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সমাজের বড় অংশ পিছিয়ে থাকতে পারে। এ ধরনের বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটকে আরও গভীর করতে পারে। বৈশ্বিক মন্দা এড়ালেও প্রবৃদ্ধি কমছে বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট বড় জ্বালানি ধাক্কা বিশ্ব অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়ে ভালোভাবে সামলেছে। তবে বৈশ্বিক মন্দা এড়ানো গেলেও উন্নত ও উন্নয়নশীল,উভয় ধরনের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আগের তুলনায় দুর্বল হয়েছে। উন্নত অর্থনীতির প্রায় অর্ধেক দেশে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে। অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। কোসে সতর্ক করে বলেন, আজকের অর্থনৈতিক স্থিতিস্থাপকতা আগামী দিনের স্থিতিশীলতার নিশ্চয়তা দেয় না। প্রতি তিন থেকে ছয় মাস অন্তর নতুন কোনো ধাক্কা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। ফলে দেশগুলো এখন শুধু বর্তমান সংকট নয়, পরবর্তী সংকট কী হতে পারে, তা নিয়েও উদ্বিগ্ন। মূলত বিশ্ব অর্থনীতি আপাতত বড় ধরনের মন্দা এড়ালেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সংকট কাটেনি। ঋণ পরিশোধের ব্যয়, উন্নয়ন সহায়তার অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং এআইয়ের কারণে সৃষ্ট সম্ভাব্য বৈষম্য তাদের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক বাজেট ঘাটতি কমানো, সংস্কার এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর মতো প্রচলিত পরামর্শ দিয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যতের ধাক্কা মোকাবিলায় উন্নয়নশীল দেশগুলোকে কী ধরনের সুনির্দিষ্ট সহায়তা দেওয়া হবে, সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর মেলেনি। ফলে এবারের বার্ষিক সভা শেষে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে সমাধানের চেয়ে প্রশ্নই বেশি রয়ে গেছে। উন্নয়ন সহায়তা কমছে, বিকল্প অর্থায়নের চাপ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকারি উন্নয়ন সহায়তা বা ওডিএ কমে যাওয়া। ২০২৫ সালে সরকারি উন্নয়ন সহায়তা ২৩ শতাংশ কমেছে, যা ওই প্রতিবেদনের হিসাবে এক বছরে সবচেয়ে বড় পতন। সহায়তা কমে গেলে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নিজেদের রাজস্ব, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং বহুপক্ষীয় ঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বেসরকারি বিনিয়োগ সব দেশে বা সব খাতে সমানভাবে যায় না। বিনিয়োগকারীরা সাধারণত যেখানে মুনাফার সম্ভাবনা বেশি এবং ঝুঁকি তুলনামূলক কম, সেসব খাতকে অগ্রাধিকার দেন। ফলে সামাজিক সুরক্ষা, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন এবং কম লাভজনক অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা উন্নয়ন অর্থায়নের নতুন পদ্ধতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি বেসরকারি বিনিয়োগ, দাতব্য সংস্থার অর্থ এবং প্রযুক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। বিশ্বব্যাংকের ১৬ অক্টোবরের বার্ষিক অধিবেশনের বক্তব্যে বাঙ্গা বলেন, উন্নয়নের জন্য শুধু অর্থায়ন যথেষ্ট নয়; দেশভিত্তিক প্রয়োজন অনুযায়ী সরকারি ও বেসরকারি অর্থকে কাজে লাগিয়ে বাস্তব ফলাফল নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের লক্ষ্য হলো এমন খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, যেখানে উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান তৈরি হয়। তবে বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরতা বাড়ালেই সব উন্নয়ন ঘাটতি পূরণ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। দরিদ্র দেশগুলোর জন্য সহজ শর্তের অর্থায়ন, ঋণ পুনর্গঠন এবং উন্নয়ন সহায়তার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ১২০ কোটি তরুণের জন্য চাকরির ঘাটতি কর্মসংস্থান এবারের সভার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল। আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারেন। কিন্তু তাঁদের জন্য সম্ভাব্য চাকরির সংখ্যা প্রায় ৪০ কোটি। অর্থাৎ সম্ভাব্য কর্মসংস্থান ও নতুন শ্রমশক্তির মধ্যে ব্যবধান প্রায় ৮০ কোটি। এটি কোনো এক বছরের চাকরির ঘাটতি নয়; আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের সম্ভাব্য শ্রমবাজার পরিস্থিতির একটি পূর্বাভাস। তবু এ হিসাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিশাল চ্যালেঞ্জ তুলে ধরা হয়। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি অর্থায়ন, বেসরকারি বিনিয়োগ, দাতব্য অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের বিকাশ, জ্বালানি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং নতুন দক্ষতা তৈরি ছাড়া বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হবে বলেও সভা থেকে উঠে আসে। বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ জনগোষ্ঠীকে কর্মসংস্থানে যুক্ত করতে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে শ্রমবাজারের চাহিদার সমন্বয় প্রয়োজন। শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবাখাতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং নতুন প্রযুক্তির উপযোগী দক্ষতা তৈরি করা জরুরি। তবে এগুলো বাংলাদেশের জন্য নীতিগত করণীয়।বার্ষিক সভায় বাংলাদেশকে নিয়ে ঘোষিত কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত নয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা থাকলেও ঝুঁকি কাটেনি সভা শেষে প্রকাশিত মূল্যায়নে বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতার কথা বলা হলেও সামনে ঝুঁকি রয়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে বিঘ্ন জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে। জ্বালানি ও পণ্যমূল্য বাড়লে মূল্যস্ফীতি বাড়ার
পাশাপাশি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর বৈদেশিক লেনদেনেও চাপ পড়ে। সভা থেকে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে আসার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের মন্দা এড়িয়ে গেলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রবৃদ্ধির গতি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু বাজেট ঘাটতি কমানো নয়, কোন খাতে সরকারি ব্যয় রাখা হবে, কীভাবে দুর্বল জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া হবে এবং কীভাবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়ানো যাবে—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যয় কমাতে গিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তি দুর্বল হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা বাংলাদেশের জন্য এবারের সভার আলোচনায় তিনটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, রাজস্ব আহরণ বাড়িয়ে ঋণ পরিশোধ ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি ও বৈদেশিক অর্থায়নের চাপ সামলাতে অর্থনীতির সক্ষমতা বাড়ানো। তৃতীয়ত, তরুণদের কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির জন্য দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করা। বাংলাদেশের অর্থায়নসংক্রান্ত আলোচনায় কোনো প্রস্তাব বা অনুরোধকে অনুমোদিত ঋণ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। আন্তর্জাতিক সহায়তার ক্ষেত্রে অর্থের পরিমাণ, সুদ, পরিশোধের সময়সীমা, শর্ত এবং অর্থ ছাড়ের পর্যায়।সবকিছু যাচাই করা জরুরি। একইভাবে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগের পাশাপাশি কোন খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে এবং তা কতটা কর্মসংস্থান তৈরি করছে, সেটিও মূল্যায়ন করতে হবে। সব মিলিয়ে ব্যাংককের বার্ষিক সভা শেষে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে সংকটের চিত্র স্পষ্ট হলেও ঋণ, উন্নয়ন সহায়তা ও কর্মসংস্থান নিয়ে প্রত্যাশিত সমন্বিত সমাধান আসেনি।
বৈশ্বিক অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকার বার্তা থাকলেও সেই স্থিতিশীলতার সুফল দরিদ্র দেশগুলো কীভাবে পাবে, ঋণের বোঝা কীভাবে কমবে এবং বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য কাজ কীভাবে তৈরি হবে—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স