হবিগঞ্জে তুচ্ছ বি'রো'ধে র'ক্তা'ক্ত হচ্ছে ১০ মাসে নি'হ'ত ২৩ জন আ'হ'ত ৮’শ ৬০
হবিগঞ্জে তুচ্ছ বি'রো'ধে র'ক্তা'ক্ত হচ্ছে ১০ মাসে নি'হ'ত ২৩ জন আ'হ'ত ৮’শ ৬০
লিটন পাঠান, হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি
হবিগঞ্জ জেলায় জমিজমা নিয়ে বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, মাছ ধরা, ফুটবল খেলা কিংবা সামান্য কথাকাটাকাটি, এমন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বারবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার মানুষ। ছোট বিরোধ থেকে শুরু হওয়া এসব সংঘর্ষ মুহূর্তেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। ভাঙচুর, লুটপাট, ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার পাশাপাশি ঝরে যাচ্ছে তাজা প্রাণ। আহত হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন অনেকে।
সংঘর্ষের কারণে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা। সাম্প্রতিক সময়ে বানিয়াচং উপজেলার মন্দুরী ও কাটকাল গ্রামে সংঘর্ষে দুইজন নিহত হওয়ার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। একই উপজেলায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে চারজনের প্রাণহানির তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে সামনে এনেছে। এসব ঘটনায় অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তুচ্ছ বিরোধের জেরে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, কেন এত সহজেই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন মানুষ? কেন সামাজিক বিরোধ মীমাংসার পরিবর্তে সহিংসতার পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে আর এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায়ই বা কী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হবিগঞ্জ জেলায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে ৯৫টি। এসব ঘটনায় আহত হন ১ হাজার ১৯৯ জন এবং নিহত হন ১৯ জন। অন্যদিকে, ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ১০৬টি। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ৮৬০ জন এবং নিহত হয়েছেন ২৩ জন। পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের পুরো সময়ের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসেই সংঘর্ষের সংখ্যা বেড়েছে ১১টি। একই সঙ্গে প্রাণহানির সংখ্যাও বেড়েছে। অর্থাৎ, সংঘর্ষের ঘটনায় প্রাণহানির দিক থেকে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। তবে আহতের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কম হলেও সংঘর্ষের সংখ্যা ও প্রাণহানি বৃদ্ধি জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার অবকাশ তৈরি করেছে। তুচ্ছ বিরোধেই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হবিগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা গোষ্ঠীগত বিরোধ অনেক সময় নতুন কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে রূপ নেয়। জমির সীমানা নির্ধারণ, জমির দখল, মাছ ধরা, খেলাধুলা কিংবা ব্যক্তিগত কথাকাটাকাটি থেকে শুরু হয় বিরোধ।
একপর্যায়ে তাতে যুক্ত হন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও নিজ নিজ পক্ষের লোকজন। পরে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন দুই পক্ষের শত শত মানুষ। একটি ছোট ঘটনা থেকে শুরু হওয়া বিরোধ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। সংঘর্ষের সময় ভাঙচুর করা হয় বাড়িঘর ও দোকানপাট। কোথাও কোথাও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। এতে বিরোধে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষও। অনেক পরিবার হারায় তাদের উপার্জনক্ষম সদস্য, আবার কেউ কেউ আহত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, আগে গ্রামাঞ্চলে কোনো বিরোধ দেখা দিলে মুরব্বি, জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সালিশ-বৈঠকের মাধ্যমে তা মীমাংসার চেষ্টা করতেন। এতে অনেক বিরোধ বড় সংঘর্ষে রূপ নেওয়ার আগেই থেমে যেত। কিন্তু বর্তমানে সামাজিক সালিশ ও পারস্পরিক সমঝোতার উদ্যোগ অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে ছোটখাটো বিরোধও দ্রুত বড় আকার ধারণ করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের পেছনে দীর্ঘদিনের গোষ্ঠীগত বিরোধ, সামাজিক প্রভাব বিস্তার এবং আধিপত্য ধরে রাখার প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ শুরু হলেও এর পেছনে থাকে পুরোনো বিরোধ ও প্রতিশোধের মনোভাব। এক পক্ষের সঙ্গে অন্য পক্ষের বিরোধ দেখা দিলে ব্যক্তিগত সমস্যাও অনেক সময় গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। ফলে বিরোধ মীমাংসার পরিবর্তে তা আরও জটিল হয়ে ওঠে। আগের ঘটনার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নতুন সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। এভাবে একই এলাকায় বারবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে থাকে। হবিগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মঞ্জুর উদ্দিন আহমেদ শাহীন মনে করেন, এসব সংঘর্ষের কারণ ও প্রতিকার নির্ধারণে সামাজিক বিরোধ, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব এবং আইনগত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ছোট বিরোধ যাতে সহিংসতায় রূপ নিতে না পারে, সে জন্য কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। জন শুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জ জেলায় জনসংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮৬ অন্যদিকে, জেলার প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীর মধ্যে ৩৯ দশমিক ১৪ শতাংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা প্রশিক্ষণের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
হবিগঞ্জ পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদ বলেন, যারা এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে আমরা তাদেরকে চিহ্নিত করছি এবং আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। হবিগঞ্জ একটি হাওর এলাকা। বেশিরভাগ ঘটনাই ঘটছে গ্রামীণ এলাকায়। তুচ্ছ বিষয় থেকে যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা না ঘটে আমরা সেদিকে গুরুত্ব দিচ্ছি।
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স