নিজস্ব প্রতিবেদক
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের সংগঠনে কারা প্রভাব বিস্তার করছেন? মেয়াদ বাড়ানোর আদেশ তিন দিনেই বাতিল, কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন
দেশের বিপুলসংখ্যক ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারের প্রতিনিধিত্বকারী পেশাজীবী সংগঠন ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি) নিয়ে তৈরি হয়েছে সাংগঠনিক অচলাবস্থা। কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়া, মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত জারি ও অল্প সময়ের মধ্যে তা বাতিল এবং নতুন নেতৃত্ব পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় কারা ভূমিকা রাখছেন—এসব প্রশ্নে সংগঠনটির ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের একাংশের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও ক্ষোভ।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আইডিইবির নেতৃত্ব পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ও সাংগঠনিক স্বাতন্ত্র্য যথাযথভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না। এমনকি অন্য পেশাজীবী গোষ্ঠীর প্রভাব এ প্রক্রিয়ায় পড়ছে কি না-তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং প্রকৃত পরিস্থিতি জানতে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর, আইডিইবি কর্তৃপক্ষ ও অভিযোগে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়া জরুরি। তিন দিনের ব্যবধানে মেয়াদ বাড়ানো, আবার বাতিল
সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আইডিইবির অন্তর্বর্তীকালীন কেন্দ্রীয় কমিটির অনুমোদিত মেয়াদ গত ৩০ জুন ২০২৬ শেষ হয়। এরপর সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে কমিটির মেয়াদ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বাড়ানোর একটি আদেশ জারি করা হয় বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু ওই আদেশ জারির মাত্র তিন দিনের মধ্যে তা বাতিল করা হয়। একটি জাতীয় পর্যায়ের পেশাজীবী সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল এবং কেন এত দ্রুত তা প্রত্যাহার করা হলো—এ প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের একাংশ।
তাঁদের প্রশ্ন, মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রশাসনিক ও আইনগত ভিত্তি কী ছিল? আর বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে কী কারণ কাজ করেছে? এই দুটি সিদ্ধান্তের নথি প্রকাশ করা হলে বিষয়টির প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় কারা?
আইডিইবির বর্তমান সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ায় কারা দায়িত্ব পালন করছেন এবং তাঁদের দায়িত্বের পরিধিই বা কী?
সংশ্লিষ্ট ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার নেতাদের অভিযোগ, দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যে একজন ডিগ্রি ইঞ্জিনিয়ার এবং ডিগ্রি ইঞ্জিনিয়ারদের একটি পেশাজীবী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে রয়েছেন।
এ কারণে আইডিইবির নেতৃত্ব পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাতের সুযোগ তৈরি হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তবে কারও পেশাগত পরিচয় বা সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা থাকলেই স্বার্থের সংঘাত প্রমাণিত হয় না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিধিবদ্ধ দায়িত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রশ্নের মুখে সাংগঠনিক স্বাতন্ত্র্য
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের নেতাদের বক্তব্য, আইডিইবি কোনো সাধারণ প্রতিষ্ঠান নয়। দেশের বিপুলসংখ্যক ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারের পেশাগত অধিকার, মর্যাদা, শিক্ষা, পদোন্নতি, পদবিন্যাস ও কর্মক্ষেত্রের বিভিন্ন বিষয় সংগঠনটির কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
তাই নেতৃত্ব নির্ধারণের ক্ষেত্রে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে সংগঠনের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
তাঁদের মতে, বিষয়টি কোনোভাবেই ডিগ্রি ইঞ্জিনিয়ারদের বিরুদ্ধে অবস্থান নয়। ডিগ্রি ও ডিপ্লোমা—উভয় প্রকৌশলীই দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে প্রত্যেক পেশাজীবী গোষ্ঠীর নিজস্ব সংগঠনে নিজস্ব প্রতিনিধিত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার থাকা প্রয়োজন।
নেতৃত্ব নিয়ে অনাস্থা বাড়ছে?
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, আইডিইবির নেতৃত্ব পুনর্গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে স্বচ্ছতার ঘাটতি থাকলে সদস্যদের মধ্যে অনাস্থা আরও বাড়তে পারে।
বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের মধ্যে শিক্ষা, পদোন্নতি, পদবিন্যাস, পেশাগত মর্যাদা ও কর্মক্ষেত্রে অধিকার নিয়ে বিভিন্ন দাবি রয়েছে। এর সঙ্গে সাংগঠনিক নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে অসন্তোষ যুক্ত হলে পরিস্থিতি জটিল হতে পারে।
তবে বর্তমানে কতসংখ্যক সদস্য এই অসন্তোষের সঙ্গে যুক্ত এবং এর সাংগঠনিক প্রভাব কতটা—তা নিরূপণে আরও তথ্য ও মাঠপর্যায়ের যাচাই প্রয়োজন।
সাংগঠনিক কার্যক্রম সচলের চেষ্টা
এদিকে আইডিইবির সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করছেন প্রকৌশলী মোঃ কবীর হোসেনসহ কয়েকজন নেতা বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, সাংগঠনিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংগঠনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার চেষ্টা চলছে।
তবে তাঁদের সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার আইনগত ও গঠনতান্ত্রিক ভিত্তি কী—এ প্রশ্নেরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্দোলনে গড়ানোর আশঙ্কা
আইডিইবির নেতৃত্ব সংকট দ্রুত সমাধান না হলে বিষয়টি আন্দোলনের দিকে গড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের একাংশ।
তাঁদের বক্তব্য, একটি বড় পেশাজীবী সংগঠন দীর্ঘদিন সাংগঠনিকভাবে দুর্বল থাকলে সদস্যদের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। আর সেই হতাশা যদি পেশাগত অধিকারসংক্রান্ত পুরোনো দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে বড় ধরনের কর্মসূচির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংকটকে রাজপথে যাওয়ার আগেই আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক প্রভাব নিয়েও আলোচনা
আইডিইবির সাংগঠনিক সংকটকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাবের আশঙ্কার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতা।
তাঁদের মতে, বিপুলসংখ্যক ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারের মধ্যে যদি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভ তৈরি হয়, তাহলে তা রাজনৈতিকভাবেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে এ বিষয়টি এখনো আশঙ্কা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণের পর্যায়ে রয়েছে। বাস্তবে এর কোনো রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হয়েছে কি না, তা নির্ধারণে সদস্যদের অবস্থান, সংগঠনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ও রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার তথ্য প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ দাবি
বর্তমান সাংগঠনিক সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন সংশ্লিষ্ট ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার নেতারা।
তাঁদের দাবি, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের উদ্যোগে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা হোক। একই সঙ্গে আইডিইবির সাংগঠনিক স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে একটি বৈধ, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তাঁদের আশঙ্কা, দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া না হলে সাংগঠনিক অনাস্থা ও পেশাগত ক্ষোভ বৃহত্তর আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।
সামনে মূল পরীক্ষা—স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা
আইডিইবির বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নেতৃত্ব পুনর্গঠনের প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা।
কমিটির মেয়াদ কেন বাড়ানো হয়েছিল, কেন তা বাতিল করা হলো, নতুন নেতৃত্ব গঠনের প্রক্রিয়ায় কারা দায়িত্বে এবং তাঁদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কতটুকু—এসব প্রশ্নের উত্তর নথিভিত্তিকভাবে প্রকাশ করা হলে বিতর্ক অনেকটাই কমতে পারে।
একই সঙ্গে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা গেলে দীর্ঘদিনের অনাস্থাও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
---
প্রশ্নের মুখে যে ৭ বিষয়:
১. ৩০ জুন ২০২৬-এর পর অন্তর্বর্তীকালীন কমিটির সাংগঠনিক অবস্থান কী ছিল?
২. ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্তের ভিত্তি কী?
৩. মাত্র তিন দিনের মধ্যে সেই আদেশ বাতিলের কারণ কী?
৪. কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় কারা দায়িত্ব পালন করছেন?
৫. দায়িত্বপ্রাপ্তদের কোনো পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকলে তা কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছে?
৬. নেতৃত্ব নির্ধারণে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে?
৭. পুরো প্রক্রিয়ার সরকারি নথি ও সিদ্ধান্তগুলো সদস্যদের সামনে প্রকাশ করা হবে কি?
তথ্যবক্স
আইডিইবি সংকট এক নজরে
সংগঠন: ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)
সদস্য: সংশ্লিষ্টদের দাবি অনুযায়ী ৮ লক্ষাধিক ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার
গুরুত্বপূর্ণ তারিখ: ৩০ জুন ২০২৬
মূল সংকট: কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ও কমিটি পুনর্গঠন
বিতর্কিত বিষয়: কমিটির মেয়াদ বাড়ানো ও পরবর্তী সময়ে আদেশ বাতিল
উত্থাপিত অভিযোগ: নেতৃত্ব পুনর্গঠনে সম্ভাব্য বাইরের প্রভাব
ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের দাবি: স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নেতৃত্ব
দাবি: সাংগঠনিক অচলাবস্থা নিরসনে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের উদ্যোগ
শেষ কথা
আইডিইবির সংকটকে ডিগ্রি বনাম ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারের বিরোধ হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। দেশের প্রকৌশল খাতে উভয় শ্রেণির পেশাজীবীরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
মূল প্রশ্ন হলো—ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের নিজস্ব সংগঠনের নেতৃত্ব নির্ধারণে সদস্যদের মতামত ও অংশগ্রহণ কতটা নিশ্চিত হচ্ছে এবং পুরো প্রক্রিয়াটি কতটা স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য। অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ ও অনাস্থার বদলে নথি, গঠনতন্ত্র এবং স্বচ্ছ সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে দ্রুত সমাধানই এখন সবচেয়ে জরুরি। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সরকার ও আইডিইবি কর্তৃপক্ষ দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে এমন একটি সমাধান দেবে, যাতে সংগঠনের সাংগঠনিক স্বাতন্ত্র্য বজায় থাকে এবং ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারদের পেশাগত অধিকার ও মর্যাদা আরও সুসংহত হয়।