নিজস্ব প্রতিবেদক
পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর তাঁর পদে পরিবর্তনের বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। নতুন আইজিপি নিয়োগের জন্য বিসিএস ১৫তম ব্যাচের চার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার নাম বিবেচনায় রয়েছে। এরই মধ্যে তাঁদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত তথ্যসংবলিত নথি তলব করেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
আলোচনায় থাকা চার কর্মকর্তা হলেন আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ, অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবিব পলাশ এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রথম তিন কর্মকর্তা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পদোন্নতিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। অন্যদিকে পেশাদারত্বের বিবেচনায় আলোচনায় রয়েছেন মোসলেহ উদ্দিন আহমদ।
জাপান সফর শেষে বৃহস্পতিবার দেশে ফেরার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। তিনি ফেরার পর আইজিপি পদে নিয়োগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে। তবে নতুন নিয়োগ সম্পূর্ণভাবে সরকারপ্রধানের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। আলোচনায় থাকা চার কর্মকর্তার বাইরে অন্য কারও নামও বিবেচনায় আসতে পারে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিষয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদন, অতীত কর্মকাণ্ড ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা বিবেচনা করা হতে পারে।
আইজিপির সাম্প্রতিক বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক ও সরকারি পর্যায়ে প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী মন্তব্যটিকে সরকারের জন্য বিব্রতকর বলে অভিহিত করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, দেশে ফেরার পর প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি বিবেচনা করবেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদও বলেছেন, ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্য ঠিক হয়নি। এ বিষয়ে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি রয়েছে বলেও জানান তিনি। এসব বক্তব্যের পর আইজিপি পদে সম্ভাব্য পরিবর্তন নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের পক্ষ থেকে অবশ্য আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়, আলী হোসেন ফকির ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহার করেছেন। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা শাস্তি বোঝানো তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। একই সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মাদকের অর্থের ভাগ নেওয়ার যে মন্তব্য তিনি করেছিলেন, সেটিকে অসাবধানতাবশত বলা হয়েছে। বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনও তাঁর বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বিবৃতি দিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আইজিপির সাম্প্রতিক মন্তব্যে বাহিনীর অনেকেই বিব্রত। সাবেক পুলিশপ্রধান মুহাম্মদ নূরুল হুদার মতে, আইজিপির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে এ ধরনের মন্তব্য পেশাদারত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের মধ্যে অস্বস্তির সময়ে এমন বক্তব্য সরকারের পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীর পেশাদারত্ব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
কী বলেছিলেন আইজিপি
গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) পুরান ঢাকার চকবাজারে এক অনুষ্ঠানে আইজিপি আলী হোসেন ফকির বলেন, সরকার অনুমতি দিলে প্রয়োজনে পুলিশ ক্রসফায়ারে যেতে দ্বিধা করবে না। একই অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, পুলিশ বলপ্রয়োগ করলে তাদের ‘ফ্যাসিস্ট’ বলা হয়, আর নিষ্ক্রিয় থাকলে দুর্বল আখ্যা দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশকে দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ দেওয়ার ওপরও জোর দেন তিনি। এ সময় সাংবাদিকদের নিয়েও বিতর্কিত মন্তব্য করেন।
তাঁর বক্তব্যের পর রাজনৈতিক মহল ও মানবাধিকার সংস্থাসহ বিভিন্ন পক্ষ থেকে সমালোচনা আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ওই রাতেই পুলিশ সদর দপ্তর ব্যাখ্যা দিয়ে জানায়, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ বোঝাতেই আইজিপি রূপক অর্থে ‘ক্রসফায়ার’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন।
আলোচনায় থাকা চার কর্মকর্তা
হাসিব আজিজ বর্তমানে অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদায় এপিবিএনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ১৫তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের এই কর্মকর্তা ১৯৯৫ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। এর আগে তিনি চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের কমিশনার, সিআইডির ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলের কমান্ড্যান্ট এবং পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই সিআইডি প্রধানের দায়িত্ব নেন। তিনি ১৯৯৫ সালে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে বাহিনীতে যোগ দেন। কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর করার পাশাপাশি যুক্তরাজ্যে আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন। সিআইডি প্রধান হওয়ার আগে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
অতিরিক্ত আইজিপি মো. আহসান হাবিব পলাশ নবগঠিত এসআরবির প্রথম মহাপরিচালক। এর আগে তিনি র্যাবের মহাপরিচালক ছিলেন। ১৫তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারের এই কর্মকর্তা ১৯৯৫ সালে সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে পড়াশোনা করার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে পেশাগত প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। কর্মজীবনে তিনি ডিএমপি, সিএমপি, সিলেট মহানগর পুলিশ, এপিবিএন, পিবিআই এবং বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করেছেন।
ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদও ১৫তম বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তা। ১৯৯৫ সালে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেওয়া এই কর্মকর্তা ডিএমপি কমিশনার হওয়ার আগে সিআইডি প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এ ছাড়া পুলিশ সদর দপ্তর, ডিএমপি ও সিএমপিতে বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কুষ্টিয়া, ভোলা ও শেরপুরসহ একাধিক জেলায় পুলিশ সুপার ছিলেন। তিনি জাতিসংঘের অধীনে দারফুরে পরিচালিত শান্তিরক্ষা মিশনেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
আইজিপি পদে পরিবর্তনের বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার পর এ বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত জানা যেতে পারে।