পিতা-মাতার আনুগত্য এবং তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা সন্তানের ওপর অপরিহার্য- দুধরচকী

আপলোড সময় : ২৬-১০-২০২৬ ০৯:৩২:১৩ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৬-১০-২০২৬ ০৯:৩৪:৩৭ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক

রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাতার কথা তিনবার উল্লেখ করেছেন, চতুর্থবারে পিতার কথা উল্লেখ করেছেন। এছাড়া মাতার অধিকার বেশি হওয়ার স্বতন্ত্র কয়েকটি কারণ রয়েছে। এক. গর্ভধারণের কষ্ট। দুই. প্রসবকালে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গর্ভ প্রসবের কষ্ট তিন. দুগ্ধপান করানো এবং সন্তানের সেবা-যত্ন নিয়োজিত থাকার কষ্ট। এসব কারণ পিতার মধ্যে বিদ্যমান নেই। (তাফসীরে কুরতুবী -৫/৫৭৫) তাছাড়া পবিত্র কোরআনে পাকে মায়ের কষ্টের এসব কারণের কথা উল্লেখ হয়েছে।

আল্লাহ পাক বলেন, মাতা তাকে বড় কষ্টে গর্ভ ধারণ করেছে এবং অতি কষ্টে তাকে প্রসব করেছে, আর তাকে গর্ভে ধারণ করা ও দুধ ছাড়ানো ত্রিশ মাস । (সূরা লোকমান :১৪) রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন হাদিস শরীফে পিতা-মাতার আনুগত্য ও সদ্ব্যবহারের অনেক ফজিলত বর্ণনা করেছেন। যেমন- হযরত আবুদ্দারদা রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি তার নিকট এসে বললেন, আমার স্ত্রীকে আমার মা তালাক দেয়ার জন্য আদেশ দিচ্ছেন, তখন আবুদ্দারদা রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বর্ণনা করতে শুনেছি, পিতা-মাতা জান্নাতের মধ্যবর্তী দরজা। এখন তোমাদের ইচ্ছে, এর হেফাজত করো অথবা একে বিনষ্ট করে দাও। (তিরমিযী শরীফ -২/১২) অন্য এক হাদিসে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, পিতা-মাতার সন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতা-মাতার অসন্তুষ্টির মধ্যেই আল্লাহর অসন্তুষ্টি নিহিত। (তিরমিযী শরীফ-২/১২) অন্যত্রে হযরত আবু উমামা রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলেন, সন্তানের ওপর পিতা-মাতার দায়িত্ব কী? রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তারা উভয়েই তোমার জান্নাত অথবা জাহান্নাম। (ইবনে মাজাহ, পৃ-২৬০) এ হাদিসের উদ্দেশ্য হচ্ছে, তাদের আনুগত্য ও সেবাযত্ন জান্নাতে নিয়ে যায় এবং তাদের সাথে অসৎ আচরণ ও তাদের অসন্তুষ্টি জাহান্নামে পৌঁছে দেয়। অনেকে ধারণা করে থাকে, পিতা-মাতার আনুগত্য ও সদ্ব্যবহারের জন্য তাদেরকে ওলীয়ে কামেল বা সৎ ব্যক্তি হতে হবে, এমন ধারণা আদৌ ঠিক নয়। এমনকি যদি কারো পিতা-মাতা অমুসলিম হয়, তাহলে তাদের সাথেও সদ্ব্যবহার করার জন্য ইসলাম জোর নির্দেশ দিয়েছে।

এ ব্যাপারে ইমাম বুখারী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন। হযরত আসমা বিনতে আবু বকর রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমার মা মুশরিক অবস্থায় আমার নিকট আসলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জিজ্ঞেস করলাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার মা আমার নিকট দেখা করতে আসেন, আমি কি তার সাথে সদাচরণ করতে পারবো? রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, হ্যাঁ! তার সাথে সদ্ব্যবহার করো। (বুখারী শরীফ-২/৮৮৪) ইসলামে পিতা-মাতার খেদমত ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহারের গুরুত্ব এতো বেশি যে, জিহাদ ফরযে কেফায়ার স্তরে থাকা পর্যন্ত পিতা-মাতার অনুমতি ছাড়া সন্তানের জন্য জিহাদে অংশ গ্রহণ করা জায়েয নয়। বুখারী শরীফে আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -কে বলেন, আমি জিহাদে অংশ গ্রহণ করতে চাই, রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার পিতা-মাতা জীবিত আছেন কী? সে বললো, হ্যাঁ! রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তাহলে তুমি পিতা-মাতার সেবাযত্নে আত্ননিয়োগ করো। (বুখারী- ২/৮৮৩) পিতা-মাতার খেদমত, আনুগত্য ও তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করা সর্বাবস্থায় সন্তানের ওপর ওয়াজিব। তবে যখন পিতা-মাতা বার্ধক্যে উপনীত হয়, তখন তারা বেশি সন্তানের খেদমতের মুখাপেক্ষী হয়। তখন যদি সন্তানের পক্ষ থেকে সামান্যও বিমুখতা প্রকাশ পায়, তা তাদের অন্তরে ত হয়ে দেখা দেয়। তাই আল্লাহ পাক কোরআন মাজিদে পিতা-মাতা বার্ধক্যে উপনীত হলে, তাদের সাথে কিরূপ আচরণ করণীয়, তা সম্পর্কিত কতিপয় নির্দেশনা বিশেষভাবে সন্তানদেরকে প্রদান করে বলেন, তাদের একজন বা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হল

তাদেরকে ‘উহ’ শব্দটিও বলো না এবং তাদেরকে ধমকও দিও না, তাদের সাথে সম্মান সূচক শব্দ দ্বারা কথা বলিও। তাদের সামনে ভালবাসার সাথে নম্রভাবে মাথা নত করে দাও এবং বলো, হে প্রতিপালক! তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করো, যেমন তারা আমাকে শৈশব কালে লালন-পালন করেছেন। (সূরা বনী ইসরাঈল-২৩/২৪) আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ পাক সন্তানদেরকে কয়েকটি আদেশ প্রদান করেছেন, এক. পিতা-মাতাকে ‘উহ’ শব্দও বলবে না। এখানে ‘উহ’ শব্দ বলে এমন শব্দ বোঝানো হয়েছে, যা দ্বারা বিরক্তি প্রকাশ পায়। হযরত আলী রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহু থেকে বর্ণিত এক হাদিসে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, পীড়া দানের ‘উহ’ বলার চাইতেও কম কোনো স্তর থাকলে তাও অবশ্যই উল্লেখ করা হতো। সারকথা, যে কথায় পিতা- মাতার সামান্য কষ্ট হয়, তাও নিষিদ্ধ। (তাফসীরে কুরতুবী-৫/৫৭৯) দ্বিতীয়. তাদেরকে ধমক দিবে না। এটি যে বেদনাদায়ক তা সকলের কাছে স্পষ্ট। সন্তান হিসেবে পিতা-মাতার প্রতি সর্বদা বিনয়ী থাকা, তাদের প্রয়োজন পূরণ করা, তাদের সাথে নরম ভাষায় কথা বলা এবং তাদের মৃত্যুর পর তাদের মাগফিরাতের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করা প্রত্যেকের অপরিহার্য দায়িত্ব। মহান আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার তাওফিক দান করুন আমীন। লেখক: বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ লেখক ও কলামিস্ট হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী: প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি: জকিগঞ্জ উপজেলা সচেতন নাগরিক ফোরাম সিলেট।

সাবেক ইমাম ও খতীব: সিলেট নগরীর কদমতলী হযরত দরিয়া শাহ রহ. মাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ সিলেট। সাবেক প্রিন্সিপাল: হযরত শাহজালাল রহ. ৩৬০ আউলিয়া লতিফিয়া হাফিজিয়া মাদ্রাসা উপশহর সিলেট। সাবেক প্রধান শিক্ষক: তৈয়ব কামাল হযরত শাহজালাল রহ. লতিফিয়া হাফিজিয়া দাখিল মাদ্রাসা সিলেট।

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]