নিজস্ব প্রতিবেদক
পকেটে টাকা কম তাই নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে সংসার চালাতে কেনাকাটায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে ক্রেতাদের। একসময় যে বাজারে চাল-ডাল, আলু-পেঁয়াজ কেজি হিসেবে কেনা হতো, সেখানে ক্রেতারা এখন কিনছেন পোয়া, হালি কিংবা ৫০/১০০/২০০ টাকার পণ্য। বাজারের এই পরিবর্তনে শুধু ক্রেতারাই নন, বিক্রি কমে যাওয়া ও খাটুনি বেড়ে যাওয়ায় চাপে পড়ছেন
বিক্রেতারাও। রাজধানীর মালিবাগ রেলগেট কাঁচাবাজারে মুদিদোকানির সঙ্গে কথা বলছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা প্রহরী জয়নুল ইসলাম। ফর্দটা বড় নয়, তবে অদ্ভুত ঠেকতে পারে আগের যেকোনো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায়। ‘ভাই, এক হালি ডিম, এক পোয়া মসুর ডাল, আধা কেজি পেঁয়াজ আর ২/৩টা রসুন, দেন।’ দোকানি খলিল পলিথিনে মেপে মেপে জিনিসগুলো দিচ্ছেন। কোনো পণ্যের পরিমাণই কেজির ঘরে পৌঁছায়নি। পকেট থেকে টাকা বের করে জয়নুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘মাস শেষ হতে এখনো দশ দিন বাকি। বেতনের টাকা বাড়ি ভাড়া আর বাচ্চার স্কুলে চলে গেছে। এখন ব্যাগভর্তি কেনার সামর্থ্য নেই ভাই, দিন এনে দিন খাওয়ার মতো অল্প অল্প কিনতে হচ্ছে।’
নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি ও আয়-ব্যয়ের চরম অসঙ্গতিতে পড়ে নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশও বাজার করতে গিয়ে কেজির বা ডজনের বদলে ৫০/১০০/২০০ টাকার অঙ্কে হিসাব কষে পণ্য কিনছেন। বিজ্ঞাপন বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি কাটছাঁট হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রধান কয়েকটি পণ্যে- তেল, মসুর ডাল, চিনি, মাছ, মাংস এবং কাঁচা শাকসবজি ও মসলায়। আগে যেখানে আলু-পেঁয়াজ পাল্লা (৫ কেজি) বা কেজিতে কেনা হতো, এখন ক্রেতারা কেজি প্রতি দাম ধরে ৫০-১০০ টাকায় যতটুকু মেলে তা নিচ্ছেন। কেউ কাঁচামরিচ কিনছেন ২০ বা ৩০ টাকার। যারা ডিম ডজন বা এক খাঁচি (৩০ টি) করে নিতেন, তারা নেমে এসেছেন হালিতে। এখন ব্রয়লার মুরগিও অনেকে টুকরো করে কিংবা শুধু পা-গিলা-কলিজা কিনছেন। চাল-তেলে ভোক্তার নাভিশ্বাস, লাভের টাকায় পকেট ভারী কার? খোলা পোলাও চাল ১০০ টাকা, প্যাকেট মিলছে না দ্বিগুণ দামেও সাধ আর সাধ্য মিলছে না ইলিশের বাজারে মগবাজারের একটি শোরুমের বিক্রয়কর্মী সেলিনা আক্তার বলেন, আগে মাসে অন্তত দশ কেজি চাল, পাঁচ কেজি আলু, দুই কেজি করে ডাল ও পেঁয়াজ, এক কেজি চিনি একবারে কিনতাম। এখন প্রতিদিনেরটা প্রতিদিন কিনি। আজ ২৫০ গ্রাম মসুর ডাল, এক হালি ডিম, আর ২০ টাকার রসুন নিয়েছি। রাতে কোনোমতে ফুটিয়ে পাতলা ডাল, ডিম ভাজি আর ভাত খাব। না পারি সইতে, না পারি টিসিবির লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে। বাধ্য হয়ে পরিচিত দোকান থেকে অল্প অল্প করে জিনিস কিনতে হয়, মাসের শেষে প্রায়ই বাকিতে কেনাকাটা করতে হয়। একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক কামরুল হাসান মগবাজারের নয়াটোলায় গরুর মাংস বিক্রেতা সবুজ খান বলেন, আগে যিনি সাত কেজি মাংস নিতেন এখন তিন/চার কেজি নেন। যারা তিন/চার কেজি করে নিতেন তারা এক কেজি করে নেন। এর বাইরে অনেকেই এসে বলেন ৩০০-৫০০ টাকার মাংস দিতে। আমরা ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী কেজি প্রতি দাম ধরে ৩০০-৫০০ টাকার মাংস ওজন করে দেই। এখন নির্দিষ্ট ওজন না বরং নির্দিষ্ট টাকা দিয়ে মাংস কেনার লোকের সংখ্যা অনেক বেশি। তিনি বলেন, পারিবারিকভাবে তারা প্রায় ৫০ বছর ধরে এ ব্যবসা করে আসছেন। গত ১৭ বছর থেকে
তিনি নিজে দোকানটি পরিচালনা করছেন। আগের তুলনায় বিক্রি অনেকটাই কমে গেছে বলে জানান এই মাংস ব্যবসায়ী। বেশি খুচরো কেনাকাটায় বিক্রেতার অস্বস্তি: প্যাকেজিং ঝামেলা ও বাড়তি ব্যয় লাগামহীন এই বাজারে ক্রেতাদের ‘খুচরো’ কেনাকাটার প্রবণতা বিক্রেতাদের জন্যও স্বস্তির নয়। তাদের দাবি- এতে করে কমেছে বিক্রি ও মুনাফা , উল্টো বেড়েছে খাটুনি। মগবাজারের নয়াটোলা এলাকার মুদি ব্যবসায়ী মো. হারুন মিয়া জানান, আগে যেখানে দিনে ১৫-২০ কেজি মসুর ডাল এক-দুই কেজি করে কয়েকজনের কাছেই বিক্রি হয়ে যেত, এখন সেই পরিমাণ ডাল বিক্রি করতে অন্তত ৫০ জন ক্রেতা সামলাতে হয়। হারুন বলেন, আগে ১০০ গ্রাম বা আড়াইশ গ্রাম মসুর ডাল কেউ চাইলে আমরা বিরক্তি প্রকাশ করতাম। এখন সেই ক্রেতাই সবচেয়ে বেশি। দিনে কয়েকশ বার পাল্লায় ১০০-২০০ গ্রাম মাপতে গিয়ে সময় নষ্ট হয়, দোকানে ভিড় জমে কিন্তু বিক্রি বাড়ে না। ব্যবসায়ীরা আরও জানান, ছোট ছোট পরিমাণে পণ্য দিতে গিয়ে পলিথিন ও ছোট প্যাকেটের ব্যবহার বেড়েছে তিন থেকে চার গুণ। এক কেজি চাল বা ডাল একবার প্যাক করতে যে খরচ ও সময় লাগে, তা চার বা আট ভাগে বিক্রি করতে বিক্রেতার বাড়তি কয়েক টাকা পলিথিন বাবদই খরচ হয়ে যায়। সবজি বিক্রেতা সুজন মিয়া বলেন, অনেকে এসে বলে- মামা, দুইটা পটল আর একটা বেগুন দেন। এভাবে বিক্রি করলে বাকি সবজি শুকিয়ে নষ্ট হয়, লাভ তো দূরের কথা, লোকসান গুনতে হয়। আরও পড়ুন চড়া দামে মাছ-মুরগি-ডিম, বাড়তি দামেও তেলের সংকট চট্টগ্রামে ইলিশ আহরণে জ্বালানির বড় খরচ, প্রভাব পড়ছে দামে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব সবজির বাজারে অর্থনীতির বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই খুচরো কেনাকাটায় ক্রেতার অজান্তেই খরচ আরও বেড়ে যায়। যেমন- এক কেজি মসুর ডালের দাম ১৫০ টাকা হলেও এক পোয়া (২৫০ গ্রাম) কিনতে গেলে নেওয়া হচ্ছে ৪০/৪৫ টাকা, যার ফলে কেজি পড়ে যায় ১৬০-১৮০ টাকা। অর্থাৎ নগদ টাকার টান সামলাতে গিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষগুলোকে উল্টো বাড়তি মাশুল দিতে হচ্ছে। বাজার তদারকি বনাম অপ্রতুল সরকারি উদ্যোগ বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার টিসিবির মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ডে স্বল্পমূল্যে পণ্য দিচ্ছে এবং খোলা ট্রাকে ওএমএস (খোলা বাজারে বিক্রি) কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে চাহিদার তুলনায় এই সরবরাহ একেবারেই অপ্রতুল। ভোর থেকেই টিসিবির ট্রাকের পেছনে নারী-পুরুষের শত শত গজের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে পুড়েও অনেকে খালি হাতে ফিরছেন। নিয়মিত বাজার তদারকি বা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান চললেও পাইকারি ও খুচরা বাজারের অদৃশ্য সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না। অভিযান চলাকালীন দোকান বন্ধ করে রাখা বা জরিমানা দিয়ে আবারও পুরোনো দামে ফিরে যাওয়ার ঘটনাই নিত্যদিনের চিত্র। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কেবল জরিমানা করে এই সংকটের সমাধান হবে না। সরবরাহ চেইন ঠিক রাখা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরাসরি সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী বা রেশনিং ব্যবস্থার আওতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। কমলা ৫৫০, মাল্টা ৪৫০ টাকা কেজি শিমের কেজি ২০০, ব্রয়লার ১৮০ টাকা হঠাৎ চড়া
সবজির বাজার কাটছাঁটের বাজারে, পুষ্টিহীনতার নীরব ঝুঁকি বাজারের এই কাটছাঁটের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লাগছে পরিবারের শিশু ও বয়স্কদের ওপর। পুষ্টিবিদদের মতে, মাছ-মাংস বাদ দিয়ে শুধু পাতলা ডাল, আলুভর্তা বা এক টুকরো ডিম দিয়ে ভাত খাওয়ার ফলে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি প্রোটিন ঘাটতি ও পুষ্টিহীনতা তৈরি হচ্ছে। মানুষ এখন কেবল ক্ষুধা মেটাতে ভাত আর আলু খাচ্ছে, যা মূলত শর্করা। কিন্তু মাছ, মাংস, ডিম বা পর্যাপ্ত ডাল না থাকায় খাবারে প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও অণুপুষ্টি যেমন- আয়রন, ক্যালসিয়াম, জিংকের তীব্র ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘হিডেন হাঙ্গার’ বা লুকায়িত ক্ষুধা। এর সবচেয়ে মারাত্মক শিকার হচ্ছে শিশুরা। বাড়ন্ত বয়সে প্রোটিনের ঘাটতি হলে তাদের শারীরিক বৃদ্ধি থমকে যাবে, মেধার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে। পুষ্টিবিদ নিশাত লামিয়া তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব একটি প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাকেও খাটো করে ফেলছে। এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে, আগামী কয়েক বছর পর একটি রুগ্ণ প্রজন্ম তৈরির মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে এর চেয়ে বহুগুণ বেশি মাশুল দিতে হবে আমাদের।
পকেটে টাকা কম তাই নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে সংসার চালাতে কেনাকাটায় কাটছাঁট করতে হচ্ছে ক্রেতাদের। একসময় যে বাজারে চাল-ডাল, আলু-পেঁয়াজ কেজি হিসেবে কেনা হতো, সেখানে ক্রেতারা এখন কিনছেন পোয়া, হালি কিংবা ৫০/১০০/২০০ টাকার পণ্য। বাজারের এই পরিবর্তনে শুধু ক্রেতারাই নন, বিক্রি কমে যাওয়া ও খাটুনি বেড়ে যাওয়ায় চাপে পড়ছেন
বিক্রেতারাও। রাজধানীর মালিবাগ রেলগেট কাঁচাবাজারে মুদিদোকানির সঙ্গে কথা বলছেন একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা প্রহরী জয়নুল ইসলাম। ফর্দটা বড় নয়, তবে অদ্ভুত ঠেকতে পারে আগের যেকোনো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায়। ‘ভাই, এক হালি ডিম, এক পোয়া মসুর ডাল, আধা কেজি পেঁয়াজ আর ২/৩টা রসুন, দেন।’ দোকানি খলিল পলিথিনে মেপে মেপে জিনিসগুলো দিচ্ছেন। কোনো পণ্যের পরিমাণই কেজির ঘরে পৌঁছায়নি। পকেট থেকে টাকা বের করে জয়নুল দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘মাস শেষ হতে এখনো দশ দিন বাকি। বেতনের টাকা বাড়ি ভাড়া আর বাচ্চার স্কুলে চলে গেছে। এখন ব্যাগভর্তি কেনার সামর্থ্য নেই ভাই, দিন এনে দিন খাওয়ার মতো অল্প অল্প কিনতে হচ্ছে।’
নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি ও আয়-ব্যয়ের চরম অসঙ্গতিতে পড়ে নিম্নবিত্ত তো বটেই, মধ্যবিত্তের বড় একটি অংশও বাজার করতে গিয়ে কেজির বা ডজনের বদলে ৫০/১০০/২০০ টাকার অঙ্কে হিসাব কষে পণ্য কিনছেন। বিজ্ঞাপন বাজারে ঘুরে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি কাটছাঁট হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রধান কয়েকটি পণ্যে- তেল, মসুর ডাল, চিনি, মাছ, মাংস এবং কাঁচা শাকসবজি ও মসলায়। আগে যেখানে আলু-পেঁয়াজ পাল্লা (৫ কেজি) বা কেজিতে কেনা হতো, এখন ক্রেতারা কেজি প্রতি দাম ধরে ৫০-১০০ টাকায় যতটুকু মেলে তা নিচ্ছেন। কেউ কাঁচামরিচ কিনছেন ২০ বা ৩০ টাকার। যারা ডিম ডজন বা এক খাঁচি (৩০ টি) করে নিতেন, তারা নেমে এসেছেন হালিতে। এখন ব্রয়লার মুরগিও অনেকে টুকরো করে কিংবা শুধু পা-গিলা-কলিজা কিনছেন। চাল-তেলে ভোক্তার নাভিশ্বাস, লাভের টাকায় পকেট ভারী কার? খোলা পোলাও চাল ১০০ টাকা, প্যাকেট মিলছে না দ্বিগুণ দামেও সাধ আর সাধ্য মিলছে না ইলিশের বাজারে মগবাজারের একটি শোরুমের বিক্রয়কর্মী সেলিনা আক্তার বলেন, আগে মাসে অন্তত দশ কেজি চাল, পাঁচ কেজি আলু, দুই কেজি করে ডাল ও পেঁয়াজ, এক কেজি চিনি একবারে কিনতাম। এখন প্রতিদিনেরটা প্রতিদিন কিনি। আজ ২৫০ গ্রাম মসুর ডাল, এক হালি ডিম, আর ২০ টাকার রসুন নিয়েছি। রাতে কোনোমতে ফুটিয়ে পাতলা ডাল, ডিম ভাজি আর ভাত খাব। না পারি সইতে, না পারি টিসিবির লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে। বাধ্য হয়ে পরিচিত দোকান থেকে অল্প অল্প করে জিনিস কিনতে হয়, মাসের শেষে প্রায়ই বাকিতে কেনাকাটা করতে হয়। একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক কামরুল হাসান মগবাজারের নয়াটোলায় গরুর মাংস বিক্রেতা সবুজ খান বলেন, আগে যিনি সাত কেজি মাংস নিতেন এখন তিন/চার কেজি নেন। যারা তিন/চার কেজি করে নিতেন তারা এক কেজি করে নেন। এর বাইরে অনেকেই এসে বলেন ৩০০-৫০০ টাকার মাংস দিতে। আমরা ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী কেজি প্রতি দাম ধরে ৩০০-৫০০ টাকার মাংস ওজন করে দেই। এখন নির্দিষ্ট ওজন না বরং নির্দিষ্ট টাকা দিয়ে মাংস কেনার লোকের সংখ্যা অনেক বেশি। তিনি বলেন, পারিবারিকভাবে তারা প্রায় ৫০ বছর ধরে এ ব্যবসা করে আসছেন। গত ১৭ বছর থেকে
তিনি নিজে দোকানটি পরিচালনা করছেন। আগের তুলনায় বিক্রি অনেকটাই কমে গেছে বলে জানান এই মাংস ব্যবসায়ী। বেশি খুচরো কেনাকাটায় বিক্রেতার অস্বস্তি: প্যাকেজিং ঝামেলা ও বাড়তি ব্যয় লাগামহীন এই বাজারে ক্রেতাদের ‘খুচরো’ কেনাকাটার প্রবণতা বিক্রেতাদের জন্যও স্বস্তির নয়। তাদের দাবি- এতে করে কমেছে বিক্রি ও মুনাফা , উল্টো বেড়েছে খাটুনি। মগবাজারের নয়াটোলা এলাকার মুদি ব্যবসায়ী মো. হারুন মিয়া জানান, আগে যেখানে দিনে ১৫-২০ কেজি মসুর ডাল এক-দুই কেজি করে কয়েকজনের কাছেই বিক্রি হয়ে যেত, এখন সেই পরিমাণ ডাল বিক্রি করতে অন্তত ৫০ জন ক্রেতা সামলাতে হয়। হারুন বলেন, আগে ১০০ গ্রাম বা আড়াইশ গ্রাম মসুর ডাল কেউ চাইলে আমরা বিরক্তি প্রকাশ করতাম। এখন সেই ক্রেতাই সবচেয়ে বেশি। দিনে কয়েকশ বার পাল্লায় ১০০-২০০ গ্রাম মাপতে গিয়ে সময় নষ্ট হয়, দোকানে ভিড় জমে কিন্তু বিক্রি বাড়ে না। ব্যবসায়ীরা আরও জানান, ছোট ছোট পরিমাণে পণ্য দিতে গিয়ে পলিথিন ও ছোট প্যাকেটের ব্যবহার বেড়েছে তিন থেকে চার গুণ। এক কেজি চাল বা ডাল একবার প্যাক করতে যে খরচ ও সময় লাগে, তা চার বা আট ভাগে বিক্রি করতে বিক্রেতার বাড়তি কয়েক টাকা পলিথিন বাবদই খরচ হয়ে যায়। সবজি বিক্রেতা সুজন মিয়া বলেন, অনেকে এসে বলে- মামা, দুইটা পটল আর একটা বেগুন দেন। এভাবে বিক্রি করলে বাকি সবজি শুকিয়ে নষ্ট হয়, লাভ তো দূরের কথা, লোকসান গুনতে হয়। আরও পড়ুন চড়া দামে মাছ-মুরগি-ডিম, বাড়তি দামেও তেলের সংকট চট্টগ্রামে ইলিশ আহরণে জ্বালানির বড় খরচ, প্রভাব পড়ছে দামে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব সবজির বাজারে অর্থনীতির বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই খুচরো কেনাকাটায় ক্রেতার অজান্তেই খরচ আরও বেড়ে যায়। যেমন- এক কেজি মসুর ডালের দাম ১৫০ টাকা হলেও এক পোয়া (২৫০ গ্রাম) কিনতে গেলে নেওয়া হচ্ছে ৪০/৪৫ টাকা, যার ফলে কেজি পড়ে যায় ১৬০-১৮০ টাকা। অর্থাৎ নগদ টাকার টান সামলাতে গিয়ে নিম্ন আয়ের মানুষগুলোকে উল্টো বাড়তি মাশুল দিতে হচ্ছে। বাজার তদারকি বনাম অপ্রতুল সরকারি উদ্যোগ বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার টিসিবির মাধ্যমে ফ্যামিলি কার্ডে স্বল্পমূল্যে পণ্য দিচ্ছে এবং খোলা ট্রাকে ওএমএস (খোলা বাজারে বিক্রি) কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে চাহিদার তুলনায় এই সরবরাহ একেবারেই অপ্রতুল। ভোর থেকেই টিসিবির ট্রাকের পেছনে নারী-পুরুষের শত শত গজের দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে পুড়েও অনেকে খালি হাতে ফিরছেন। নিয়মিত বাজার তদারকি বা জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযান চললেও পাইকারি ও খুচরা বাজারের অদৃশ্য সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হচ্ছে না। অভিযান চলাকালীন দোকান বন্ধ করে রাখা বা জরিমানা দিয়ে আবারও পুরোনো দামে ফিরে যাওয়ার ঘটনাই নিত্যদিনের চিত্র। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কেবল জরিমানা করে এই সংকটের সমাধান হবে না। সরবরাহ চেইন ঠিক রাখা এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সরাসরি সামাজিক সুরক্ষা বেষ্টনী বা রেশনিং ব্যবস্থার আওতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। কমলা ৫৫০, মাল্টা ৪৫০ টাকা কেজি শিমের কেজি ২০০, ব্রয়লার ১৮০ টাকা হঠাৎ চড়া
সবজির বাজার কাটছাঁটের বাজারে, পুষ্টিহীনতার নীরব ঝুঁকি বাজারের এই কাটছাঁটের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি লাগছে পরিবারের শিশু ও বয়স্কদের ওপর। পুষ্টিবিদদের মতে, মাছ-মাংস বাদ দিয়ে শুধু পাতলা ডাল, আলুভর্তা বা এক টুকরো ডিম দিয়ে ভাত খাওয়ার ফলে নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি প্রোটিন ঘাটতি ও পুষ্টিহীনতা তৈরি হচ্ছে। মানুষ এখন কেবল ক্ষুধা মেটাতে ভাত আর আলু খাচ্ছে, যা মূলত শর্করা। কিন্তু মাছ, মাংস, ডিম বা পর্যাপ্ত ডাল না থাকায় খাবারে প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও অণুপুষ্টি যেমন- আয়রন, ক্যালসিয়াম, জিংকের তীব্র ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘হিডেন হাঙ্গার’ বা লুকায়িত ক্ষুধা। এর সবচেয়ে মারাত্মক শিকার হচ্ছে শিশুরা। বাড়ন্ত বয়সে প্রোটিনের ঘাটতি হলে তাদের শারীরিক বৃদ্ধি থমকে যাবে, মেধার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে। পুষ্টিবিদ নিশাত লামিয়া তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব একটি প্রজন্মের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাকেও খাটো করে ফেলছে। এই অবস্থার পরিবর্তন না হলে, আগামী কয়েক বছর পর একটি রুগ্ণ প্রজন্ম তৈরির মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে এর চেয়ে বহুগুণ বেশি মাশুল দিতে হবে আমাদের।