হাত ধোয়া শুধু নিয়ম নয়, শিক্ষার্থীদের নিত্যদিনের শিক্ষা

আপলোড সময় : ১৫-১০-২০২৬ ০২:১৫:৩৭ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৫-১০-২০২৬ ০২:১৯:০৩ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক

শ্রেণিকক্ষে প্রবেশের আগে হাত ধোয়ার বিষয়টি শুধু নিয়ম নয়, বরং হাত ধোয়াকে নিজেদের পড়াশোনার নিয়মিত অংশ মনে করছে শিক্ষার্থীরা। প্রতিদিন শিক্ষকদের নির্দেশনায় এমনই অভ্যাস গড়ে উঠেছে বরগুনার সানবীম ও এফএম স্কুল নামে দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের। আর হাত ধোয়ার এমন অভ্যাসের কারণে শুধু স্কুলেই নয়, এখন বাসায়ও শিক্ষার্থীরা একই চর্চা করছে বলে জানিয়েছেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দুটির শিক্ষক ও বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। শিক্ষকদের দাবি, শিশুদেরকে সুস্থ রাখার পরিকল্পনা থেকেই এ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আর এমন অভ্যাসের ফলে স্কুল দুটিতে অসুস্থতাজনিত কারণে অনুপস্থিত থাকা শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও কমেছে বলে জানান তারা। তবে ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত স্কুল দুটির চিত্র এমন হলেও জেলার অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালেয়ের চিত্র ভিন্ন। অধিকাংশ স্কুলে ওয়াশ ব্লক থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে নানা কারণে অকেজো হয়ে সেগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে এসব স্কুলের শিক্ষার্থীদের হাত ধোয়া তো দূরের কথা খাবার পানিও বাড়ি থেকে আনতে হয় তাদের।

বরগুনা পৌরশহরের কলেজ রোড এলাকায় ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত সানবীম ও এফএম স্কুল নামে ওই স্কুল দুটি ঘুরে দেখা যায়, স্কুলের বিভিন্ন ক্লাস রুমের দরজার আশপাশেসহ বিভিন্ন জায়গায় লাগানো রয়েছে সচেতন বার্তা। হাত ধোয়ার জন্য রয়েছে একাধিক বেসিন এবং রাখা আছে সাবান অথবা হ্যান্ডওয়াশ। শিক্ষার্থীরা স্কুলে এসে প্রয়োজন অনুযায়ী হাত ধুয়ে ক্লাসে প্রবেশ করছে। এ ছাড়া প্রায় সময়ই স্কুলের শিক্ষার্থীদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে এবং খাওয়ার আগে হাত ধোয়ার বিষয়ে সচেতন করছেন শিক্ষকরা। বিশেষ করে স্কুল শুরুর আগে এসেম্বলির সময়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে শিক্ষার্থীদের সচেতন করেন তারা। আর স্কুল দুটির শিক্ষকদের এমন উদ্যোগকে প্রশংসনীয় বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা। শিক্ষার্থীদের দাবি, শিক্ষকদের নির্দেশনায় হাত ধোয়া এখন তাদের নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। সানবীম স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাতিহা বিনতে নাজমুল ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাসা থেকে স্কুলে এসে বিভিন্ন জিনিসের সংস্পর্শে আসায় আমাদের হাত জীবাণুর সংস্পর্শে আসে। ক্লাস শুরুর আগে শিক্ষকরা আমাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকাসহ হাত ধোয়ার কথা বলেন।


আমরা ক্লাস রুমে প্রবেশের আগে এবং খাবার খাওয়ার আগে নিয়মিত হাত ধুই। এটা আমাদের এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। একই স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী মো. ফায়াজ মুহতাসীর ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের স্কুলে অনেকগুলো বেসিন আছে। প্রায় সময়ই শিক্ষকরা ক্লাসে এসে আমাদেরকে হাত ধোয়ার কথা বলেন। আমরা নিয়মিতই হাত ধুয়ে ক্লাসে প্রবেশ করি। সচেতনতা থাকলেও টেকসই হয়নি হাত ধোয়ার অভ্যাস সঠিকভাবে হাত না ধুলে যে রোগে আপনি আক্রান্ত হবেন হাসপাতালের ওয়াশরুম যেন ‘রোগ বাড়ানোর’ কারখানা এফএম স্কুলের শিক্ষার্থী তাবিবা সুলতানা তথা ঢাকা পোস্টকে বলেন, শিক্ষকরা আমাদের হাত ধোয়ার জন্য বলেন। যাতে আমরা সুস্থ এবং নিরাপদ থাকতে পারি। আমরা প্রতিদিনই হাত ধুই। স্কুল এবং বাড়ি উভয় জায়গায়তেই আমরা এ কাজ করি। দুই সন্তানকে সানবীম স্কুলে ভর্তি করেছেন মো. আল জাহিদুল সিদ্দিকী রুবেল। তিনি ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমার দুই বাচ্চা সানবীম স্কুলে পড়াশোনা করে। স্কুলটিতে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা আছে। আমি মনে করি, সব স্কুলেই এমন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। যাতে ডায়রিয়াসহ জীবাণু আক্রান্ত হয়ে যেসব রোগ হয় তা থেকে শিশুরা নিরাপদে থাকতে পারে। শিক্ষার্থীদেরকে হাত ধোয়ার জন্য উদ্ভুদ্ধ করতে স্কুলে সচেতনতামূলক বার্তাসহ বিভিন্ন উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সানবীম স্কুলের অধ্যক্ষ

কাজী সাজ্জাদ হোসাইন ঢাকা পোস্টকে বলেন, স্কুলের শিশুদের সুস্থ রাখার জন্য আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে থাকি। বিশেষ করে হাত ধোয়ার বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কারণ বিভিন্ন ধরনের সংক্রামণ ব্যাধি থেকে রক্ষা পেতে জীবাণুমুক্ত থাকতে হাত ধোয়ার গুরুত্ব রয়েছে। আরও পড়ুন বিদ্যালয়ে পানি-স্যানিটেশনে বাংলাদেশের অগ্রগতি, হাইজিনে পিছিয়ে গ্রাম হাত ধোয়ার বেসিন ধসে ২ শিশুর মৃত্যু ঘুম থেকে উঠে হাত ধোয়ার গুরুত্ব নিয়মিত এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয় কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বছরের শুরু থেকেই স্কুলে আসা নতুন শিশুসহ সবাইকে হাত ধোয়ার বিষয়ে আমরা সচেতন করি। আর এ কারণেই আমাদের স্কুলে অসুস্থতাজনিত কারণে অনুপস্থিত থাকা শিক্ষার্থীদের হার কম। আমাদের এই চেষ্টার মাধ্যমে অভিভাবকরাও সচেতন হয়েছেন। পাশাপাশি স্কুলের শিশুরাও বাসায় গিয়ে এ চর্চা করছে। আমাদের প্রচেষ্টায় শিশুদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে আমরা অনেকটাই সফল হয়েছি। যে কারণে আমাদের শিশুরা জীবাণুমুক্ত থেকে অনেকটাই সুস্থ থাকছে। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী প্রতি বছর ডায়রিয়া ও চর্ম রোগসহ বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসে অসংখ্য শিশু। আর এসব রোগ থেকে সুরক্ষা পেতে নিয়মিত হাত ধোয়ার পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার গুরুত্ব রয়েছে। বরগুনার সিভিল সার্জন অফিসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর শুরু থেকে এখন পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে শুধু ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ৮ হাজার ৪১৪ জন। আক্রান্ত এসব রোগীদের মধ্যে বরগুনা জেনারেল হাসপাতালেই চিকিৎসা নিয়েছে ১ হাজার ৩৩২ জনই শিশু। রোগ আক্রান্ত প্রতিরোধে অভিভাবকদের সচেতনতার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিয়মিত হাত ধোয়া এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার অভ্যাস তৈরি করতে হবে। এতে শিশুদের বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে অনেকটাই রক্ষা করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন হাসপাতালে কর্তব্যরত শিশু ওয়ার্ডের চিকিৎসকরা।


বরগুনার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেলের হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে কর্তব্যরত মেডিকেল অফিসার ডা. শায়লা আক্তার ঢাকা পোস্টকে বলেন, হাত ধোয়ার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যে কোনো রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসার থেকে রোগ প্রতিরোধে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। অধিকাংশ রোগই হাত ধোয়ার মাধ্যমে প্রতিকার করা যায়। ডায়রিয়া ঠান্ডা-কাশিসহ অনেক রোগই হাত ধোয়ার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা যায়। বিশেষ করে অনেক বেশি শিশুরা চর্মরোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসে। যা হাত ধোয়ার মাধ্যমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকলে কমিয়ে আনা সম্ভব। আমি মনে করি প্রত্যেকটি বাসায় এ অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। পাশাপাশি বাচ্চাদের স্কুলগুলোতেও হাত ধোয়ার ব্যবস্থা থাকা দরকার এবং শিক্ষক ও অভিভাবকদেরকেও শিশুদের হাত ধোয়ার বিষয়ে সচেতন করা প্রয়োজন। আরও পড়ুন হাত ধোয়া নিয়ে যা বলেছেন নবীজি হাত ধোয়ার অভ্যাসে অনেক রোগ থেকে মুক্তি সম্ভব বরগুনায় ব্যাক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাত ধোয়ার বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করা হলেও অধিকাংশ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই এ বিষয়ে তেমন কোনো গুরুত্ব। এমনকি বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষার্থীদের জন্য ওয়াশ ব্লক নির্মাণ করা হলেও নানা কারণে নষ্ট হয়ে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে অধিকাংশ স্কুলের ওয়াশ ব্লক। আর এ কারণে স্কুলে এসে অনেক কিছুর সংস্পর্শে আসায় হাত থেকে ছড়ানো জীবাণুর সংক্রমণে ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কায় পড়তে হচ্ছে শিশুদের। বরগুনা পৌরসভার জিলা স্কুল-সংলগ্ন বরগুনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ওয়াশ ব্লক। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পানির ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় বর্তমানে ওয়াশ ব্লকটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এতে স্কুলে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য বোতলে করে পানি আনতে হয় অভিভাবকদের। ফলে সীমিত পানি দিয়ে খাওয়া ব্যতীত চাইলেও অন্য আর কোনো কাজ করতে পারছেন না তারা। একই অবস্থা পুলিশ লাইন কালী বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েরও। স্কুলে ওয়াশ ব্লক আছে কিন্তু নেই কোনো পানির ব্যবস্থা। বরগুনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ুয়া এক শিক্ষার্থীর মা ভুলু রানী কর্মকার ঢাকা পোস্টকে বলেন, স্কুলে ওয়াশ ব্লক আছে কিন্তু পানি নেই। আর পানি না থাকার কারণে ওয়াশ ব্লকটি বন্ধ থাকে। সকাল ৯টায় বাচ্চাকে নিয়ে স্কুলে আসতে হয় এবং বিকেল ৪টায় ছুটি হয়।


প্রতিদিন আমাদের বাড়ি থেকে তিন-চার বোতল পানি নিয়ে আসতে হয়। আরও পড়ুন হাত ধোয়া নিয়ে বিয়েবাড়িতে সংঘর্ষে আহত ১৫ বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস, ধুলো আর ময়লায় ভরা বেসিন মুখে নেই মাস্ক, হাত ধোয়ায় অনীহা একই অবস্থায় থাকা বরগুনার পুলিশ লাইন কালী বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক স্বপন কুমার শীল ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের স্কুলের বাচ্চারা পানির অভাবে হাত ধোয়ার কোনো সুযোগ পায় না। খাবার নিয়ে আসলে, বোতলে করে সীমিত যে পানি নিয়ে আসে তা দিয়ে তাদের কিছুই হয় না। আমাদের স্কুলে ওয়াশ ব্লক আছে কিন্তু পানি নেই। এ কারণে ওয়াশ ব্লক অকেজো হয়ে আছে। স্কুলের বাচ্চারা পানির কারণে ভবিষ্যতে যাতে কোনো রোগে আক্রান্ত না হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষ যদি ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাহলে আমাদের এ সমস্যার সমাধান হবে। নির্মাণের পর বিভিন্ন কারণে অনেক প্রাথমিক বিদ্যালেরই ওয়াশ ব্লক অকেজো হয়ে যাওয়ায় সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় কি ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে জানতে চাইলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আবু জাফর মো. ছালেহ ঢাকা পোস্টকে বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালে যেসব ওয়াশ ব্লক নির্মাণ করা হয়েছে তা পিইডিপির (PEDP) এক থকে চারটি প্রজেক্টের মাধ্যমে করা হয়েছে। নির্মাণের ধারাবাহিকতায় যেগুলো আগে হয়েছে তার মধ্যে কিছু মেরামতযোগ্য হতে পারে। আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে চাহিদাপত্র চায় তখন আমরা প্রস্তাবনা পাঠাই। পরবর্তীতে সেগুলো মেরামত করা হয়।

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]