নিজস্ব প্রতিবেদক
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে কটূক্তি ও ধর্ম অবমাননার অভিযোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সৈকত হালদারকে স্থায়ী বহিষ্কারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি এ সময় চার দফা দাবি জানান তারা।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে মিছিলটি শুরু হয়। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে প্রক্টর কার্যালয়ের সামনে সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচি শেষ হয়।
মিছিলে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। সমাবেশে জাবি শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর অভিযোগের দ্রুত তদন্ত এবং প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাভাবিক ও শান্তিপূর্ণ শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। এদিকে সৈকত হালদারকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। একই ঘটনায় অভিযোগ তদন্তে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার ড. এ বি এম আজিজুর রহমান স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। তার ক্লাস রোল নম্বর ১১৮৬ এবং রেজিস্ট্রেশন নম্বর ২০২২২০৫৫৭৯২। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলের আবাসিক শিক্ষার্থী।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এক অফিস আদেশে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের শৃঙ্খলা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ-২০১৮’-এর ৪(১)(খ) ধারা অনুযায়ী ওই শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।
অন্য অফিস আদেশে বলা হয়, অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর কর্মকাণ্ড দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ২৯৫(ক) ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা সংক্রান্ত অধ্যাদেশ অনুযায়ী অসদাচরণের শামিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের জন্য অধ্যাদেশ-২০১৮-এর ৪(১)(ক) ধারা অনুযায়ী চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
কমিটির সভাপতি করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোস্তফা নাজমুল মানছুরকে। সদস্য সচিবের দায়িত্ব পেয়েছেন ডেপুটি রেজিস্ট্রার (সাধারণ প্রশাসন) মো. মাহতাব-উজ-জাহিদ। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (আইবিএ-জেইউ) অধ্যাপক ড. কে এম জাহিদুল ইসলাম এবং শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ হলের ওয়ার্ডেন ড. মো. আলমগীর কবির।
অফিস আদেশে তদন্ত কমিটিকে আগামী ১০ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত কার্যক্রম শেষ করে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এদিকে সৈকত হালদারকে স্থায়ী বহিষ্কার প্রসঙ্গে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) সাবেক তথ্যপ্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক রাশিদুল ইসলাম লিখন বলেন, অভিযোগটি দ্রুত নিষ্পত্তি করে দায় প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি এ ধরনের ঘটনা মোকাবিলায় প্রশাসনিক পদক্ষেপের পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
জানা যায়, সমাবেশ থেকে শিক্ষার্থীরা ৪ দফা দাবি জানান। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে-আগামী ৩ কর্মদিবসের মধ্যে সৈকত হালদারের বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ করা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাকে স্থায়ী বহিষ্কার ও তার বিরুদ্ধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা করা, একই বিভাগের শিক্ষার্থী বন্ধন কুমার মণ্ডলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ পুনরায় তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া, হিম উৎসব-২০২৬-এ ধর্মীয় অবমাননার অভিযোগ নিষ্পত্তি করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো। পাশাপাশি ধর্মীয় অবমাননার ঘটনায় স্থায়ী বহিষ্কারের বিধান রেখে কঠোর নীতিমালা তৈরির দাবিও জানান তারা।
শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক শামসুল আলম প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন। দাবিগুলোকে যৌক্তিক বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৫১তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা এক বিবৃতিতে ঘটনার নিন্দা জানিয়ে অভিযোগের নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত দাবি করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যের সত্যতা যাচাই না করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয় বলে জানান তারা। পাশাপাশি অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি ও দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তদন্ত প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
বিবৃতিতে শিক্ষার্থীরা উল্লেখ করেন, ন্যায়বিচারের দাবি যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ, হুমকি কিংবা সহিংসতার রূপ না নেয়। তারা প্রশাসনের কাছে অভিযোগের যথাযথ নিষ্পত্তি এবং ভবিষ্যতে ধর্মীয় অবমাননা ও পারস্পরিক বিদ্বেষ সৃষ্টিকারী ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রত্যাশা করেন।