মানুষ তবুও গানেই ফেরে, গানেই ভেড়ে

আপলোড সময় : ১১-১০-২০২৬ ০২:৫২:১০ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১১-১০-২০২৬ ০২:৫৩:৩৩ অপরাহ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক


বয়স মোটামুটি ২৫ পার করেছেন, এমন প্রায় সকলেই কথাটি শুনে বড় হয়েছেন—‘আউল বাউল লালনের দেশ, এই বাংলাদেশ’। এই দেশেরই আনাচে-কানাচে সুরের নহর বয়ে চলেছে আদিকাল ধরে। প্রায় প্রত্যেকটি অঞ্চলে রয়েছে আলাদা ঢঙের গান। এখনো কৃষক ধানের গোছা রোপণ করতে করতে গেয়ে ওঠেন আপন মনে, কবিরাজ তার চিকিৎসা দিতে দিতেও শোনায় গান, নৌকার গলুইয়ে বসে এখনো ঢেউয়ের তালে গেয়ে ওঠে মাঝির দরাজ কণ্ঠ। আবার পারিবারিক বা সামাজিক কোনো অনুষ্ঠানে এখনো বয়োজ্যেষ্ঠ নারীরা সমবেত কণ্ঠে গেয়ে ওঠেন পুরনো দিনের আঞ্চলিক কোনো গান। তানজিন তিশার দুর্ঘটনার খবরে বিভ্রান্তি ‘চাচ্চু’ শাকিবের সঙ্গে দীঘির দেখা হলো কোথায়? চেহারা-কণ্ঠ নকল করে ‘আপত্তিকর’ ভিডিও, ঝুঁকিতে শোবিজ তারকারা এ-ই তো বাংলাদেশ।


এমনই সুরের সুতোয় বাঁধা এর প্রতিটি অঞ্চল। অথচ এই ভাটিয়ালী, ভাওয়াইয়া, জারি-সারি কিংবা গম্ভীরার দেশে সাম্প্রতিক সময়ে বহুবার গানের অনুষ্ঠান পণ্ড হয়েছে। কিছু নির্দিষ্ট মানুষের আপত্তির মুখে অনেক কনসার্ট বাতিল হয়েছে। এসব নিয়ে সমালোচনা-প্রতিবাদও হয়েছে ঢের। বিজ্ঞাপন তবে বাংলাদেশ যে গানের দেশ, এখানকার মানুষ যে দিনশেষে সুরের সারথী, তা প্রমাণিত হয় বারবার। শনিবার (১০ অক্টোবর) রাতে ময়মনসিংয়ের সার্কিট হাউজ মাঠেও তার নজির দেখা গেল। এ রাতে সেখানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল কনসার্ট, গান করেছিল ব্যান্ড ‘অ্যাশেজ’। মাত্র একদিন আগে এই কনসার্টে পারফর্ম করার খবর জানায় ব্যান্ডটি। তারপরও কনসার্টের ভেন্যু রূপ নেয় জনসমুদ্রে। মাঠ ছাড়িয়ে রাস্তা, যতদূর চোখ যায়, শুধু মানুষ আর মানুষ।



হালের জনপ্রিয় ব্যান্ডটির গান শুনতে শুধু ময়মনসিংহই নয়, আশেপাশের নানা জেলা থেকেও অনেকে ছুটে এসেছিল। কেউ ট্রেনে, কেউ বাসে, কেউ মোটরসাইকেলে; ‘অ্যাশেজ’-এর সুর তাদের ডেকে এনেছিল সেই মাঠে। কনসার্টটির বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতি নজরকাড়া রূপে ধরা দিয়েছে। সেই জনসমুদ্র যেন বুঝিয়ে দিচ্ছে, বাংলাদেশের মানুষ গানেই ফেরে, গানেই ভেড়ে। ‘ইটস ময়মনসিং’ নামের একটি পেজ থেকে কনসার্টের কয়েকটি মুহূর্ত শেয়ার করা হয়েছে। তাতে মানুষের ঢল দেখা গেল। ক্যাপশনে তারা লিখেছে, ‘স্টেজের সামনে থেকে যতদূর চোখ যায়, শুধু মানুষের মাথা আর মাথা। ময়মনসিংহের মানুষের গানের প্রতি ভালোবাসা যে কতটা, সার্কিট হাউজ মাঠের এই দৃশ্য তার প্রমাণ।’ এ কনসার্ট নিয়ে ‘অ্যাশেজ’-এর ভোকালিস্ট, গীতিকার ও সুরকার জুনায়েদ ইভান ঢাকা পোস্টকে বলেন, ‘ময়মনসিংহের শো’টা দারুণ ছিল। অনেক মানুষ এসেছিলেন গান শুনতে। বিশেষ করে দূর-দূরান্ত থেকেও অনেকে এসেছেন। শত শত মানুষ আমাদের গানের লাইন লিখে প্ল্যাকার্ড নিয়ে এসেছিলেন। সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপার, কোনো রকম বিশৃঙ্খলা ছাড়াই কনসার্টটা সম্পন্ন হয়েছিল। সবকিছু মিলিয়ে আমাদের খুব ভালো লেগেছে।’ গানের টানে ছুটে আসা মানুষ আর মানুষ ইভান আরো বলেন, ‘আগেও আমরা অনেকবার ময়মনসিংহে কনসার্ট করেছি। বরাবরই এখানকার মানুষ ভালোবাসা দিয়েছেন। গান-বাজনা ও শিল্প-সংস্কৃতির অঞ্চল হিসেবে এটি পরিচিত। এখানকার মানুষের মধ্যেও গানের প্রতি ভালোবাসাটা স্পষ্ট দেখা যায়। সেজন্য সেখানে গাইতে গেলে আলাদা ভালোলাগা কাজ করে।’ মাস দুয়েক আগেই, আগস্টে কিশোরগঞ্জের পুরাতন স্টেডিয়ামে কনসার্ট করার কথা ছিল ‘অ্যাশেজ’-এর। কিন্তু স্থানীয় আলেম-উলামাদের আপত্তিতে সেটা বাতিল করে দেয় প্রশাসন। ‘অ্যাশেজ’ ছাড়াও গত দুই বছরে এরকম বিপত্তির মুখে আরো অনেক শিল্পী ও ব্যান্ড পড়েছে। বিদেশি শিল্পীদেরও অনেক কনসার্ট বাতিল হয়েছে।


‘অ্যাশেজ’-এর সদস্যরা এসবের ভিড়ে একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বলতে চায়, এ দেশের মানুষ ‘গান বাজনা শুনতে চায় না’। অথচ দফায় দফায় প্রমাণিত হয়, সংগীত এমন এক জাদু, যার শক্তিতে মানুষ আজও ভেদাভেদ ভুলে ভালোবাসতে চায়, একে-অপরের পাশে থাকতে চায়। ‘অ্যাশেজ’-এর গতকালের কনসার্টে সৃষ্ট জনস্রোত যেন সেই অনিন্দ্য আকাঙ্ক্ষারই বহিঃপ্রকাশ।

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]