গভীর রাতে নবদম্পতিকে থানায় নেওয়া, জিডি নিয়ে পুলিশের বক্তব্যে গ'র'মি'ল

আপলোড সময় : ০৯-১০-২০২৬ ১০:০৬:৪৪ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০৯-১০-২০২৬ ১০:২০:৫৯ অপরাহ্ন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি:



ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে আদালতের মাধ্যমে বিয়ে করা এক নবদম্পতিকে গভীর রাতে পুলিশ থানায় নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, বিয়ের প্রায় এক মাস পর গত ২১ জুলাই রাত আনুমানিক ৩টার দিকে তাদের থানায় নেওয়া হয়। পরে তরুণীর মায়ের করা মামলায় তরুণের বিরুদ্ধে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়। তবে নবদম্পতিকে থানায় নেওয়ার আগে কোনো অভিযোগ বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তার বক্তব্যে অসংগতি দেখা দিয়েছে।


ঘটনাটি ঘিরে নবদম্পতিকে থানায় নেওয়ার আইনগত ভিত্তি, জিডি ও মামলা দায়েরের সময় এবং সংশ্লিষ্ট দাপ্তরিক নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। আদালতে বিয়ে, দুই পরিবারের মধ্যে সালিশ স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সরাইল উপজেলার চানমনিপাড়া গ্রামের আজিজুল ইসলামের মেয়ে নুসরাত জাহান ও বিজয়নগর উপজেলার রসুলপুর গ্রামের দুধ মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ শ্রাবন গত ২৮ জুন আদালতের মাধ্যমে বিয়ে করেন। বিয়ের পর বিষয়টি নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে একাধিকবার গ্রাম্য সালিশ হয় বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। তাদের ভাষ্য, সালিশে নুসরাতকে বাবার বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কথা বলা হলেও তিনি স্বামীর সঙ্গে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করেন।


স্থানীয় সূত্রের দাবি, গত ১৪ জুলাই নুসরাতের মা, নানী ও খালা তাঁর শ্বশুরবাড়িতে যান। এর এক সপ্তাহ পর, ২১ জুলাই রাত আনুমানিক ৩টার দিকে বিজয়নগর থানা পুলিশের সহযোগিতায় সরাইল থানার এসআই শামীমের নেতৃত্বে পুলিশ নবদম্পতিকে থানায় নিয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে ওই রাতে ঠিক কী কারণে তাঁদের


থানায় নেওয়া হয়েছিল, সে সময় কোনো লিখিত অভিযোগ বা জিডি ছিল কি না এবং তাঁদের আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। জিডি নিয়ে পুলিশের বক্তব্যে ভিন্নতা ঘটনাটি সম্পর্কে পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তার বক্তব্যে জিডি ও অভিযোগের অস্তিত্ব নিয়ে ভিন্নতা পাওয়া গেছে। সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনজুর কাদের ভূইয়া বলেন, প্রথমে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছিল। তখন কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল না। জিডির ভিত্তিতে নবদম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পরে রাতে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে তিনি জানান। তবে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সরাইল থানার এসআই শামীমের বক্তব্য ভিন্ন। জিডি ও অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “কিসের জিডি, কিসের অভিযোগ—এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না।” এদিকে সরাইল থানার মুন্সি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী শাহাদাৎ ও জিয়া জানান, ২১ জুলাই জিডি বা অভিযোগ রেকর্ড খাতায় লেখা হয়নি। তাঁদের দাবি, সরাসরি মামলা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে বিজয়নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আহসানউল্লাহ বলেন, “সরাইল থানা আমাদের সহযোগিতা চেয়েছিল। আমরা সেই সহযোগিতা করেছি।” পুলিশের কর্মকর্তাদের এসব বক্তব্যের মধ্যে জিডি করা হয়েছিল কি না এবং কখন মামলা রুজু হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে কেবল মৌখিক বক্তব্যের ভিত্তিতে কোনো অনিয়মের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে জিডি রেজিস্টার, এজাহার, মামলা রুজুর সময় এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য নথি যাচাই করা জরুরি। অপহরণ ও ধর্ষণের মামলা নবদম্পতির পরিবারের দাবি, নুসরাত ও শ্রাবন পরস্পরের সম্মতিতে আদালতের মাধ্যমে বিয়ে করেন এবং স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একসঙ্গে বসবাস করছিলেন। অন্যদিকে নুসরাতের মা বাদী হয়ে শ্রাবনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও ধর্ষণের মামলা করেছেন। তবে মামলায় অভিযোগ আনা এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। অভিযোগের সত্যতা তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। এ ক্ষেত্রে বিয়ের নথি, সংশ্লিষ্ট দুজনের বয়স, নুসরাতের বক্তব্য, এজাহারে উত্থাপিত অভিযোগ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। বিয়ের নথি থাকলেও তা মামলার অভিযোগের নিষ্পত্তি নিজে থেকেই করে না; একইভাবে মামলা দায়ের হওয়াও অভিযুক্ত ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণ করে না। আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন কোনো ব্যক্তিকে পুলিশ থানায় নিয়ে গেলে তিনি গ্রেপ্তার ছিলেন, নাকি অন্য কোনো কারণে থানায় নেওয়া হয়েছিল—তা স্পষ্ট করা জরুরি। গ্রেপ্তার করা হয়ে থাকলে তার আইনগত ভিত্তি, গ্রেপ্তারের কারণ, সংশ্লিষ্ট নথি এবং আদালতে হাজির করার সময়ও যাচাই করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রচলিত আইন ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং গ্রেপ্তারসংক্রান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করে। ফলে এ ঘটনায় নবদম্পতিকে থানায় নেওয়ার সময় পুলিশের কাছে কী তথ্য বা অভিযোগ ছিল, তাঁদের কী আইনি প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, তা নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। তদন্তের আশ্বাস পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ঘটনার বিষয়ে সহকারী পুলিশ সুপার (সরাইল সার্কেল) মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “বিষয়টি আমি গুরুত্ব সহকারে দেখবো।” ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মুঃ জালাল উদ্দিন ফাহিম বলেন, “অভিযোগ থাকলে গ্রেফতার করা যাবে, মামলার নাম্বারটি দিন বিষয়টি দেখে জানাচ্ছি।” পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এ ঘটনায় অভিযোগের ভিত্তি, থানায় নেওয়ার প্রক্রিয়া এবং জিডি ও মামলা-সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঘটনাটি পরিষ্কার করতে ২১ জুলাইয়ের কথিত জিডির নম্বর ও কপি, জিডি রেজিস্টার, এজাহার, মামলা রুজুর সঠিক সময়, গ্রেপ্তারসংক্রান্ত নথি এবং আদালতে হাজির করার কাগজপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আদালতের মাধ্যমে সম্পন্ন বিয়ের নথি ও সংশ্লিষ্ট দুজনের বয়সের প্রমাণও পরীক্ষা করা জরুরি।


সব মিলিয়ে, নবদম্পতিকে গভীর রাতে থানায় নেওয়ার ঘটনা এবং পরবর্তী অপহরণ ও ধর্ষণ মামলার অভিযোগ—দুটি বিষয়ই পৃথকভাবে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তার বক্তব্যে যে অসংগতি উঠে এসেছে, তারও দাপ্তরিক নথির ভিত্তিতে ব্যাখ্যা পাওয়া জরুরি।

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]