নিজস্ব প্রতিবেদক
নেপালে ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহ ধসকে বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্যও বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখানো হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দুর্যোগের মাত্রা বাড়ছে। তবে এর ক্ষতি ও তা মোকাবিলার সক্ষমতা দেশভেদে ব্যাপকভাবে ভিন্ন। ধনী দেশগুলো তুলনামূলকভাবে বড় অর্থনৈতিক সক্ষমতা দিয়ে দুর্যোগ মোকাবিলা করতে পারলেও দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলো অনেক বেশি প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
লেখক নেসরিন মালিক এক নিবন্ধে বলেন, জলবায়ু সংকট একই পৃথিবীতে ঘটলেও এর অভিজ্ঞতা যেন দুটি ভিন্ন বিশ্বের। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মতো ধনী অঞ্চলে তাপপ্রবাহ, দাবানল ও অন্যান্য চরম আবহাওয়া ক্রমেই দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে নেপালের মতো দেশগুলোতে একই জলবায়ু পরিবর্তন ভয়াবহ প্রাণহানি, অবকাঠামো ধ্বংস এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক বিপর্যয় তৈরি করছে।
গত ২৬ আগস্ট নেপাল-তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও হিমবাহ ধসের ঘটনা ঘটে। বরফ, পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সর্বশেষ হিসাবে নেপাল ও তিব্বতে মৃতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে এবং প্রায় চার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। বিপর্যয়ে নেপালের গ্রাম, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক ক্ষতিও সবার জন্য সমান নয়। ধনী দেশগুলো দুর্যোগের পর ব্যবসায়ীদের সহায়তা, ঘরবাড়ি পুনর্নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে দ্রুত বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে পারে। কিন্তু নেপালের মতো দেশের ক্ষেত্রে একটি বড় দুর্যোগের পুনর্গঠন ব্যয় জাতীয় অর্থনীতির ওপরই বিরাট চাপ সৃষ্টি করে। সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পুনর্গঠনে নেপালের কয়েক বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হতে পারে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এই বৈষম্য শুধু নেপালের ক্ষেত্রে নয়। ভারতে ভয়াবহ তাপপ্রবাহে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যু ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, বিশেষ করে যাদের পর্যাপ্ত শীতল আশ্রয় বা চিকিৎসা সুবিধা নেই। ক্যারিবীয় অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান শক্তিশালী ঝড়ের পাশাপাশি প্রবালপ্রাচীরের ক্ষতি খাদ্য ও অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করছে। সুদানে জলবায়ুজনিত খরা ও এল নিনোর প্রভাবের সঙ্গে সংঘাত যুক্ত হয়ে খাদ্যসংকট আরও তীব্র করছে। জলবায়ু সংকটের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বৈষম্যের সম্পর্ক রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে শিল্পোন্নত ও ধনী দেশগুলো বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বড় ভূমিকা রাখলেও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতির বড় অংশ বহন করছে অপেক্ষাকৃত দরিদ্র দেশগুলো। ফলে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন এবং ক্ষয়ক্ষতির জন্য সহায়তা দেওয়ার প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক জলবায়ু ন্যায়বিচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু নীতির সাম্প্রতিক পরিবর্তন নিয়েও সমালোচনা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে সরে যাওয়া এবং ইউএসএআইডির মতো আন্তর্জাতিক সহায়তা কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়া জলবায়ু সংকটে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও কঠিন করে তুলেছে। এর ফলে জলবায়ু দুর্যোগ মোকাবিলায় ধনী ও দরিদ্র দেশের মধ্যকার ব্যবধান আরও বাড়তে পারে। জলবায়ু বিপর্যয় কোনো দেশের সীমানায় আটকে থাকবে না। নেপাল বা ক্যারিবীয় অঞ্চলের দুর্যোগ দূরের ঘটনা মনে হলেও এর প্রভাব খাদ্য উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা, অভিবাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর পড়তে পারে। এক দেশের জলবায়ু বিপর্যয় অন্য দেশের খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে এবং বড় ধরনের শরণার্থী প্রবাহও সৃষ্টি করতে পারে।
তাই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন জাতীয় উদ্যোগের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের প্রয়োজন রয়েছে। উন্নত দেশগুলোর দ্রুত নিঃসরণ কমানো, ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে জলবায়ু অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তা দেওয়া এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো এখন জরুরি। নেপালের বিপর্যয় দেখিয়ে দিয়েছে-জলবায়ু সংকটের প্রভাব হয়তো কোথাও বেশি, কোথাও কম; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে কোনো দেশই এর বাইরে থাকতে পারবে না।