৭ আমলে মিলবে রাতভর ইবাদতের সওয়াব

আপলোড সময় : ০২-০৯-২০২৬ ১২:৫৬:৫৯ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০২-০৯-২০২৬ ১২:৫৬:৫৯ অপরাহ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক
গভীর রাতে চারপাশ যখন ঘুমে আচ্ছন্ন, তখন অনেক মানুষ জেগে ওঠেন রবের সান্নিধ্য লাভের আশায়। পৃথিবীর কোলাহল থেকে দূরে, নির্জন রাতে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে তারা আল্লাহর কাছে

এই বিশেষ ইবাদতই তাহাজ্জুদ—মুমিনের জন্য আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নফল আমল।

তাহাজ্জুদের সময় বান্দা যখন আল্লাহর সামনে দাঁড়ায়, তখন তার হৃদয়ে এক অন্যরকম প্রশান্তি নেমে আসে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করো, এটি তোমার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত।

 

আশা করা যায়, তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রশংসিত মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করবেন।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৭৯)

 

শেষ রাত—দোয়া কবুলের বিশেষ সময়

তাহাজ্জুদের সবচেয়ে উত্তম সময় হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। এ সময় আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত লাভের জন্য বান্দার সামনে বিশেষ সুযোগ থাকে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে আমাদের প্রতিপালক পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আমাকে ডাকবে—আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইবে—আমি তাকে দেব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে—আমি তাকে ক্ষমা করব?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৪৫)

তাহাজ্জুদের প্রতি নবীজি (সা.)-এর বিশেষ গুরুত্ব

রাসুলুল্লাহ (সা.) নিয়মিত কিয়ামুল লাইল তথা রাতের নামাজ আদায় করতেন। এমনকি অসুস্থতা বা দুর্বলতার সময়ও তা পরিত্যাগ করতেন না।

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) রাতের নামাজ কখনো ছেড়ে দিতেন না। অসুস্থতা বা দুর্বলতা অনুভব করলে বসে তা আদায় করতেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১৩০৯)
এ থেকে বোঝা যায়, তাহাজ্জুদ ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত।

তবে অনেকেই তাহাজ্জুদ আদায়ের প্রবল আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও ঘুম থেকে উঠতে পারেন না। তাদের জন্যও ইসলামে রয়েছে সুসংবাদ।

কিছু আমল এমন আছে, যেগুলোর ব্যাপারে হাদিসে রাতভর ইবাদত বা তাহাজ্জুদের অনুরূপ সওয়াবের কথা বর্ণিত হয়েছে।

১. জামাতের সঙ্গে এশা ও ফজরের নামাজ আদায় করা

তাহাজ্জুদে উঠতে না পারলেও এশা ও ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করার ব্যাপারে মুমিনের জন্য রয়েছে বড় ফজিলত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এশার নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করল, সে যেন অর্ধরাত নামাজ আদায় করল। আর যে ফজরের নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করল, সে যেন পুরো রাত নামাজ আদায় করল।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৫৬)

অতএব, একজন মুসলিম যদি নিয়মিত এশা ও ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করেন, তবে তিনি রাতের ইবাদতের বিরাট ফজিলত লাভ করতে পারেন।

২. রাতে ১০০ আয়াত কোরআন তিলাওয়াত করা

কোরআন তিলাওয়াত এমন একটি ইবাদত, যার প্রতিটি অক্ষরে রয়েছে সওয়াব। রাতে কোরআন তিলাওয়াতেরও রয়েছে বিশেষ মর্যাদা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রাতে ১০০ আয়াত তিলাওয়াত করবে, তার জন্য পুরো রাত ইবাদত করার সওয়াব লেখা হবে।’ (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস : ১৬৯৫৮)

তাই তাহাজ্জুদের জন্য জাগতে না পারলেও রাতে ঘুমানোর আগে কিংবা ইশার পর ১০০ আয়াত তিলাওয়াত করার অভ্যাস করা যেতে পারে।

৩. তাহাজ্জুদের নিয়ত করে ঘুমিয়ে পড়া

কেউ যদি আন্তরিকভাবে তাহাজ্জুদ আদায়ের নিয়ত করে ঘুমিয়ে পড়েন, কিন্তু প্রবল ঘুমের কারণে জাগতে না পারেন, তবুও তার নিয়ত বৃথা যায় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি রাতে নামাজ পড়ার নিয়ত করে ঘুমিয়ে যায়, কিন্তু ঘুম তাকে পরাস্ত করে এবং সকাল হয়ে যায়, তার জন্য তার নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব লেখা হবে এবং তার ঘুম তার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তার জন্য সদকা।’ (নাসায়ি, হাদিস : ১৭৮৭)

তাই তাহাজ্জুদের জন্য অ্যালার্ম দিয়ে, ওজু করে, আল্লাহর কাছে জাগিয়ে দেওয়ার প্রার্থনা করে ঘুমানো উচিত। জাগতে পারলে তাহাজ্জুদ আদায় হবে; আর জাগতে না পারলেও আন্তরিক নিয়তের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হতে হবে না—ইনশাআল্লাহ।

৪. রমজানে ইমামের সঙ্গে তারাবি শেষ করা

রমজানের রাতগুলো মুমিনের জন্য বিশেষ ইবাদতের মৌসুম। এ সময়ে ইমামের সঙ্গে তারাবির নামাজ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আদায় করার বিশেষ ফজিলত রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ইমামের সঙ্গে নামাজ শেষ করা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকবে, তার জন্য পুরো রাত কিয়াম করার সওয়াব লেখা হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৮০৬)

অতএব, রমজানে তারাবির নামাজকে হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। ইমামের সঙ্গে পূর্ণ তারাবি আদায় করা রাতের দীর্ঘ ইবাদতের সমপরিমাণ সওয়াব লাভের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

৫. বিধবা ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো

ইসলাম শুধু মসজিদের জায়নামাজে ইবাদতের শিক্ষা দেয় না; মানুষের কষ্ট দূর করাকেও অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘বিধবা ও মিসকিনের অভাব পূরণের জন্য যে ব্যক্তি চেষ্টা করে, সে আল্লাহর পথে মুজাহিদের মতো; অথবা সে ওই ব্যক্তির মতো, যে রাতে নামাজ আদায় করে এবং দিনে রোজা রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৩৫৩)

অতএব, অসহায় বিধবা, এতিম, দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়; এটি এমন একটি মহৎ আমল, যার সওয়াব রাতের দীর্ঘ ইবাদতের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

৬. জুমার নামাজের আদব যথাযথভাবে পালন করা

জুমার দিন একজন মুমিনের জন্য বিশেষ মর্যাদার দিন। এদিনের প্রস্তুতি, দ্রুত মসজিদে যাওয়া, খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা—সবই অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন ভালোভাবে গোসল করে, সকাল সকাল মসজিদে যায়, হেঁটে যায়, বাহনে চড়ে নয়, ইমামের কাছে বসে মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে এবং অনর্থক কথা বলে না—তার প্রতিটি পদক্ষেপের বিনিময়ে এক বছর রোজা ও রাতের কিয়ামের সওয়াব রয়েছে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৪৫)

হাদিসটি আমাদের শেখায়, জুমার নামাজ শুধু দুই রাকাত ফরজ আদায়ের নাম নয়। বরং এর প্রস্তুতি, সময়ানুবর্তিতা, মসজিদে যাওয়া এবং খুতবার আদব পালন করাও বিরাট সওয়াবের কাজ।

৭. আল্লাহর পথে সীমান্ত পাহারা দেওয়া

ইসলামের নিরাপত্তা ও মানুষের জানমাল রক্ষায় আল্লাহর পথে পাহারাদারি করারও রয়েছে অসাধারণ মর্যাদা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে এক দিন ও এক রাত সীমান্ত পাহারা দেওয়া এক মাস রোজা রাখা ও রাত জেগে নামাজ পড়ার চেয়েও উত্তম।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯১৩)

এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর পথে মানুষের নিরাপত্তা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করা কত বড় মর্যাদার কাজ।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার—উল্লিখিত আমলগুলো তাহাজ্জুদের ফরজ বা সরাসরি বিকল্প নয়। তাহাজ্জুদ নিজেই একটি স্বতন্ত্র ও মহৎ নফল ইবাদত। বরং বিভিন্ন হাদিসে এসব আমলের জন্য রাতভর কিয়াম বা তাহাজ্জুদের অনুরূপ সওয়াবের সুসংবাদ এসেছে। তাই কেউ যদি তাহাজ্জুদ আদায়ের সুযোগ পান, তাহলে অবশ্যই তা আদায় করবেন। আর কোনো কারণে জাগতে না পারলে হতাশ না হয়ে অন্যান্য ফজিলতপূর্ণ আমলে নিজেকে নিয়োজিত করবেন।

 

 

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : banglaralonewsbd@gmail.com