বিএনপির সামনে নতুন বাংলাদেশের কঠিন পাঠ

আপলোড সময় : ০১-০৯-২০২৬ ১২:৫৪:৩৪ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ০১-০৯-২০২৬ ১২:৫৪:৩৪ অপরাহ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক
আজ পয়লা সেপ্টেম্বর ২০২৬, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৭৮ সালের এই দিন দলটি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে 'বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ' একটি রাজনৈতিক ধারণা হিসেবে সামনে আসে। এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই শুধু অতীতের রাজনৈতিক সংগ্রাম স্মরণের দিন নয়; জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাস্তবতায় জাতীয়তাবাদকে পুনর্ব্যাখ্যা এবং ক্ষমতার ব্যবহারের মূল্যায়নেরও গুরুত্বপূর্ণ সময়।

 

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি পঞ্চম বারের মতো সরকার গঠন করেছে। দল ও মিত্ররা সংসদে দুই- তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়েছে এবং তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। ২০ আগস্ট সংসদে ২৫৫-৮৮ ভোটে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছেন। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাহী ক্ষমতার মূল কেন্দ্ৰ প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা। ফলে রাষ্ট্র পরিচালনার সাফল্য-ব্যর্থতার প্রধান দায় এখন বিএনপি সরকারের ওপরই।

 

বিরোধী দলে থেকে সরকারের সমালোচনা করা আর সরকারে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করা এক বিষয় নয়। ক্ষমতায় থাকা মানে প্রতিটি নীতি, বাজেট, নিয়োগ, আইনশৃঙ্খলা ও জনসেবার ফলাফলের দায় গ্রহণ করা। তাই বিএনপির সামনে এখন মৌলিক প্রশ্ন—বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ কি কেবল রাজনৈতিক পরিচয় ও উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে, নাকি মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা, প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ এবং একটি প্রত্যাশিত ভবিষ্যৎ নির্মাণের বাস্তব রাষ্ট্রদর্শনে পরিণত হবে?

 

এই প্রশ্নের প্রথম পরীক্ষা অর্থনীতিতে। বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৬-এর মূল্যায়নে ২০২৫- ২৬ অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩.৯ শতাংশে নেমে আসার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। মূল্যস্ফীতি রয়েছে ৮.৫ শতাংশের কাছাকাছি। ২০২৫ সালে জাতীয় দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২১.৪ শতাংশে পৌঁছেছে, যেখানে ২০২২ সালে তা ছিল ১৮.৭ শতাংশ। নিম্নআয়ের মানুষের মজুরি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় তাদের ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ বেড়েছে।

 

ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। মার্চ ২০২৬ শেষে খেলাপি ঋণের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ৩২.৬ শতাংশ; দক্ষিণ এশিয়ার ব্যাংকগুলোর গড় ছিল ৭.৯ শতাংশ । ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬.৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে অর্থনীতির সাফল্যের মাপকাঠি বাজেটের অঙ্ক নয়— বাজারদর, আয়, কর্মসংস্থান, সঞ্চয়ের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থা। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, বিনিয়োগের পরিবেশ এবং রাজস্ব ব্যবস্থার উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে ।
বাংলাদেশের বাস্তব অর্থনীতি বুঝতে হলে


অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিকে বাদ দেওয়ার সুযোগ নেই। ২০২৪ সালের শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে যুক্ত, যা মোট কর্মরত জনগোষ্ঠীর প্রায় ৮৪ শতাংশ। হকার, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র দোকানি, কৃষিশ্রমিক, গৃহভিত্তিক শ্রমিক, কারিগর, দিনমজুর ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের শ্রমের ওপর অর্থনীতির বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের শুধু করের আওতায় আনার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না ৷ সহজ ব্যবসা নিবন্ধন, ব্যাংকিং সুবিধা, ডিজিটাল লেনদেন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণ, বিমা, দক্ষতা উন্নয়ন ও বাজারসংযোগের মাধ্যমে তাদের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

 

ছোট-বড় সব ব্যবসার জন্য বাংলাদেশ বিজনেস নম্বর বা বিবিএন চালু করা যেতে পারে। ব্যবসার আয়-ব্যয় বিবিএনের সঙ্গে যুক্ত হলে আয় নিরূপণ ও কর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে জেলা ও উপজেলার অর্থনৈতিক সক্ষমতার পৃথক মানচিত্র তৈরি করা দরকার। কোথাও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, কোথাও মৎস্য ও পশুপালন, কোথাও ক্ষুদ্র শিল্প, পর্যটন, লোককারুশিল্প বা ডিজিটাল সেবা— স্থানীয় " বাস্তবতার ভিত্তিতে পরিকল্পনা করা গেলে ঢাকামুখী কর্মসংস্থানের চাপ
কমানো সম্ভব।

 

বিএনপির ঐতিহাসিক ১৯ দফায় প্রশাসন ও উন্নয়ন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছিল। এখন সেই অঙ্গীকারকে নতুন বাস্তবতায় কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে। ইউনিয়ন, পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে উন্মুক্ত বাজেট, নাগরিক শুনানি, সামাজিক নিরীক্ষা এবং প্রকল্পের অগ্রগতি প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। স্থানীয় সরকারকে শুধু কেন্দ্রীয় বরাদ্দনির্ভর না রেখে নিজস্ব রাজস্ব আহরণ ও উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষমতাও বাড়াতে হবে।

 

সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও বড় বরাদ্দের সঙ্গে বড় জবাবদিহি প্রয়োজন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ খাতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই অর্থের কতটা প্রকৃত দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছায়। সমন্বিত ডেটাবেস, সঠিক উপকারভোগী শনাক্তকরণ, ডিজিটাল অর্থপ্রদান এবং নিয়মিত সামাজিক নিরীক্ষার মাধ্যমে ব্যবস্থাটিকে কার্যকর করতে হবে। শহুরে দরিদ্র, অনানুষ্ঠানিক শ্রমিক, বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার এবং কর্মসংস্থানহীন তরুণদেরও সুরক্ষা কাঠামোর আওতায় আনতে হবে।

 

স্বাস্থ্য খাতেও বরাদ্দের পাশাপাশি বাস্তব সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে মোট ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। জনগণের নিজস্ব পকেট থেকে স্বাস্থ্যব্যয়ের বড় অংশ বহনের বাস্তবতা বিবেচনায় উপজেলা পর্যায়ের প্রাথমিক চিকিৎসা, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, পুষ্টি, মাতৃ ও শিশুসেবা এবং অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে জোর দিতে হবে।

জলবায়ু পরিবর্তন এখন শুধু পরিবেশের বিষয় নয়—এটি অর্থনীতি ও জনজীবনেরও প্রশ্ন। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অতিরিক্ত তাপের কারণে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ কোটি কর্মদিবসের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ সর্বোচ্চ ১.৭৮ বিলিয়ন ডলার। নদী-খাল দখল ও দূষণ বন্ধ, জলাভূমি সংরক্ষণ, নগরে সবুজ এলাকা বৃদ্ধি, বর্জ্য ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং উপকূলীয় অভিযোজনকে স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ করতে হবে।

 

প্রবাসী জনগোষ্ঠীকেও নতুনভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যক্তিগত রেমিট্যান্স প্রবাহ জিডিপির প্রায় ৭.৪ শতাংশের সমান ছিল। কিন্তু প্রবাসীদের অবদান শুধু বৈদেশিক মুদ্রায় সীমাবদ্ধ নয়। বিদেশে থাকা বিজ্ঞানী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, প্রযুক্তিবিদ ও উদ্যোক্তাদের গবেষণা, বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও জ্ঞানবিনিময়ের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে 'ব্রেইন ড্রেইন'কে ধীরে ধীরে 'ব্রেইন গেইন'-এ রূপ দেওয়া সম্ভব। রাষ্ট্র পরিচালনায় নীতির শক্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী, উদ্যোক্তা ও প্রবাসী বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্থায়ী নীতি-গবেষণা কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। বড় নীতি গ্রহণের আগে তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন এবং বাস্তবায়নের পর ফলাফল পর্যালোচনার সংস্কৃতি চালু করা প্রয়োজন।

 

বিএনপির ইতিহাস, ১৯ দফা, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক দর্শন এবং বিভিন্ন সময়ের নীতিপত্র নিয়ে একটি প্রামাণ্য ডিজিটাল জ্ঞানভান্ডারও গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে সেটি যেন কেবল দলীয় প্রচারের মাধ্যম না হয়। দলীয় দলিলের পাশাপাশি ঐতিহাসিক নথি, গবেষণা, সমালোচনা ও ভিন্নমতের তথ্য সংরক্ষণ করা হলে এর বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। নতুন জাতীয়তাবাদী ন্যারেটিভের ভিত্তি হতে পারে সার্বভৌমত্ব, নাগরিক মর্যাদা, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ।

 

আইনশৃঙ্খলায় বিএনপির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। অপরাধী সরকারপন্থি না বিরোধী — তার রাজনৈতিক পরিচয় দেখে বিচার করা হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না। পুলিশকে পেশাদার করা, তদন্ত ও ফরেনসিক সক্ষমতা বাড়ানো, সাইবার অপরাধ মোকাবিলা এবং কমিউনিটি পুলিশিং শক্তিশালী করার পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে নাগরিক পরিচয়কে প্রতিষ্ঠা করাই হতে পারে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সবচেয়ে দৃশ্যমান পরীক্ষা।

 

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন ছোট নয়। কিন্তু প্রবৃদ্ধি, বৈষম্য, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাত, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সুশাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। এই বাস্তবতায় বিএনপির সামনে জাতীয়তাবাদকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে।


জাতীয়তাবাদ যদি মানুষের জীবনে প্রতিফলিত হয় সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ কর্মসংস্থান, শক্তিশালী স্থানীয় সরকার, কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, ন্যায়সংগত অর্থনীতি, মেধার মর্যাদা এবং আইনের সমান প্রয়োগে, তাহলেই তা একটি জীবন্ত রাষ্ট্রদর্শনে পরিণত হবে। ১৯ দফার পুরোনো ধারণাগুলোকে তাই ২০২৬ সালের অর্থনীতি, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও নাগরিক প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন কর্মসূচিতে রূপ দিতে হবে ।

 

শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—ক্ষমতার ব্যবহার কতটা মানুষের পক্ষে প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এবং ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের পক্ষে । সেই পরীক্ষায় বিএনপি সফল হলে জাতীয়তাবাদ কেবল একটি রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হয়ে থাকবে না; এটি হয়ে উঠতে পারে মানুষের মর্যাদা, রাষ্ট্রের সক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণের দর্শন ।


 

 

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : banglaralonewsbd@gmail.com