কর ফাঁ'কি রোধে স্বয়ংক্রিয় ই'ন্টি'গ্রে'টে'ড প্রোফাইল চালু করবে এনবিআর

আপলোড সময় : ২৮-০৮-২০২৬ ১২:৩৭:৫৩ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ২৮-০৮-২০২৬ ১২:৩৭:৫৩ অপরাহ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক
করদাতার ঘোষিত আয়ের সঙ্গে তাদের প্রকৃত আয়-ব্যয় এবং অর্জিত সম্পদের সামঞ্জস্যহীনতা খুঁজে বের করতে এক ডেটাভিত্তিক বা উপাত্তনির্ভর সমন্বিত ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে এনবিআর। নতুন এই ব্যবস্থার অধীনে প্রতিটি করদাতার একটি ‘ইন্টিগ্রেটেড’ বা সমন্বিত প্রোফাইল তৈরি করা হবে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে আয় ও ব্যয়ের গরমিল চিহ্নিত করবে।

 

এই ব্যবস্থার অধীনে, প্রতিটি করদাতার একটি ‘ইন্টিগ্রেটেড’ বা সমন্বিত প্রোফাইল তৈরি করা হবে। এতে করদাতার আয়কর রিটার্নে ঘোষিত আয়ের সঙ্গে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে খরচ, বিদেশ ভ্রমণ, ব্যাংক লেনদেন, গাড়ি ক্রয়, শেয়ারবাজারের বিনিয়োগ এবং অন্যান্য স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির ক্রয়-বিক্রয় বা ব্যবহারের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলিয়ে দেখা হবে।

 

করফাঁকি রোধ এবং রাজস্ব আহরণ বাড়াতে এমন উদ্যোগের কথা জানিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড। সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এ পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে এনবিআরের আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগের কর্মকর্তারা। বৈঠকের কার্যপত্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।

 

অর্থ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান এমপির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, কমিটির সদস্য নূরুল ইসলাম, মীর শাহে আলম, জালাল উদ্দিন, মঈনুল ইসলাম খান, শাহাদাত হোসেন, সাইফুল আলম, সৈয়দ জয়নুল আবেদীন, আবুল হাসনাত উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ বৈঠকে অংশ নেন।

 

বৈঠক সূত্র জানিয়েছে, নতুন এই প্রযুক্তি করদাতার আয়, ব্যয় ও সম্পদের মধ্যে সংগতি রয়েছে কি না—তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মূল্যায়ন করবে। যদি এতে বড় ধরনের কোনো গরমিল পাওয়া যায়, তবে সংশ্লিষ্ট করদাতাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ (হাই-রিস্ক) ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

 

এনবিআর আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে করদাতাদের এই সমন্বিত প্রোফাইল সম্পন্ন করা এবং একটি শক্তিশালী ‘ইনকাম ট্যাক্স ডেটা ওয়্যারহাউস’ স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে। এর পাশাপাশি উচ্চ সম্পদসম্পন্ন ব্যক্তির (হাই নেট ওয়ার্থ ইন্ডিভিজুয়াল) অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে তাদের কর প্রদানের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা যাচাই করতে তাদের পৃথক প্রোফাইল তৈরি করা হবে।

 

জানা গেছে, বাংলাদেশের কর জিডিপি অনুপাত খুবই কম। সেটি বাড়াতে নানামুখী পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয় বৈঠকে। বর্তমানে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬.৮ শতাংশ। সেখান থেকে স্বল্পমেয়াদে আরো ২ শতাংশ পয়েন্ট বাড়ানো, মধ্যমেয়াদে এটি ১০ শতাংশে এবং ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে।

 

এছাড়া বাণিজ্যিক জালিয়াতি, রাজস্ব ফাঁকি এবং বাণিজ্যভিত্তিক অর্থপাচার (ট্রেড মিস-ইনভয়েসিং) রুখতে প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার দেশগুলোতে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতে ‘কাস্টমস অ্যাটাশে’ পদ তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে এনবিআর।

এনবিআর জানিয়েছে, কেবল দেশীয় উপাত্ত দিয়ে এ ধরনের ঝুঁকি শনাক্ত করা সম্ভব নয়। ফলে প্রস্তাবিত কাস্টমস অ্যাটাশেরা আমদানিকৃত পণ্যের উৎস, রপ্তানিকারকের বিস্তারিত পরিচয়, বাণিজ্যিক লেনদেন এবং সংশ্লিষ্ট বিদেশি কোম্পানি সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে ভূমিকা রাখবেন।

 

 

করপোরেট আয়কর ফাঁকি বন্ধ করতে নির্দিষ্ট কিছু আর্থিক সূচক সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনার জন্য একটি সিস্টেমভিত্তিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে থাকবে কোম্পানির টার্নওভার বনাম ঘোষিত মুনাফা, গ্রস প্রফিট রেশিও, রিলেটেড-পার্টি ট্রান্সজেকশনস, সুদের খরচ, ব্যবস্থাপক ফি, রয়্যালটি, কমিশন, অবচয়, মন্দঋণ, রিলেটেড-পার্টি লোন, পরিচালকদের সম্মানী, আমদানিকৃত পণ্যের মূল্যের বিপরীতে স্থানীয় বাজারে বিক্রি, ভ্যাট টার্নওভার বনাম আয়কর টার্নওভার। এছাড়া জেলা ও বিভাগীয় শহরগুলোয় সম্পত্তিভিত্তিক আয়কর কমপ্ল্যায়েন্স প্রোগ্রাম চালু করবে এনবিআর। ফলে বাড়ি, ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক সম্পত্তি থেকে রাজস্ব আহরণ বাড়বে।

 

বকেয়া কর আদায়ে ইনকাম ট্যাক্স ডেট ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে বলে এনবিআর জানিয়েছে। এছাড়া করদাতার সঙ্গে কর্মকর্তার অপ্রয়োজনীয় সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে আনতে, ফেসলেস অ্যাসেসমেন্ট ও ফেসলেস অডিট কার্যক্রম ধাপে ধাপে গ্রহণ করবে এনবিআর। কর কর্মকর্তা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে অ্যাসেসমেন্ট বা পর্যালোচনা সম্পন্ন করবেন।

জানা গেছে, আগামী তিন মাসের মধ্যে এনবিআর তাদের টিআইএন ডেটাবেস পরিচ্ছন্ন ও শ্রেণিবদ্ধ করবে, শীর্ষ বকেয়া আয়কর তালিকা তৈরি এবং উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানি ও উচ্চ-সম্পদশালী ব্যক্তিবর্গকে শনাক্ত করবে।

 

আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে করদাতাদের রিটার্ন দাখিলে উৎসাহিত করতে সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হবে, ‘হাই নেট ওয়ার্থ ইন্ডিভিজুয়াল ইউনিট’ আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর করা হবে এবং কেন্দ্রীয় ঝুঁকিভিত্তিক অডিট ব্যবস্থা পাইলটিং বা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হবে। ৬ থেকে ১২ মাসের মধ্যে করদাতাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সম্পত্তি, যানবাহন ও কোম্পানির তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সংযুক্ত করা হবে এবং স্বয়ংক্রিয় আয়-সম্পদ প্রোফাইলিংয়ের পাইলটিং শুরু করা হবে। পাশাপাশি ইলেকট্রনিক অডিট সিলেকশন ও অটোমেটেড উইথহোল্ডিং লেজার ব্যবস্থাও এই সময়ে প্রস্তুত করা হবে।

 

এক থেকে দুই বছরের মধ্যে প্রি-ফিল্ড (পূর্বেই পূরণকৃত) আয়কর রিটার্ন, দেশব্যাপী ঝুঁকিভিত্তিক অডিট, ফেসলেস অ্যাসেসমেন্ট এবং স্বয়ংক্রিয় কর ফেরত বা রিফান্ড ব্যবস্থা চালু করা হবে। একই সঙ্গে মাঝারি স্তরের করদাতাদের বিভাগ পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক কর নির্ধারণ ব্যবস্থার (ট্রান্সফার প্রাইসিং) সক্ষমতা জোরদার করা হবে।

 

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, এ ধরনের যুগোপযোগী প্রস্তাব ও কথা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হয়ে আসলেও তার কার্যকর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের রাজস্ব সংস্কার কমিটির সুপারিশগুলো এবার বাস্তবে রূপ নিলে রাজস্ব খাতে নিশ্চিতভাবেই একটি ইতিবাচক ও দূরপ্রসারী পরিবর্তন আসবে।


 

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : banglaralonewsbd@gmail.com