নিজস্ব প্রতিবেদক
যশোরের শার্শায় একটি খামারে ২০-২৫ কোটি টাকার মাছ মারা যাওয়ার দাবি নিয়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। খামার কর্তৃপক্ষ বলছেন, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে অক্সিজেনের সংকট হওয়ায় এই বিপুল টাকার মাছ মারা যায়। তবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ওই রাতে অল্প সময় লোডশেডিং হয়েছিল এবং এ কারণে মাছ মারা যেতে পারে না।
এদিকে, মরে যাওয়া মাছের দাম ২৫ কোটি টাকা হতে পারে কি না, তা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। যশোর জেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের তরফে এই দাবিকে ‘অসাড়’ বলা হচ্ছে। সরকারকে বিপাকে ফেলার উদ্দেশ্যে কোনো চক্রান্ত হচ্ছে কি না, তাও খতিয়ে দেখছে প্রশাসন।
ঘটনার আদ্যোপান্ত তদন্ত করতে ইতোমধ্যে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। এছাড়া জেলা মৎস্য বিভাগ ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিও পৃথক তদন্ত কমিটি করেছে।
জেলার শার্শা উপজেলার বাহাদুরপুরে সোনামুখো বিলে আলোচিত মাছের খামারটির অবস্থান। এটি ‘সজনের ঘের’ হিসেবে পরিচিত। ৪৫০ থেকে ৫০০ বিঘা জমি নিয়ে গড়ে তোলা খামারটিতে চলতি মৌসুমে মাছ চাষ করছেন আফজালুল হকসহ তার কয়েক সহকর্মী।
আফজালুল হকের দাবি, গত শনিবার রাত সাড়ে ১১টায় তিনি খবর পান, খামারের মাছ মরে ভেসে উঠতে শুরু করেছে। তার দাবি, বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের কারণে অক্সিজেন স্বল্পতায় পাবদা মাছগুলো মরে ভেসে উঠতে থাকে।
তিনি দাবি করেন, খামারে শুধু পাবদা মাছ ছিল ৬০ লাখ পিস। এছাড়া ৬০ হাজার পিস অন্যান্য মাছ ছিল। সবমিলিয়ে খামারটিতে যে মাছ ছিল, তার বাজারমূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা। এই মাছ মরার পেছনে বিদ্যুৎহীনতাকে দায়ী করেন তিনি।
তবে তিনি স্বীকার করেন, জেনারেটর ছাড়া এত বড় মাছের খামার তৈরি করা তার উচিত হয়নি। পুঁজি স্বল্পতার কারণে জেনারেটর কিনতে পারেননি বলে জানান।
জানা যায়, যে এলাকায় মাছের খামারটির অবস্থান, সেটি যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর অধীন। এখানকার জেনারেল ম্যানেজার স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে বলা হয়, ঘটনার রাতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় রাত ১টা ৪০ মিনিট থেকে ২টা ২০ মিনিট পর্যন্ত লোডশেডিং ছিল। মাত্র ৪০ মিনিটের বিদ্যুৎহীনতার কারণে কোটি কোটি টাকার মাছ মরে যাওয়ার দাবি মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।
পল্লী বিদ্যুতের বিবৃতিতে আরো বলা হয়, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে লোডশেডিং হচ্ছে। কিন্তু বিদ্যুৎহীনতার কারণে কোথাও মাছ মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। এছাড়া ওই খামারে মাছ মরা শুরু হয়েছে রাত সাড়ে ১১টা থেকে। তখন তো বিদ্যুৎ ছিল। ফলে খামারটির মাছ মরার সঙ্গে বিদ্যুৎ থাকা না থাকার কোনো সম্পর্ক নেই। খামারের এক শ্রমিক দাবি করেন, বিদ্যুৎ না থাকায় তাদের ১৮ থেকে ২০ কোটি টাকার মাছ মারা গেছে।
খামার মালিকের ভাতিজা পরিচয় দেওয়া যুবক দাবি করেন, তিনি খামারটি দেখাশোনা করেন। তার হিসাবে, ১৫ থেকে ১৬ কোটি টাকার মাছ মারা গেছে। এই মাছ বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
এ বিষয়ে যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) দেবাশীষ ভট্টাচার্য বলেন, বিদ্যুৎ না থাকায় মাছ মরে যাওয়ার দাবি কোনোমতেই ঠিক না। যদি তা-ই হতো, তাহলে ওই এলাকায় আরো ১২টি বড় খামার আছে। সেখানেও মাছ মারা যেত।
১৫ থেকে ২৫ কোটি টাকার মাছ মারা যাওয়ার যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে, তাও অতিরঞ্জিত বলে বর্ণনা করেন এই কর্মকর্তা। আমি যতটা জানতে পেরেছি, ১০-১৫ লাখ টাকার মাছ মারা গেছে।
বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।
এদিকে, মৎস্য বিভাগের পক্ষ থেকেও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনিরুল মামুন। তদন্ত কমিটির রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত কোনো মন্তব্য করা যাবে না জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, তবে মাছের ঘনত্ব বেশি হলে অনেক সময় এমন ঘটনা ঘটতে পারে।
এদিকে, যশোর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আশেক হাসান বলছেন, ক্ষতিগ্রস্ত খামারি ও কর্মচারীরা ঘটনার ব্যাপারে যে বক্তব্য দিচ্ছেন, তা অসংগতিপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসনের তরফে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
তিনি জানান, তদন্তে স্বচ্ছতার স্বার্থে এই কমিটিতে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কাউকে রাখা হয়নি। শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে কমিটিতে কাজ করবেন সংশ্লিষ্ট এলাকার দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের একজন প্রতিনিধি, একজন মৎস্য কর্মকর্তা এবং শার্শা উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তা। এই কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে রিপোর্ট দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক জানান, বিষয়টি নিয়ে কেউ সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করছেন কি না তদন্ত কমিটি তা-ও খতিয়ে দেখবে।