নিজস্ব প্রতিবেদক
গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কঙ্গোতে (ডিআরসি) ইবোলা ভাইরাসের সংক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। দেশটির সর্বশেষ সরকারি হিসাবে, এখন পর্যন্ত ৫ হাজার ৫১৫ জনের শরীরে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে মারা গেছেন ২ হাজার ৬৪২ জন।
রোববার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইতুরি ও নর্থ কিভু প্রদেশে নতুন করে ৫১ জনের শরীরে ইবোলা শনাক্ত হয়েছে।
ডিআরসিতে এবারই সবচেয়ে প্রাণঘাতী ইবোলা প্রাদুর্ভাব হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত মে মাসের মাঝামাঝি দেশটিতে বর্তমান প্রাদুর্ভাবের ঘোষণা দেওয়া হয়। এটি ডিআরসির ইতিহাসে ১৭তম ইবোলা প্রাদুর্ভাব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) পরিস্থিতিকে আন্তর্জাতিক উদ্বেগজনক জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা হিসেবে ঘোষণা করেছে। প্রতিবেশী উগান্ডাকেও এই সতর্কতার আওতায় রাখা হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতির অবনতি অব্যাহত থাকলে এই প্রাদুর্ভাব ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পশ্চিম আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়া ইবোলা মহামারির পরিসর ছাড়িয়ে যেতে পারে। ওই মহামারিতে ১১ হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলেন।
বাড়ছে মৃত্যুহার
ডিআরসির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুনের শুরুতে ইবোলায় মৃত্যুহার ছিল প্রায় ২০ শতাংশ। পরে তা বেড়ে প্রায় ৪৮ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ সংক্রমিত প্রতি দুজনের মধ্যে প্রায় একজন মারা যাচ্ছেন।
জুনে মৃত্যুহার ছিল ৩০ শতাংশ। বর্তমানে তা ৮৫ শতাংশের বেশি হয়েছে বলে সরকারি তথ্যের বরাতে জানানো হয়েছে।
ইবোলা মোকাবিলায় কাজ করা স্বাস্থ্যকর্মীরাও বড় ঝুঁকিতে রয়েছেন। ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ১৬০ জন স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে মারা গেছেন প্রায় ৪৫ জন।
সংঘাতেও বাধাগ্রস্ত চিকিৎসা
ইবোলা নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে চলমান সশস্ত্র সংঘাত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের বাস্তুচ্যুতি। চিকিৎসাকর্মী ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।
কর্মসংস্থানের কারণে মানুষের এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় চলাচল এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতিও রোগটির বিস্তার ঠেকানোর কাজে বাধা তৈরি করছে।
নেই অনুমোদিত টিকা
বর্তমান প্রাদুর্ভাবে ইবোলার ‘বুন্দিবুগিও’ ধরন ছড়িয়েছে। এটি তুলনামূলকভাবে বিরল। এই ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনো অনুমোদিত কোনো টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই।
তবে ডব্লিউএইচও ডিআরসিকে ৭০ হাজার ডোজ ‘এরভেবো’ টিকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইবোলার জন্য এই টিকা অনুমোদিত। অতীতের বিভিন্ন প্রাদুর্ভাবেও এটি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসসহ সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে ডিআরসিতে বর্তমান প্রচেষ্টা দুই থেকে তিন গুণ বাড়াতে হবে।
আক্রান্ত প্রতিটি এলাকায় দ্রুত চিকিৎসাসেবা পৌঁছানোর ওপর জোর দিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সময়মতো বেতন নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে। দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং মানসম্মত চিকিৎসার ব্যবস্থাও জোরদার করতে বলা হয়েছে।
আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন প্রতিষ্ঠায় সহায়তাকারী জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবদুসসালামি নাসিদি বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
তার মতে, এটি এখন আর শুধু জাতীয় বা আঞ্চলিক সমস্যা নয়। এটি বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে।
এদিকে রোববার ভ্যাটিকানে প্রার্থনার সময় ডিআরসিতে ইবোলার সংক্রমণ নিয়ে কথা বলেছেন পোপ লিও। তিনি প্রতিরোধ কার্যক্রমে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সাড়া দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তার মতে, এর মাধ্যমে যত বেশি সম্ভব মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে।