নিজস্ব প্রতিবেদক
নরসিংদীর মনোহরদীতে ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগে একটি বেসরকারি হাসপাতালে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে। শুক্রবার রাতে পৌর শহরের বাইপাস সড়কে মনোহরদী ল্যাবএইড আই অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে এ ঘটনা ঘটে। পরে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে হাসপাতালটি সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করেন।
মারা যাওয়া ওই রোগীর নাম আকলিমা বেগম (৩২)। তিনি মনোহরদী উপজেলার বড়চাপা ইউনিয়ন বীর মাইজদিয়া এলাকার কবির হোসেনের স্ত্রী।
শনিবার (২২ আগস্ট) দুপুরে নরসিংদী জেলা সিভিল সার্জন ডা. বুলবুল কবির, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, রাশেদুল হাসান মাহমুদ, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সজিব মিয়াসহ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল হাসপাতাল পরিদর্শন করেছেন।
রোগীর স্বজন ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ আগস্ট পিত্তথলির অস্ত্রোপচার করার জন্য মনোহরদী ল্যাবএইড আই অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হন আকলিমা বেগম। পরদিন শুক্রবার সকাল ১১টায় হাসপাতালের চিকিৎসক রাহাত বিন কাশেম তার অস্ত্রোপচার করেন। পরবর্তীতে রোগীর অবস্থা অবনতি ঘটতে থাকলে ১৯ আগস্ট বিকেলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। প্রথমে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ওই দিনই পপুলার প্রাইভেট হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি করানো হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২১ আগস্ট রাত ২টায় মারা যান।
এদিকে মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে রোগীর স্বজনরা মনোহরদীর ল্যাবএইড আই অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে যান। ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ এনে তারা এবং কিছু বিক্ষুব্ধ লোকজন হাসপাতালের নিচতলাসহ তিনটি ফ্লোরে ব্যাপক ভাঙচুর চালান। তারা চিকিৎসকের বিচার দাবি করে হাসপাতাল বন্ধের দাবি জানান। পরে উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহাঙ্গীর বাদশা পুলিশ সদস্য নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং হাসপাতালটি সাময়িক বন্ধ রাখার নির্দেশনা দেন।
মৃত আকলিমা বেগমের ভাই নাসির উদ্দিন বলেন, পিত্ত থলির টিউমার নিয়ে আমার বোন হাসপাতালে ভর্তি হয়। ডাক্তার রাহাত বিন কাশেম তার অপারেশন করেন। অপারেশন করার পরদিন তার অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। ৬ দিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেখানে রেখে চিকিৎসা দেন। পরে বুধবার (১৯ আগস্ট) স্বজনদের দিয়ে রোগীকে ঢাকার কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে রেফার্ড করেন। তখনই আমাদের সন্দেহ হয়। এটা কোনোভাবেই আমরা মানতে পারছি না। এখানে নিশ্চিত অবহেলা আর ভুল চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই।
তবে হাসপাতাল ভাঙচুরের সঙ্গে রোগীর স্বজনদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমরা ঢাকায় রোগীর চিকিৎসা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। হাসপাতালে কে বা কারা ভাঙচুর করেছে, সে বিষয়ে আমাদের জানা নেই।
হাসপাতালের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুল ইসলাম বলেন, আমাদের হাসপাতালে যিনি অপারেশন করেছেন তিনি অভিজ্ঞ সার্জারী চিকিৎসক। অপারেশন ঠিকমতোই হয়েছে। পরে তার আইসিইউ দরকার হওয়ায় ঢাকায় পাঠানো হয়। শুক্রবার সন্ধায় রোগী মারা যাওয়ার খবরে তার স্বজনেরা হাসপাতালের চিকিৎসকের চেম্বার, রিসেপশন, ল্যাবসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশে ভাঙচুর করে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করে।
মনোহরদী থানার ওসি জাহাঙ্গীর বাদশা বলেন, হাসপাতাল ভাঙচুরের ঘটনার সংবাদ পেয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। রোগীর মৃত্যু ও হাসপাতাল ভাঙচুরের ঘটনায় এখনো পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মনোহরদী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. সজিব মিয়া বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে রাতেই হাসপাতালটি সাময়িকভাবে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীদের অন্য হাসপাতালে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
নরসিংদী জেলা সিভিল সার্জন ডা. বুলবুল কবির বলেন, রোগীর মৃত্যু ও হাসপাতাল ভাঙচুরের ঘটনায় আজ শনিবার দুপুরে ওই হাসপাতাল পরিদর্শন করেছি। এ ঘটনায় জেলা হাসপাতালের সার্জারি বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হাসিবকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদেরকে পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।