বর্তমান সময়ে অপতথ্য ও বিকৃত তথ্য মোকাবিলাকে সাংবাদিকতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেছেন গিয়ে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি মনে করেন, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা, পেশাগত নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীলতার সমন্বয় জরুরি।
রোববার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ৬৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক মুজাফফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে ‘রাজনীতি, ক্ষমতা ও সাংবাদিকতার আন্তঃসংশ্লেষ: তত্ত্ব, বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সেমিনার প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম এবং মুখ্য আলোচক হিসেবে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও দৈনিক নিউ এজের সম্পাদক নূরুল কবীর বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, একসময় তথ্যের সংকট সাংবাদিকতার জন্য বড় সমস্যা ছিল। এখন তথ্যের অতিপ্রবাহই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পরিকল্পিত অপতথ্য ও বিকৃত তথ্যের বিস্তার, যা মানুষের মনোজগত ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশে জাতীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পরিকল্পিতভাবে অপতথ্য ছড়ানোর ঘটনা দেখা গেছে। মানুষের ধারণা ও মনোজগতকে প্রভাবিত করার জন্য ‘পারসেপশন ম্যানেজমেন্টের’ যে লড়াই চলছে, তা আধুনিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার নতুন একটি উপাদান হয়ে উঠেছে।
মন্ত্রী বলেন, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা অবশ্যই একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। তবে বর্তমানে অনেক বেশি জায়গা দখল করে নিয়েছে অপতথ্য ও বিকৃত তথ্যের চ্যালেঞ্জ। এটি মোকাবিলায় আধুনিক জ্ঞান, শিক্ষা, কৌশল, পদ্ধতি ও প্রযুক্তির সম্মিলিত ব্যবহার প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘অপতথ্য মোকাবিলায় সরকার কাজ করছে। তবে এখনই বলা সম্ভব নয় যে সমস্যাটির সমাধান হয়ে গেছে।
সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তার বিষয়টিও তুলে ধরেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী। তিনি বলেন, গণমাধ্যমে কর্মরত সাধারণ সাংবাদিকদের অনেকেই নানা ধরনের পেশাগত অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন। গণমাধ্যমে প্রবেশের ক্ষেত্রে নীতিগত দুর্বলতার কারণে এ খাতে এক ধরনের অনিয়ম ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, সাংবাদিকতা পেশাকে অর্থনৈতিকভাবে মর্যাদাশীল ও পেশাগতভাবে নিরাপদ করতে হবে। এজন্য ওয়েজ বোর্ডের কাঠামোসহ সাংবাদিকদের পেশাগত মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে
মন্ত্রী বলেন, এমন অভিযোগও পাওয়া যায় যে কেউ কোনো গণমাধ্যমের পরিচয় বহন করলেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে বেতন পান না। বরং পরিচয়পত্র বহাল রাখার জন্য তাকে নানা ধরনের অনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গণমাধ্যমের মালিকপক্ষ, সরকার এবং সাংবাদিক সমাজ- এই তিন পক্ষের মধ্যে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, সাংবাদিকতা পেশার উন্নয়নে মালিকপক্ষ, সম্পাদক ও সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে সরকারের উদ্যোগে সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে।
সাংবাদিকতার স্বাধীনতার মাত্রা নির্ধারণের বিষয়টিকে জটিল বলে উল্লেখ করে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতা চর্চার ক্ষেত্রে প্রত্যেক ব্যক্তির নিজস্ব আদর্শ, দর্শন ও রাজনৈতিক-দার্শনিক অবস্থান কাজ করে। ফলে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক পুরোপুরি মীমাংসা করা কঠিন। তবে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও দায়িত্বের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। এ কাজ সরকার এককভাবে করতে চায় না বলেও জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, সাংবাদিক নেতৃবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে নিয়ে এ বিষয়ে কাজ করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্যেই ভবিষ্যতে গণমাধ্যম কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যম কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে ‘ক্ষমতা, স্বাধীনতা ও দায়িত্ব’ এই তিনটি বিষয়কে সমন্বয় করে এগোতে চায় সরকার। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা পর্ব শেষ হয়েছে এবং এ বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন বলেও জানান তিনি। বিশেষ অতিথির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান।