রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা ও মনস্তত্ত্ব

আপলোড সময় : ১৭-০৫-২০২৬ ১০:৩০:৪৩ পূর্বাহ্ন , আপডেট সময় : ১৭-০৫-২০২৬ ১০:৩০:৪৩ পূর্বাহ্ন
নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
বর্তমান যুগে রাজনীতি কেবল ক্ষমতা দখল বা রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিযোগিতা নয়; এটি ভাষা, প্রতীক, আবেগ, মনস্তত্ত্ব এবং কৌশলগত যোগাযোগের এক বহুমাত্রিক ক্ষেত্র। দৃশ্যমান বক্তব্যের আড়ালে প্রায়ই কাজ করে অদৃশ্য বয়ান-নির্মাণের প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য থাকে গণমানুষের চিন্তা, অনুভূতি, বিশ্বাস ও রাজনৈতিক অবস্থান প্রভাবিত করা। রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাই ভাষা কখনো নিছক যোগাযোগের মাধ্যম নয়; বরং তা হয়ে ওঠে প্রভাববিস্তার, বৈধতা নির্মাণ, প্রতিপক্ষকে অবমাননা এবং জনমত নিয়ন্ত্রণের একটি সূক্ষ্ম অস্ত্র।

 
এই জটিল বাস্তবতাকে বোঝার জন্য ‘উপ্ত-সুপ্ত-গুপ্ত-লুপ্ত’ ধারণাটি তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষণী কাঠামো হিসেবে সামনে আনা যেতে পারে, যা রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা, তার মনস্তত্ত্ব এবং এর অন্তর্নিহিত অনৈতিক কৌশলকে উন্মোচন ও ব্যাখ্যা করতে সহায়তা করে। এ শব্দবন্ধটিকে কেবল ভাষার একটি আলংকারিক রূপক হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বরং এটি রাজনৈতিক যোগাযোগ (পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন), প্রোপাগান্ডা স্টাডিজ, মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবতত্ত্ব এবং সমালোচনামূলক বচন-বিশ্লেষণের (ক্রিটিক্যাল ডিসকোর্স অ্যানালাইসিস) আলোকে বিশ্লেষণযোগ্য একটি কাঠামো, যেখানে ভাষা কেবল বাস্তবতাকে বর্ণনা করে না, বরং বাস্তবতাকে নির্মাণও করে। ব্রিটিশ ভাষাতাত্ত্বিক নরম্যান ফেয়ারক্লাফ (১৯৪১-) দেখিয়েছেন, ক্ষমতা ও ভাষার সম্পর্ক কখনো নির্দোষ নয়; রাজনৈতিক ভাষা প্রায়ই এমনভাবে নির্মিত হয়, যাতে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে বৈধ এবং অন্য গোষ্ঠীকে অগ্রহণযোগ্য বা ‘অপর’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়। ফলে রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষায় ধীরে ধীরে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের জায়গা দখল করে আবেগ, ভয়, সন্দেহ ও ঘৃণার রাজনীতি ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়াস।


এই প্রেক্ষাপটে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর (১৯২৬-১৯৮৪) ‘ক্ষমতা ও জ্ঞান’ (পাওয়ার অ্যান্ড নলেজ) ধারণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন, জ্ঞান ও সত্য কখনো সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নয়; বরং ক্ষমতার বিন্যাসের মধ্য দিয়েই ‘সত্য’ গঠিত, প্রচারিত এবং পুনর্গঠিত হয়। অর্থাৎ যে গোষ্ঠী ক্ষমতার কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণ করে, তারা অনেক সময় ভাষা ও বয়ানের মাধ্যমেই ঠিক করে দেয় কোনটি গ্রহণযোগ্য সত্য এবং কোনটি অগ্রহণযোগ্য। একইভাবে ইতালীয় মার্কসবাদী চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামশির (১৮৯১-১৯৩৭) ‘সাংস্কৃতিক আধিপত্য’ (কালচারাল হেজিমনি) তত্ত্ব দেখায়, শাসকগোষ্ঠী কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং সম্মতি উৎপাদনের মাধ্যমেও নিজেদের আধিপত্য টিকিয়ে রাখে। গণমাধ্যম, রাজনৈতিক ভাষণ, সামাজিক প্রচারণা কিংবা সাংস্কৃতিক বয়ানের মাধ্যমে এমন এক মানসিক পরিবেশ তৈরি করা হয়, যেখানে সাধারণ মানুষ নিজেদের অজান্তেই অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘অপরিহার্য’ বলে মেনে নিতে শুরু করে। রাজনৈতিক আক্রমণের ভাষা তাই কেবল প্রতিপক্ষকে সমালোচনা করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ধীরে ধীরে প্রতিপক্ষকে ‘অপরায়ণ’ (আদারিং) প্রক্রিয়ায় কোণঠাসা করে ফেলে। এই অপরায়ণের লক্ষ্য হয় রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে যুক্তির ময়দান থেকে সরিয়ে নৈতিক, সামাজিক কিংবা মানসিকভাবে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু ইতিহাসের এক নির্মম শিক্ষা হলো, ঘৃণা, অপবাদ, গুজব কিংবা মনস্তাত্ত্বিক আক্রমণের ওপর দাঁড়িয়ে নির্মিত রাজনৈতিক বয়ান সাময়িকভাবে উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে তা টেকসই সামাজিক আস্থা গড়ে তুলতে পারে না। কারণ মানুষের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতা শেষ পর্যন্ত কৃত্রিম প্রচারণার সীমাবদ্ধতাকে উন্মোচিত করেই ফেলে।

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স ৬ষ্ট তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : banglaralonewsbd@gmail.com