মাহফুজ রাজা,স্টাফ রিপোর্টার:
কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলায় একসময় বিকেলের মাঠ মানেই ছিল আনন্দ-উল্লাসের মিলনমেলা। গোল্লাছুট, বৌছি, কানামাছি, সাতচারা, দাড়িয়াবান্ধা, কুঁতকুঁত, ইচিং বিচিং কিংবা লাঠিখেলার মতো প্রাণবন্ত খেলাগুলোতে মুখর থাকত গ্রামবাংলার প্রতিটি কোণা। শিশুর হাসি, দৌড়ঝাঁপ আর বন্ধুত্বের টানেই তৈরি হতো এক অন্যরকম শৈশব। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই দৃশ্য এখন যেন কেবল গল্প আর স্মৃতির পাতায় আটকে গেছে।
বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর যুগে স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহার, খেলার মাঠের সংকট এবং সামাজিক পরিবর্তনের কারণে ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ খেলাগুলো বিলুপ্তির পথে। এমনকি আমাদের জাতীয় খেলাগুলোর অন্যতম হাডুডু বা কাবাডিও এখন অস্তিত্ব সংকটে।
লেখক ও কলামিস্ট এস এম মিজানুর রহমান মামুন এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন,
“একটা জাতির শিকড় থাকে তার সংস্কৃতিতে, আর সেই সংস্কৃতির বড় অংশ জুড়ে থাকে গ্রামীণ খেলাধুলা। আজকের শিশুরা যখন মাঠ ছেড়ে মোবাইলের পর্দায় ডুবে যাচ্ছে, তখন তারা শুধু খেলাই হারাচ্ছে না,হারাচ্ছে শৈশব, হারাচ্ছে সামাজিকতা, হারাচ্ছে সুস্থ মানসিক বিকাশের সুযোগ। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শারীরিকভাবে দুর্বল ও মানসিকভাবে একাকী হয়ে পড়বে। এখনই সময় সম্মিলিতভাবে এই সংকট মোকাবিলা করার।
অন্যদিকে উপজেলা যুবদলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আমিনুল হক মাখন মৃধা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
খেলার মাঠ দখল হয়ে যাচ্ছে, নতুন প্রজন্মের জন্য কোনো নিরাপদ খেলার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে না,এটা খুবই দুঃখজনক। শুধু স্মার্টফোনকে দোষ দিলে হবে না, আমাদের দায়িত্বশীলদেরও জবাবদিহিতা নিতে হবে। তরুণদের মাঠে ফেরাতে হলে আগে মাঠ ফিরিয়ে দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে, নইলে আমরা একসময় এমন প্রজন্ম পাবো, যারা মাঠ চিনবেই না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাধুলা শুধু শরীরচর্চা নয়,এটি মানুষের মনন গঠন, নেতৃত্বগুণ তৈরি এবং দলগত চেতনা বিকাশের অন্যতম মাধ্যম। কিন্তু বর্তমান প্রজন্মের মধ্যে খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ায় দেশের ক্রীড়াক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
এ অবস্থায় স্থানীয় পর্যায়ে খেলার মাঠ সংরক্ষণ, নতুন মাঠ তৈরি, স্কুল-কলেজে খেলাধুলার বাধ্যতামূলক কার্যক্রম চালু এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়ানো অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খেলাগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া সংগঠনগুলোর এগিয়ে আসাও সময়ের দাবি।
শুধু উন্নত প্রযুক্তি নয়, প্রয়োজন একটি সুস্থ, সচল ও প্রাণবন্ত প্রজন্ম। আর সেই প্রজন্ম গড়ে তুলতে হলে ফিরিয়ে আনতে হবে হারিয়ে যাওয়া সেই মাঠ, সেই খেলাধুলা, সেই শৈশবের নির্মল হাসি।