রাহাদ সুমন,বরিশাল:
ভোলার সঙ্গে বরিশালের দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যম স্পিডবোট। পেট্রোল সংকটে এই নৌযানের যাতায়াত এখন বন্ধের পথে। অর্ধেকেরও বেশি স্পিডবোট জ্বালানি সংকটে বন্ধ হয় পড়ে আছে। ফলে ঘাটে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার করতে হচ্ছে যাত্রীদের।
এদিকে স্পিডবোটের মালিক ও শ্রমিকরা জানান, পেট্রোল সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে অনেকের আয়-রোজগার। এতে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন তারা। পরিবার-পরিজন নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাদের।
জানা যায়, ভোলা-বরিশাল রুটে লঞ্চের প্রায় আড়াই ঘণ্টার নৌপথে ২০০৪ সালে ভোলার ভেদুরিয়া লঞ্চঘাট এলাকা থেকে ভোলা-বরিশাল স্পিডবোট সার্ভিস চালু হয়। এতে সময় লাগে মাত্র ৪০ মিনিট। ভোলা-বরিশাল রুটে প্রতিদিন প্রায় শতাধিক স্পিডবোট যাতায়াত করে। সময় কম লাগায় ভোলার রোগী ও সাধারণ যাত্রীদের কাছে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে স্পিডবোট সার্ভিসটি। ভোলার ভেদুরিয়া ঘাটে ১০৫টি স্পিডবোট থাকলেও পেট্রোল সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে গেছে অর্ধেকেরও বেশি বোট। তাই বর্তমানে আগের মতো সহজে যাতায়াত করতে পারছেন না যাত্রীরা। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।
রোগীর স্বজন মো. সিরাজুল ইসলাম ও মো. ইব্রাহীম জানান, ভোলা ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল থেকে রোগীকে বরিশাল শেরে বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেছে। তাই রোগী নিয়ে বরিশালে উদ্দেশ্যে ভেদুরিয়া ঘাটে এসেছি। লঞ্চে করে গেছে প্রায় আড়াই ঘণ্টা লাগবে। জরুরি ভিত্তিতে বরিশাল নিতে হবে এজন্য স্পিডবোটের অপেক্ষা করছি রোগী নিয়ে। কিন্তু বোট পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, বোট মালিক ও চালকরা বলছেন পেট্রোল সংকটের কারণে অনেক বোট বন্ধ হয়ে যাওয়ার বোটের সংকট রয়েছে। ভেদুরিয়া ঘাটে এসে ৩০ মিনিট পর অবশেষে বোট পেয়েছি। এখন রোগী নিয়ে বরিশাল যাচ্ছি, কী হবে জানি না।
যাত্রী মো. শহীদুল ইসলাম ও আনোয়ার হোসেন জানান, তারা চাকরিজীবী। ভোলায় চাকরি করেন একটি কোম্পানিতে। সকাল ৯টার দিকে বরিশালে জরুরি মিটিংয়ে অংশ নিতে হবে, তাই সকালে রওয়ানা হয়েছেন। ভেদুরিয়া ঘাটে লঞ্চ থাকলেও স্পিডবোট নেই। এতে ঘাটে এসে চরমভাবে ভোগান্তিতে পড়েছেন। লঞ্চে গেলে আড়াই ঘণ্টা সময় লাগবে, এতে মিটিংয়ে অংশ নেওয়া হবে না।
তারা আরও জানান, আমরা সব সময়ই স্পিডবোটে করে বরিশাল যাই, কিন্তু পেট্রোল সংকটের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছি। প্রায় ৪৫ মিনিট অপেক্ষা করেও এখনও বোট মেলেনি। সবাই বলে তেল পেলে যাবে।
ফিরোজ হাওলাদার ও নূরউদ্দিন মিয়া নামে দুই যাত্রী জানান, ভেদুরিয়া ঘাটে আগে ৫ থেকে ১০ মিনিট পর পর স্পিডবোট বরিশাল ও লাহারহাট ঘাটে যেত। কিন্তু এখন ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা পরপর যায়। এতে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে কষ্ট হচ্ছে। দ্রুত পেট্রোল সংকটের সমাধান দাবি করেন তারা।
স্পিডবোট চালক মো. মোকতার হোসেন জানান, তিনি এক মালিকের স্পিডবোট চালিয়ে দৈনিক ৫০০-৬০০ টাকা বেতন পেতেন। কিন্তু বর্তমানে পেট্রোল সংকটের কারণে ওই মালিকের বোট বন্ধ হয়ে গেছে। তাই ৪-৫ দিন ধরে আয় রোজগার নেই। সংসার চালাতেও পারছেন না। প্রতিদিন বোট ঘাটে এসে অপেক্ষা করছেন, তেল পেলে আবারও বোট নিয়ে বের হতে পারবেন।
স্পিডবোট মালিক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ভেদুরিয়া ঘাটে আমার বোট চলে প্রায় ২০ বছর ধরে। এমন তেল সংকটে কখনও পড়িনি। পেট্রোল সংকটের কারণে আমার বোট প্রায় সাতদিন ধরে ঘাটে বেঁধে রেখেছি। কোনো আয়-রোজগার নেই। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বোটের কাজ করি। এখন কিস্তি কীভাবে চালাবো জানি না।
ভেদুরিয়া ঘাটের স্পিডবোট মালিক সমিতির সভাপতি মো. শেখ ফরিদ জানান, প্রায় ২০-২৫ দিন ধরে পেট্রোল সংকটের পড়েছে স্পিডবোট। গত সাতদিন সংকট আরও বেশি সৃষ্টি হয়েছে। ভেদুরিয়া ঘাট থেকে প্রতিদিন শতাধিক বোট যাতায়াত করলেও বর্তমানে তা করতে পারছে না। পেট্রোল না পেয়ে আমাদের ঘাটের প্রায় অর্ধেকের মতো বোট বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক মালিক ও শ্রমিক আয় বন্ধ হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। আমরা সরকারি প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি, দ্রুত পেট্রোল সংকট দূর করার জন্য।
তিনি আরও জানান, ভোলা-বরিশাল রুটে ভোলার ভেদুরিয়া ঘাট থেকে বরিশালের লাহার হাট ঘাট ও বরিশাল ঘাট এই দুই রুটে প্রতিদিন রোগী, রোগীর স্বজনসহ প্রায় এক হাজার যাত্রী পারাপার হয়। দ্রুত সমস্যা সমাধান না হলে পেট্রোল সংকটে এই যাতায়াত পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে ভোলার জেলা প্রশাসক ডা.
শামীম রহমান গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।
তার দাবি, এ বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই ও স্পিডবোটের পক্ষে পেট্রোল সংকটের বিষয়ে কেউ জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেনি।