রাহাদ সুমন,বিশেষ প্রতিনিধি:
ভোলার ইলিশা ফেরিঘাটে দিনের পর দিন আটকে আছে তরমুজবাহী শতাধিক ট্রাক। ফেরি–সংকটে সময়মতো পার হতে না পারায় ট্রাকে থাকা তরমুজ পচে নষ্ট হচ্ছে। ফলে লোকসানের মুখে পড়ছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।
রোববার সরেজমিন দেখা যায়, ইলিশা লঞ্চঘাট এলাকাজুড়ে পচা তরমুজের দুর্গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছে বাতাস। ভোলা-বরিশাল-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ভোলা অংশে ইলিশা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ফেরিঘাট পর্যন্ত দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষায় আছে ট্রাক। এর প্রায় ৯৯ শতাংশেই তরমুজবোঝাই।
ট্রাকচালকেরা জানান, ঘাটে একদিন আটকে থাকলেই তরমুজের ব্যাপক ক্ষতি হয়। পাশাপাশি চালক ও সহকারীদের দৈনিক এক থেকে দেড় হাজার টাকা খরচ গুনতে হচ্ছে। লালমোহন থেকে আসা চালক মো. শাহাবুদ্দিন বলেন, শুক্রবার রাতে তরমুজ নিয়ে এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন; কিন্তু এখনো ফেরিতে ওঠার সুযোগ পাননি।
বোরহানউদ্দিনের চালক নীরব হাওলাদার অভিযোগ করেন, ইলিশা ঘাটে কোনো নির্দিষ্ট ট্রাক টার্মিনাল, বিশ্রামাগার বা শৌচাগার নেই। সড়কের ওপর গাড়ি রেখে থাকতে হয়, স্থানীয় লোকজনের গালাগাল সহ্য করতে হয়। রাতের বেলায় গাড়ির ব্যাটারি ও সরঞ্জাম চুরি হয়, ত্রিপল কেটে তরমুজও নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এর পরও টার্মিনাল খরচ হিসেবে ১৭০ টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
চালকদের অভিযোগ, সারা বছরই এ নৌপথে নাব্যতা সংকট থাকে। জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভর করে ফেরিতে গাড়ি পারাপার করতে হয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ফেরির স্বল্পতা, একটি চালু থাকলে আরেকটি বিকল হয়ে পড়ে থাকে বলে অভিযোগ তাঁদের।
ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় প্রায় ৫০ হাজার একর জমিতে তরমুজের আবাদ হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় ১৮ হাজার একর বেশি। প্রতি একরে ফলন হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কেজি।
বাংলাদেশ কৃষক ঐক্য ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান কৃষক মো. শাহাব উদ্দিন ফরাজি বলেন, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় এবং ঝড়-বৃষ্টির কারণে বাজারে তরমুজের দাম কমে গেছে। আগে যেখানে ১০০টি তরমুজ ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি হতো, এখন তা ৯-১০ হাজার টাকায় নামতে হয়েছে। পরিবহন খরচই উঠছে না, তার ওপর ফেরি–সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ফেরিঘাটের ব্যবস্থাপক কাওসার আহমেদ বলেন, আগে পাঁচটি ফেরি থাকলেও একটি বিকল হয়ে ডকইয়ার্ডে আছে। তবে ‘গৌরী’ নামের একটি বড় ফেরি যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হবে এবং আর কোনো গাড়ি আটকে থাকবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ভোলা-বরিশাল-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ভোলা অংশে ইলিশা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ফেরিঘাট পর্যন্ত দীর্ঘ সারিতে অপেক্ষায় আছে ট্রাক।
এদিকে ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীদের চাপও বেড়েছে। রোববার সকাল থেকে ইলিশা ঘাট থেকে ঢাকার সদরঘাটের উদ্দেশে একের পর এক লঞ্চ ছেড়ে গেছে, প্রতিটি লঞ্চেই ছিল অতিরিক্ত যাত্রী। একই সময়ে লক্ষ্মীপুরের মজু চৌধুরীর হাট ঘাটের উদ্দেশে ছয়টি নৌযান ছেড়ে গেলেও নৌযান সংকটে শত শত যাত্রীকে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।
অনেক যাত্রী অভিযোগ করেন, বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে স্পিডবোটে করে উত্তাল মেঘনা নদী পাড়ি দিতে হচ্ছে। এতে যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা আছে।
ঘাট–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেন, ঈদের ছুটি শেষে হঠাৎ যাত্রীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত লঞ্চ থাকায় দূরপাল্লার যাত্রীদের কিছুটা স্বস্তি মিলেছে।