মোঃ আব্দুল্লাহ আল মুকিম রাজু
পঞ্চগড় প্রতিনিধি
আহছানিয়া মিশন শিশু নগরী—চারপাশে নিস্তব্ধতা, আর ভেতরে ভেসে আসে শিশুদের হাসির শব্দ। পঞ্চগড় সদর উপজেলার হাফিজাবাদ ইউনিয়নের জলাপাড়া গ্রামে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ১৬০ জন এতিম, পথশিশু ও পরিবারহীন শিশুর নিরাপদ আশ্রয়স্থল।
এদের কেউ শৈশবে হারিয়ে গেছে, কেউ পরিত্যক্ত, আবার কেউ নিজের বাড়ির ঠিকানাটুকুও জানে না। আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে তাই তাদের জীবনে আনন্দ ও আক্ষেপ—দুটোই পাশাপাশি চলছে।
১২ বছর বয়সী সাগর ইসলাম এখনও ভুলতে পারেনি পুরান ঢাকা-র সেই বাড়ির স্মৃতি। ছোটবেলায় হারিয়ে গিয়ে দীর্ঘ সাত বছর কাটিয়েছে কমলাপুর এলাকায়। পরে সমাজকর্মী ইউসুফ আলীর সহায়তায় আশ্রয় পায় শিশু নগরীতে।
সাগরের ভাষায়,
“এখানে এসে ভালোই লাগে। ঈদে নতুন কাপড়, আতর, মেহেদি—সবই পাই।”
একই রকম গল্প ফাহিমের (১১)। ছয় বছর বয়সে হারিয়ে যাওয়ার পর আর খুঁজে পায়নি পরিবারকে। মা আগেই মারা গেছেন, বাবার সঙ্গে বিচ্ছেদ সেই হারানোর দিন থেকেই।
ফাহিম বলে,
“ইচ্ছা ছিল পরিবারের সাথে ঈদ করব। এখন স্যাররাই আমার পরিবার।”
তার স্মৃতিতে এখনও ভাসে পথশিশুর কঠিন জীবন—বস্তা কুড়ানো, অনিয়মিত খাবার। তবে এখানে এসে পেয়েছে নতুন জীবন—খাওয়া, পড়ালেখা, কাপড়—সবই বিনামূল্যে।
আট বছরের শুকুর আলীকে উদ্ধার করা হয় স্টেশন এলাকা থেকে। ঈদের আনন্দ তার কাছে ছিল অচেনা। এখন সে বলে,
“এখানে মেহেদি দেয়, ভালো খাবার হয়—অনেক ভালো লাগে।”
চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে হারিয়ে যাওয়া ১৪ বছর বয়সী সাজ্জাদুল ইসলাম বাইজিদের গল্পও কম কষ্টের নয়।
“মা দোকানে গেছিল, আমি ঘুরতেছিলাম। পরে দেখি মা নাই”—কণ্ঠে তার চাপা বেদনা।
তিন বছর পেরিয়ে গেলেও পরিবারকে ভুলতে পারেনি সে।
“সবার মতো আমারও পরিবারের সাথে ঈদ করতে ইচ্ছা করে,”—বলে বাইজিদ।
ইমাম মাহাদী (১৪) ২০১৯ সালে হারিয়ে গিয়ে পথশিশুর জীবনে নির্যাতনের শিকার হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় এখানে আশ্রয় পায়।
“এখানে ঈদের নামাজ পড়ি, পড়ালেখা করি। স্যাররাই এখন আমার মা-বাবা,”—জানায় সে।
সাত বছরের জয়নালের গল্প আরও হৃদয়বিদারক। তার দাবি, সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়েছেন তার বাবা-মা। ঘুরতে ঘুরতে একসময় সে-ও ঠাঁই পায় এই শিশু নগরীতে।
প্রতিষ্ঠানটির সমাজকর্মী ইউসুফ আলী বলেন,
“এখানে ১৬০ জন পরিবারবিহীন শিশু রয়েছে। আমরা চেষ্টা করি তাদের একটি পারিবারিক পরিবেশ দিতে, যেন ঈদে তারা কষ্ট না পায়।”
সেন্টার ম্যানেজার দীপক কুমার রায় জানান, ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা আহছানিয়া মিশন-এর একটি অঙ্গসংগঠন।
তিনি বলেন,
“এখানে শিশুদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার পূর্ণ ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদের প্রস্তুতি নিয়েছি। নতুন পোশাক, ভালো খাবার, এমনকি মাংসের জন্য ছাগলও কেনা হয়েছে।”
সব আয়োজনের পরও শিশুদের চোখে ভাসে একটাই অভাব—পরিবারের সান্নিধ্য। তবুও এই শিশু নগরীই তাদের কাছে এখন নতুন ঘর, নতুন পরিবার, নতুন স্বপ্নের ঠিকানা।
ঈদের আনন্দে তারা হাসে ঠিকই, কিন্তু সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে না-পাওয়া আপনজনের গভীর