ঢাকা , শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬ , ১৫ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বগুড়ায় সবজি-মাছ-মুরগিতে স্বস্তি, চাল-ডালে চাপে মধ্যবিত্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-১০-৩০ ১৫:০৯:৪০
বগুড়ায় সবজি-মাছ-মুরগিতে স্বস্তি, চাল-ডালে চাপে মধ্যবিত্ত বগুড়ায় সবজি-মাছ-মুরগিতে স্বস্তি, চাল-ডালে চাপে মধ্যবিত্ত
 নিজস্ব প্রতিবেদক

বগুড়ায় আগাম শীতকালীন সবজি বাজারে আসতে শুরু করায় কমেছে বিভিন্ন ধরনের সবজির দাম। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কোনো কোনো সবজির দাম কেজিতে ৩০ থেকে ৫০ টাকা পর্যন্ত কমেছে। একই সময়ে বিভিন্ন প্রজাতির মাছের দাম কেজিতে ৩০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কমেছে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দামও।

এতে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে ক্রেতাদের মধ্যে। তবে এর বিপরীতে বেড়েছে চাল ও বিভিন্ন ধরনের ডালের দাম। ফলে একদিকে কিছু পণ্য কিনতে কম টাকা খরচ হলেও অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য কিনতে বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। বিশেষ করে সীমিত আয়ের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো পড়েছে চাপে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুপুর থেকে বগুড়া শহরের রাজাবাজার, ফতেহ আলী বাজার, খান্দার বাজার ও কলোনি বাজার ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। এসব বাজারে বিভিন্ন এলাকা থেকে সবজি নিয়ে আসছেন পাইকারি বিক্রেতারা। পাশাপাশি খুচরা ক্রেতাদেরও উপস্থিতি দেখা গেছে। বাজার ঘুরে দেখা যায়, গত সপ্তাহের তুলনায় ফুলকপি, বাঁধাকপি, পটল, কাঁচ, মরিচ, ঢেঁড়স, বেগুন, করলা, ধনেপাতা, টমেটো ও লাউয়ের দাম কমেছে। বিজ্ঞাপন অন্যদিকে ২৫ কেজির বস্তায় চালের দাম জাতভেদে ৭০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন ধরনের ডালের দামও কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। তবে গরু, মহিষ ও খাসির মাংসের দাম আগের মতোই রয়েছে। কমেছে শীতকালীন সবজির দাম বাজারে শীতকালীন সবজির সরবরাহ বাড়তে শুরু করায় দাম কমেছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। গত

সপ্তাহে প্রতি পিস ফুলকপি ৮০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন আকারভেদে ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাঁধাকপির দাম ৬০ টাকা থেকে কমে ৪০ টাকায় নেমেছে। প্রতি কেজি পটল ৬০ টাকা থেকে কমে ৩০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১০০ টাকা থেকে ৫০ টাকা, ঢেঁড়স ৬০ টাকা থেকে ৩০ টাকা, লম্বা বেগুন ৬০ টাকা থেকে ৩০ টাকা এবং দেশি বেগুন ১০০ টাকা থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। হাইব্রিড শসার দাম ৬০ টাকা থেকে কমে ৪০ টাকা হয়েছে। বিজ্ঞাপন এ ছাড়া প্রতি কেজি করলা ৬০ টাকা থেকে কমে ৩০ টাকা, ধনেপাতা ২০০ টাকা থেকে ৮০ টাকা এবং টমেটো ১৮০ টাকা থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গত সপ্তাহে প্রতিটি লাউ ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন আকারভেদে ২০ থেকে ৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। মাছ, মুরগি ও ডিমেও কমেছে দাম বাজারের ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাসের শেষ সপ্তাহে ক্রেতার উপস্থিতি কম থাকায় মাছের বিক্রি কমেছে। পাশাপাশি সরবরাহ ও চাহিদার পরিবর্তনেও কিছু মাছের দাম কমেছে। গত সপ্তাহে বড় আকারের রুই মাছ প্রতি কেজি ৩৫০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ৩২০ টাকায়। ছোট ও মাঝারি আকারের রুইয়ের দাম ২৮০ টাকা থেকে কমে ২৫০ টাকা হয়েছে। কাতলা মাছ ৪০০ টাকা থেকে কমে ৩৫০ টাকা, গ্রাসকার্প ৩২০ টাকা থেকে ২৯০ টাকা, কার্পজাতীয় মাছ ৩০০ টাকা থেকে ২৮০ টাকা এবং তেলাপিয়া ২২০ টাকা থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। পাঙাশ মাছের দামেও পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। তবে এ মাছের দামের বিষয়ে বাজারে পাওয়া তথ্যে ভিন্নতা রয়েছে। কোথাও গত সপ্তাহের ২২০ টাকা থেকে কমে ২০০ টাকা, আবার কোথাও আকারভেদে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। এদিকে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা কমেছে। ডিমের দামও গত এক সপ্তাহে হালিপ্রতি ৪ থেকে ৫ টাকা কমেছে। লাল ডিমের দাম ৫০ টাকা থেকে কমে ৪৫ টাকা, হাঁসের ডিম ৬৪ টাকা থেকে ৬০ টাকা এবং দেশি মুরগির ডিম ৮৫ টাকা থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাছের দাম কমলেও সব ধরনের মাছের দাম একই হারে কমেনি। ক্রেতাদের অভিযোগ, কোনো কোনো মাছের দাম কমলেও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দামের কারণে সামগ্রিক বাজার খরচে স্বস্তি মিলছে না। চালের বস্তায় বাড়তি ৭০ থেকে ১০০ টাকা সবজি ও মাছের দাম কমলেও চালের বাজারে বেড়েছে খরচ। ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে ২৫ কেজির বস্তায় বিভিন্ন জাতের চালের দাম ৭০ থেকে ১০০ টাকা বা তারও বেশি বেড়েছে। গত সপ্তাহে ২৫ কেজির বস্তা আটাশ চালের দাম ছিল ১ হাজার ২৮০ টাকা, এখন তা বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৩৫০ টাকা। বিআর-২৯ চালের দাম ১ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৩৩০ টাকা, নাজিরশাইল ১ হাজার ৭০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা, কাটারিভোগ ১ হাজার ৯৫০ টাকা থেকে ২ হাজার ১৫০ টাকা এবং মিনিকেট ১ হাজার ৬০০ টাকা থেকে ১ হাজার ৭৫০ টাকা হয়েছে। ব্যবসায়ীরা

জানিয়েছেন, সবচেয়ে বেশি দাম বেড়েছে মৌসুমি বোরো চালের। গত সপ্তাহে ২৫ কেজির বস্তা এ চালের দাম ছিল ২ হাজার ৩৫০ টাকা, এখন তা বেড়ে ২ হাজার ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফতেহ আলী বাজারের মেসার্স ইমন এন্টারপ্রাইজের ব্যবসায়ী জালাল উদ্দিন ঢাকা পোস্টকে বলেন, বর্তমান মৌসুমে পুরোনো চালের মজুত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। পুরোনো চালের চাহিদা বেশি থাকায় দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে এ দাম বেশিদিন থাকবে না, কয়েক দিনের মধ্যে কমতে পারে বলে আশা করছেন তিনি। ডালের দামও ঊর্ধ্বমুখী, স্থিতিশীল মাংস চালের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ডালের দামও বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, এক সপ্তাহের ব্যবধানে ডালের দাম কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। মোটা মসুর ডাল কেজিপ্রতি ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি মসুর ডালের দাম রয়েছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকার মধ্যে। অন্যদিকে বগুড়ায় গরুর মাংস কেজিপ্রতি ৭৫০ টাকা, মহিষের মাংস ৮০০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্যের দাম আগের মতোই রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। এ ছাড়া প্রতি কেজি পেঁয়াজ ৪৫ টাকা, দেশি রসুন ৮০ টাকা, চায়না রসুন ১৬০ টাকা, আদা ১৪০ টাকা, ডায়মন্ড আলু ২০ টাকা এবং দেশি আলু ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের পাঁচ লিটারের বোতল ১ হাজার টাকা এবং খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ২০৮ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সবজি কিনতে পারলে মাছ কিনতে হিমশিম নিত্যপণ্যের বাজারে দামের এমন ওঠানামায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সীমিত আয়ের মানুষ। তাদের আয়ের বড় অংশই খাবার কেনায় ব্যয় হয়। ফলে একদিকে কিছু পণ্যের দাম কমলেও অন্যদিকে চাল, ডাল ও মাংসের মতো পণ্যের বাড়তি খরচ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। ফতেহ আলী বাজারে সবজি কিনতে আসা আব্দুর রশিদ মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাজারের সবকিছুই নাগালের বাইরে। সবজির দাম আপাতত কমলেও অন্য জিনিসপত্র কিনতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে। মাসের শেষে চাল কিনতে এসে দেখি, চালের দাম বেড়েছে। মাছ কিনতে আসা রাকিব আহমেদ বলেন, গত কয়েক দিনের তুলনায় মাছের দাম কিছুটা কমেছে। তবে দাম বাড়ার সময় যে পরিমাণ বাড়ে, কমার সময় সে তুলনায় কমে না। মাছের দাম কমলেও মাংসের দাম আগের মতোই আছে। আবার চাল-ডালের দাম বাড়লে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের সংসার চালানো কঠিন হয়ে যায়। কলোনি বাজারে সবজি কিনতে আসা ইমরুল কায়েস বলেন, বর্তমানে বাজারের অবস্থা টালমাটাল। আমরা মধ্যবিত্ত পরিবার। এখন তৃপ্তি মিটিয়ে খাবার খাওয়ার দিন শেষ। সবজি কিনতে পারলে মাছ কিনতে পারি না, মাছ কিনতে পারলে মাংস কিনতে পারি না। ফতেহ আলী বাজারের মাছ ব্যবসায়ী আতাউর বলেন, মাসের শেষ সপ্তাহে বাজারে ক্রেতা কম থাকে। এ ছাড়া মাছের সরবরাহ ও চাহিদার পরিবর্তনের কারণে কিছু মাছের দাম কমেছে। তবে দাম কমলেও বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি কম বলে জানান তিনি। সবজি বিক্রেতা সাজু মিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, বাজারে চাহিদার তুলনায় ক্রেতা কম। পাশাপাশি শীতকালীন সবজির উৎপাদন বাড়তে শুরু করায় দাম কমছে। আগামী এক সপ্তাহে সবজির দাম আরও কমতে পারে বলে আশা করছেন তিনি। বাজার মনিটরিং জোরদারের দাবি ক্যাবের দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে ভোক্তাদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ফজিলাতুন্নেছা ফৌজিয়া ঢাকা পোস্টকে বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়মিত ওঠানামা করলেও বাজার এখনো চড়া। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি কাঁচাবাজারে দু একটি পণ্যের দাম কিছুটা কমেছে, তবে বেশির ভাগ পণ্যের দামই বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, ভোক্তাদের জন্য এটি দুর্দশার অবস্থা। তারা এখনো স্বস্তিতে নেই। ভোক্তারা মনে করছেন, তাদের আয় যা হচ্ছে, তার তুলনায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যয় অনেক বেশি। বাজার মনিটরিংয়ের বিষয়ে ফজিলাতুন্নেছা ফৌজিয়া বলেন, ক্যাব ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে কাজ করছে। সারা দেশের বিভিন্ন জেলায় মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। বগুড়াতেও শিগগিরই এ বিষয়ে কর্মসূচি নেওয়া হবে। এ বিষয়ে বগুড়া জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসানকে ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। ক্রেতাদের দাবি, সবজি ও মাছের বাজারে পাওয়া সাময়িক স্বস্তি ধরে রাখতে হবে।

একই সঙ্গে চাল ডালের বাজার স্থিতিশীল রাখা, সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং বাজারে অনিয়ম থাকলে তা প্রতিরোধে নিয়মিত ও কার্যকর নজরদারি বাড়াতে হবে। তাদের মতে, নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রধান খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে না এলে সবজি বা মাছের দাম কিছুটা কমলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের মাসিক ব্যয়ের চাপ কমবে না।


নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ