৫০০ কোটি রুপি লেনদেনের অডিও ক্লিপ ভাইরাল, বিজেপি-শিবসেনার দ্বন্দ্ব চরমে
নিজস্ব প্রতিবেদক
ভারতের মহারাষ্ট্রে বিজেপি থেকে শিবসেনার মাধ্যমে ৫০০ কোটি রুপি লেনদেন প্রসঙ্গে একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়েছে। এ নিয়ে রীতিমতো বাগ্যুদ্ধ শুরু হয়েছে ক্ষমতাসীন জোটের দুই শরিকের মধ্যে। এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।
মারাঠা সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষণের দাবিতে আন্দোলনকারী মনোজ জারাঙ্গে পাতিল ওই অডিওটি প্রকাশ করেন। অডিওতে এক অজ্ঞাতপরিচয় নারীকে দাবি করতে শোনা যায়, বিজেপির কাছ থেকে ৫০০ কোটি রুপি শিবসেনার সংসদ সদস্য শ্রীকান্ত শিন্ডের মাধ্যমে তাঁর কাছে পাঠানো হয়েছিল। তবে অর্থের আদৌ কোনো লেনদেন হয়েছিল কি না, হয়ে থাকলে সেই অর্থ কোথায় গেছে সে উত্তর মেলেনি।
জারাঙ্গে পাতিল অবশ্য ৫০০ কোটি রুপি চাওয়া বা পাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে ২০২৪ সালের মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপির অর্থ পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে যাঁর নাম উঠে এসেছে, সেই শ্রীকান্ত শিন্ডে এখন বিতর্কের কেন্দ্রে।
শ্রীকান্তের বাবা ও মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা এই অভিযোগকে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে, জোটের বড় শরিক বিজেপিও দলটির সঙ্গে অর্থের যোগসূত্র টানার অভিযোগের পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মনে করছে।
শিবসেনার নেতা ও সাবেক মন্ত্রী রামদাস কদম অভিযোগ করেছেন, বিজেপির একটি অংশ একনাথ শিন্ডেকে রাজনৈতিকভাবে ‘শেষ করে দিতে’ ষড়যন্ত্র করছে। শুক্রবার তিনি বলেন, ‘বিজেপির সঙ্গে যোগসাজশ করে আপনারা একজন মারাঠা নেতা (একনাথ শিন্ডে)কে শেষ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছেন।’
এ সময় বিজেপির বিধান পরিষদ সদস্য প্রবীণ দারেকর ও প্রসাদ লাডের নাম উল্লেখ করেন কদম। পাশাপাশি লাড ও জারাঙ্গে পাতিলকে একসঙ্গে খাবার খেতে দেখা যাচ্ছে—এমন ছবিও দেখান তিনি।
বিজেপির বিধান পরিষদে দলীয় নেতা দারেকর ও লাড পাল্টা জবাব দিয়েছেন। তারা বলেছেন, এভাবে বিজেপিকে অভিযুক্তের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো দলটি মেনে নেবে না। কদমকে উদ্দেশ করে তাঁরা বলেন, তিনি যেন ‘সঞ্জয় রাউত হয়ে না ওঠেন’। সঞ্জয় রাউত উদ্ধব ঠাকরের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা (ইউবিটি) দলের নেতা, যিনি প্রায়ই বিজেপির সমালোচনা করেন।
লাড বলেন, মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশের বিরুদ্ধে জারাঙ্গে পাতিলকে নেপথ্য থেকে কারা সমর্থন দিয়েছেন, তা শিগগিরই প্রকাশ্যে আসবে। বিজেপি এর ‘সমুচিত জবাব’ দেবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
অভিযোগ অস্বীকার করেছেন একনাথ শিন্ডেও। দিল্লিতে তিনি বলেন, ‘আমি ৫০০ কোটি রুপি দিইনি, আবার নিইওনি।’
চলতি সপ্তাহের শুরুতে বীডে এক সমাবেশে জারাঙ্গে পাতিল অভিযোগ করেছিলেন, বিজেপির অন্দরমহলে ফিসফাস চলছে যে শ্রীকান্ত শিন্ডের মাধ্যমে তাঁকে ৫০০ কোটি রুপি দেওয়া হয়েছিল। বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অডিও ক্লিপটি বাজান। তবে রেকর্ডিংয়ে কথা বলতে শোনা যাওয়া তিন-চারজন ব্যক্তি কারা, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।
একনাথ শিন্ডে বলেছেন, অভিযোগটি প্রথমে যাচাই না করে জারাঙ্গে পাতিলের এ ধরনের দাবি করা উচিত হয়নি। তাঁর কাছে কোনো প্রমাণ থাকলে তা সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া উচিত। শিন্ডের নেতৃত্বাধীন শিবসেনা এ ঘটনায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছেও চিঠি দিয়েছে। এরই মধ্যে ফড়নবিশ তদন্তের ঘোষণা দিয়েছেন।
শুক্রবার শিন্ডে শিবিরের একটি প্রতিনিধিদল ফড়নবিশের সঙ্গে দেখা করার পর তিনি অডিও ক্লিপটির ফরেনসিক পরীক্ষার নির্দেশ দেন। বার্তা সংস্থা পিটিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফড়নবিশ বলেন, ‘আমাদের সবার একই প্রশ্ন, আড়াই বছর পর এখন কেন এসব কথোপকথন সামনে এল?’
শনিবার শ্রীকান্ত শিন্ডে অভিযোগটি নিয়ে ব্যঙ্গ করেন। তিনি বলেন, ‘মনোজ জারাঙ্গে পাতিলের মনে যে প্রশ্ন এসেছে, সেই প্রশ্ন আমার মনেও এসেছে। এখন আমি সেটির খোঁজে বের হয়েছি। আমরা আলোচনা করছিলাম, ৫০০ কোটি রুপি নগদ দেখতে কেমন হবে এবং তা পরিবহনে কতগুলো গাড়ি লাগবে।’
পরে বিরোধ মেটানোর উদ্যোগ নেন লাড। তিনি বলেন, শিবসেনার মন্ত্রী উদয় সামন্ত একনাথ শিন্ডে ও ফড়নবিশের সঙ্গে আলোচনার পর তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। এরপর বিষয়টি ‘মিটে গেছে’। বিজেপি ও শিবসেনার মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টার জন্য শিবসেনা (ইউবিটি) সাংসদ সঞ্জয় রাউতকে দায়ী করেন লাড। পিটিআইয়ের প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘আমরা একনাথ শিন্ডেকে সম্মান করি এবং তাঁকে বড় ভাইয়ের মতো মনে করি।’
এদিকে জারাঙ্গে পাতিল দাবি করেছেন, অডিও ক্লিপটি আসল। কীভাবে তিনি রেকর্ডিংটি পেলেন, তা জানতে রাম কদমকে জিজ্ঞাসাবাদেরও দাবি জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার জলনায় জারাঙ্গে পাতিল যে রেকর্ডিংটি বাজিয়েছিলেন, তাতে এক নারীকে বলতে শোনা যায়, শ্রীকান্ত শিন্ডের মাধ্যমে তাঁর কাছে ৫০০ কোটি রুপি পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। রেকর্ডিংয়ে অন্য কয়েকজনকে ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে মারাঠওয়াড়া অঞ্চলে জারাঙ্গে পাতিলের প্রভাব মোকাবিলার উপায় নিয়েও আলোচনা করতে শোনা যায়। তবে অডিওটির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।
ফড়নবিশ ও একনাথ শিন্ডের মধ্যে টানাপোড়েনের খবরের মধ্যেই এই বিতর্ক সামনে এল। চলতি মাসে দশেরা উপলক্ষে এক সমাবেশে শিবসেনার মন্ত্রী গুলাবরাও পাতিল একনাথ শিন্ডেকে ভবিষ্যতের মুখ্যমন্ত্রী বলে উল্লেখ করেছিলেন। ওই মন্তব্যে বিজেপি নেতারা অসন্তুষ্ট হয়েছিলেন বলে খবর প্রকাশিত হয়।