‘লা'শ দা'ফনে বা জানাজায় কোনো বাঁধা ছিলনা, আপ'ত্তি ছিল ভূ'য়া মুক্তিযোদ্ধাকে 'গার্ড অব অনার' প্রদানে’ :মাসুদ সাঈদী
নিজস্ব প্রতিবেদক
যুদ্ধাপরাধ মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম প্রধান সাক্ষী মানিক পশারীর দাফন এবং তাকে ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী। তার মতে, মানিক পশারীর লাশ দাফন বা জানাজায় কোনো বাধা ছিল না, তবে আপত্তি ছিল একজন কথিত ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে’ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের বিষয়ে।
সম্প্রতি নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে মাসুদ সাঈদী এসব কথা বলেন। ইত্তেফাকের পাঠকদের জন্য মাসুদ সাঈদীর পোস্ট হুবহু তুলে ধরা হলো।
ফেসবুক পোস্টে তিনি লিখেন, ‘লাশ দাফনে বা জানাজায় কোনো বাঁধা ছিলনা, জনগনের আপত্তি ছিল ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাকে 'গার্ড অব অনার' প্রদানে-যা রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অবমাননা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শহীদ আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে বিতর্কিত ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পোষ্য ও সুবিধাভোগী দালাল কুখ্যাত মানিক পসারী আজ দিনের কোন একসময় গোপালগঞ্জের একটি হাসপাতালে মারা যায়। মৃত্যুর পর তাকে পিরোজপুরে আনা হয় এবং তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ‘গার্ড অব অনার’ প্রদানের চেষ্টা করা হয়। জনগন বিষয়টি জানতে পেরে তাকে কথিত ‘গার্ড অব অনার’ প্রদানে বাঁধা প্রদান করে এবং কুখ্যাত মানিক পশারী যে মুক্তিযোদ্ধা নন তা প্রশাসনকে অবহিত করেন। কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয় তিনি 'গেজেট প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা!' এরপরো জনগন একজন ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাকে গার্ড অব অনার প্রদানে বাঁধা প্রদান করে। আমরা জনগনকে শান্ত করেছি, ধৈর্য ধারন করতে বলেছি। অতীতে আওয়ামী লীগ যেসব অন্যায় করেছে সেসব অন্যায় কোনভাবেই যেন আমাদের দ্বারা না হয় সে বিষয়ে জনগনকে বুঝিয়েছি। আমি বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি (বরিশাল রেঞ্জ) থেকে শুরু করে পিরোজপুর প্রশাসনের সাথে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রেখেছি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য আমি আমার অবস্থান থেকে এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দলগত অবস্থান থেকে উভয়ে একযোগে সর্বাত্নক প্রচেষ্টা চালিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বরাবরই নিয়ন্ত্রণে ছিল, তবে জনগনের ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ সত্যিই খুব কঠিন ছিল।
কুখ্যাত মানিক পশারীর জানাজা বা দাফন নিয়ে আমাদের কোন বক্তব্য বা বাঁধা ছিলনা, নেইও। আপত্তি ছিল একজন ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাকে 'গার্ড অব অনার' প্রদান নিয়ে। যদিও প্রশাসন মিথ্যাচার ও জালিয়াতির মাধ্যমে প্রাপ্ত একজন ভূয়া মুক্তিযোদ্ধাকে গোপনে গার্ড অব অনার প্রদান করেছে।
অবশ্যই ঘটনাটি এদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের অপমান ও মহান স্বাধীনতার অবমাননা এবং দেশের আইনি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি চরম এক উপহাস বলে মনে করছি। যে ব্যক্তি স্বয়ং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জেরায় স্বীকার করেছেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা নন— সেইরকম প্রতারক ব্যাক্তিকে একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া এবং বছরের পর বছর সরকারি ভাতা ভোগ করতে দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ও ডিও লেটার জালিয়াতি: সবচেয়ে বড় জালিয়াতি হল যখন মানিক পশারীকে ট্রাইব্যুনালের আইনজীবী প্রশ্ন করেন যে, 'আপনি মুক্তিযোদ্ধা কিনা?' তখন সে স্পষ্ট করেই বলেছিল, 'আমি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করিনি। 'ট্রাইবুনালে তার বক্তব্য আমি এখানে হুবহু তুলে ধরছি- "আমি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করি নাই, তবে সহযোগিতা করেছি। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছি। এই জন্য বর্তমান এমপি এ,কে,এম,এ, আওয়াল সাহেব আমার নামে একটি ডিও লেটার দিয়েছে আমার নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করার জন্য। আমি পিরোজপুরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা করার পরে না আগে আমার ঐ ডিও লেটার দিয়েছে তা আমার স্মরন নাই।"
এখানে মানিক পশারী অকপটে স্বীকার করেছে যে সে কোনো মুক্তিযোদ্ধা নয়। তবে এই মামলায় সাক্ষী হিসেবে আসার আগে তৎকালীন আওয়ামী দোসর কুখ্যাত এমপি আউয়াল তাকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর জন্য একটি ডিও (Demiofficial) লেটার দিয়েছিল। অর্থাৎ, স্রেফ মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে তাকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর অপচেষ্টা করা হয়েছিল।
আমাদের স্পষ্ট দাবি ও প্রশ্ন:
১. একটি দেশের সর্বোচ্চ বীরত্ব ও সম্মানের জায়গা হলো 'মুক্তিযোদ্ধা' খেতাব। মানিক পশারীর মতো একজন কুখ্যাত ও স্বঘোষিত অ-মুক্তিযোদ্ধা এবং প্রমাণিত মিথ্যাবাদীকে কারা গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা বানাল? কোন কুচক্রী মহল তাকে রাষ্ট্রের করের টাকায় বছরের পর বছর মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পাওয়ার সুযোগ করে দিল?
২. মানিক পসারীকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং তাকে অবৈধভাবে ভাতা পাইয়ে দেওয়ার পেছনে যে সমস্ত কর্মকর্তা, যাচাই-বাছাই কমিটি এবং রাজনৈতিক ব্যক্তি জড়িত ছিল, তাদের অবিলম্বে খুঁজে বের করতে হবে। রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির অপরাধে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩. একজন ভুয়া ব্যক্তিকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে প্রত্যয়ন করে ডিও লেটার দেওয়া এবং মিথ্যা স্বাক্ষীর বিনিময়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম উঠানোর অপরাধে সাবোক অবৈধ এমপি একেএমএ আউয়ালের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. একই সাথে মানিক পশারীর নাম অনতিবিলম্বে মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট থেকে বাতিল করতে হবে এবং তাকে দেওয়া সমস্ত রাষ্ট্রীয় সুবিধা ও ভাতা চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
মিথ্যা ও জালিয়াতির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা কোনো অপশক্তি চিরদিন সত্যকে ধামাচাপা দিতে পারে না। মানিক পসারী ও তার পৃষ্ঠপোষকদের এই জালিয়াতি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে কলঙ্কিত করেছে। আমরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই এবং জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।