ঢাকা , রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ , ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাসপোর্ট আ'ট'কে রেখে অতিরিক্ত টাকা দাবির অ'ভি'যো'গ

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-১০-১৭ ১৯:৫৯:২০
পাসপোর্ট আ'ট'কে রেখে অতিরিক্ত টাকা দাবির অ'ভি'যো'গ পাসপোর্ট আ'ট'কে রেখে অতিরিক্ত টাকা দাবির অ'ভি'যো'গ
নিজস্ব প্রতিবেদক

মালয়েশিয়ায় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে দেশটিতে পাড়ি জমিয়ে প্রতারণার শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশের তিন শিক্ষার্থী— সুমাইয়া আফরোজা ঐশী, অরিন আরিহা ও নাহিন আহমেদ। তাদের অভিযোগ, স্টুডেন্ট ভিসা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও টিউশন ফি পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কয়েক দফায় প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ‘ড্রিম অ্যাব্রড সলিউশন’ ও ‘হাসান ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস’ নামে দুই এজেন্সি। তবে, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ভর্তি ও টিউশন ফি পরিশোধ না করায় অনিশ্চয়তায় পড়েছে তাদের শিক্ষাজীবন। এর মধ্যে দুজনের পাসপোর্ট আটকে রেখে অতিরিক্ত টাকা দাবি করারও অভিযোগ উঠেছে।

ফলে ভিসা বাতিল হওয়া এবং মালয়েশিয়ায় অবৈধ হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন এই শিক্ষার্থীরা। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের পরিবারের পক্ষ থেকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে ইতোমধ্যে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগটি করেছেন শিক্ষার্থী নাহিন আহমেদের বাবা ও সুমাইয়া আফরোজা ঐশীর শ্বশুর মো. আনোয়ার হোসেন আকাশ। ভুয়া অফার লেটার ও দীর্ঘসূত্রতা অভিযোগের সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ফেসবুকে প্রচারিত ভিডিও দেখে মালয়েশিয়ায় স্টুডেন্ট ভিসায় যাওয়ার আশায় তারা ‘ড্রিম অ্যাব্রড সলিউশন’-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে জেনোভাসি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করানোর আশ্বাস দেয় এবং কিছুদিনের মধ্যে তিন শিক্ষার্থীর জন্য অফার লেটারও প্রদান করে। প্রতিষ্ঠানের কথায় বিশ্বাস করে ওই বছরের ২৭ নভেম্বর তিনজনের প্রক্রিয়াকরণ বাবদ মোট ৪ লাখ টাকা তাদের ব্যাংক হিসাবে জমা দেন অভিভাবকেরা। তবে

পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, জেনোভাসি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে দেওয়া অফার লেটারটি ছিল সম্পূর্ণ নকল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে এজেন্সি জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়টি ব্লক হয়ে গেছে এবং সেখানে আপাতত ভর্তি হওয়া সম্ভব নয়। ভুক্তভোগীদের দাবি, তারা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে রাজি না হয়ে জমা টাকা ফেরত চাইলে তা দেওয়া হয়নি। উল্টো জোরপূর্বক তাদের অন্য প্রতিষ্ঠানে আবেদন করানো হয়। একপর্যায়ে দুজনকে ইউপিটিএম ইউনিভার্সিটিতে এবং একজনকে পারদানা কলেজে অফার লেটার দেওয়া হয়। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন ইএমজিএস আবেদন প্রক্রিয়ার অগ্রগতি ৫ থেকে ১৫ শতাংশে প্রায় তিন মাস আটকে রাখা হয়। দুই মাসের মধ্যে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর কথা থাকলেও দেখতে দেখতে কেটে যায় ছয় মাস। এভাবে আশ্বাস দিয়ে তাদের মূল্যবান সময় নষ্ট করে এজেন্সিটি। পরবর্তীতে ভুক্তভোগীরা আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে পরিচিত হন, যারা একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। সেমিস্টার ফি বাবদ টাকা নিলেও তা বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেওয়া হয়নি। প্রথম দফায় দেওয়া ৪ লাখ টাকা ফেরত না পেয়ে একপর্যায়ে ড্রিম অ্যাব্রড সলিউশনের মাধ্যমে কাজ বন্ধ করে দেন ভুক্তভোগীরা। দ্বিতীয় দফায় জাহিদ হাসানের হাত ধরে আবার প্রতারণা প্রথম প্রক্রিয়ায় ব্যর্থ হয়ে ভিসার বাকি কাজ সম্পন্ন করতে তারা জাহিদ হাসান নামের এক ব্যক্তির শরণাপন্ন হন। জাহিদ হাসান ‘হাসান ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলস’-এর প্রতিষ্ঠাতা। অভিযোগে বলা হয়, জাহিদ হাসান সেমিস্টার ফি, রেজিস্ট্রেশন ও ইমিগ্রেশন ফি বাবদ তাদের কাছ থেকে আরও ১৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা নেন। তার নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের পরিবার আইএফআইসি ব্যাংকের পল্টন শাখায় প্রতিষ্ঠানটির চলতি হিসাবে (হিসাব নম্বর: ০২০০১৮৩৩৯....) টাকা জমা দেয়। ব্যাংক রসিদ ভুক্তভোগীদের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। শিক্ষার্থী সুমাইয়া আফরোজা ঐশী বলেন, ‘মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর পর আমরা জানতে পারি যে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফি ও প্রয়োজনীয় খরচ জমা দেওয়া হয়নি। বর্তমানে আমাদের শিক্ষাজীবন সম্পূর্ণ অনিশ্চিত এবং কলেজ থেকে ভিসা বাতিলের নোটিশ দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, ‘জাহিদ হাসান আমাদের দুজনের পাসপোর্ট আটকে রেখেছেন এবং ফেরত দেওয়ার জন্য অতিরিক্ত টাকা দাবি করছেন। টাকা না দিলে পাসপোর্ট দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। অন্যদিকে, নাহিন আহমেদের পাসপোর্ট রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে, কারণ সেখানে নামমাত্র কিছু টাকা জমা দেওয়া হয়েছে।’ মো. আনোয়ার হোসেন আকাশের অভিযোগে বলা হয়, ড্রিম অ্যাব্রড সলিউশন-এর মালিক জিহাদ আহমেদ ও হাসান ইন্টারন্যাশনাল-এর জাহিদ হাসান পরস্পর যোগসাজশে প্রতারক চক্র গড়ে তুলেছেন। জিহাদ ফাইল হস্তান্তরের সময় নিজের কমিশন রেখে বাকি কাজ জাহিদের কাছে পাঠান। দুই ধাপে তিন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মোট ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থী অরিন আরিহা বলেন, ‘ইউপিটিএমের মতো নামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নামমাত্র অর্থ পরিশোধ করে শিক্ষার্থীদের মালয়েশিয়ায় নিয়ে আসা হয়। এখানে আসার পর শিক্ষার্থীরা দেখেন মূল ফি জমা হয়নি। পরবর্তীতে বাধ্য করে তাদের বাংলাদেশি মালিকানাধীন বেসরকারি ইংরেজি শিক্ষা কেন্দ্রে ভর্তি করানো হয়। এ ধরনের প্রতারণায় অনেক শিক্ষার্থীর জীবনের মূল্যবান বছর নষ্ট হচ্ছে, পরিবারগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে এবং অনেকে মালয়েশিয়ায় অবৈধ হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ছেন।’ অভিযোগ অস্বীকার জাহিদ হাসানের এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাসান ইন্টারন্যাশনাল ট্যুরস অ্যান্ড ট্রাভেলসের প্রতিষ্ঠাতা জাহিদ হাসান অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি কাউন্সেলিং বা আমার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের আনার কোনো প্রক্রিয়ায় যুক্ত ছিলাম না। তারা আমার বন্ধুর আত্মীয় হওয়ায় মানবিক দিক বিবেচনা করে সহযোগিতা করেছি। তাদের সঙ্গে আমার টাকা-পয়সার কোনো লিখিত চুক্তি হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সে ভর্তি হয়েছিল, যা আমাকে আগে জানানো হয়নি। আমি জানলে অন্য পরামর্শ দিতাম। তাদের কাজে আমার নিজের পকেট থেকেও অতিরিক্ত প্রায় ১২ হাজার রিঙ্গিত খরচ হয়েছে। তাদের পাসপোর্ট

আমার কাছে নেই; নিয়ম অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় বা ইমিগ্রেশনে পাসপোর্ট থাকার কথা। আমার বিরুদ্ধে পাসপোর্ট আটকে রাখার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।’ নিজের সুনাম ক্ষুণ্ন করার দাবি তুলে জাহিদ হাসান বলেন, ‘আমি পরিচিত হিসেবে সাহায্য করতে গিয়ে এখন বিপদে পড়েছি। তারা যে টাকা দিয়েছে, তা তাদের কাজের পেছনেই খরচ হয়েছে। আমার প্রতিষ্ঠানের সুনাম নষ্ট করা ও মিথ্যা অভিযোগ তোলার কারণে আমি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’


নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ