ঢাকা , রবিবার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬ , ২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঢাকার গণঅভ্যুত্থান থেকে দিল্লির তরুণদের বি'ক্ষো'ভ

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-১০-১৭ ১৬:৪০:৫৪
ঢাকার গণঅভ্যুত্থান থেকে দিল্লির তরুণদের বি'ক্ষো'ভ ঢাকার গণঅভ্যুত্থান থেকে দিল্লির তরুণদের বিক্ষোভ

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকার রাজপথে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান আর ২০২৬ সালে দিল্লিতে তরুণদের বিক্ষোভ, দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা হলেও উভয় ক্ষেত্রেই সামনে এসেছে তরুণদের ক্ষোভ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এবং রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগের প্রশ্ন। বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। অন্যদিকে ভারতে পরীক্ষার অনিয়ম, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং নির্বাচনব্যবস্থার জবাবদিহির দাবিতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ক্রমে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে। ভারতের কক্‌রোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতৃত্বাধীন এই আন্দোলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিও সামনে এসেছে। দুই দেশের অভিজ্ঞতা তুলনা করতে গিয়ে প্রশ্ন উঠছে, জনঅসন্তোষ যখন রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়, তখন গণতান্ত্রিক অধিকার অক্ষুণ্ন রেখে জনশৃঙ্খলা বজায় রাখবে কীভাবে রাষ্ট্র?

 

বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা পুনর্বহালের বিরোধিতা থেকে। তরুণদের কাছে বিষয়টি মেধার মূল্যায়ন, কর্মসংস্থান ও রাজনৈতিক সুযোগের সমতার বৃহত্তর প্রশ্ন হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দীর্ঘদিনের শাসনব্যবস্থা নিয়ে অসন্তোষ, দুর্নীতির অভিযোগ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার ক্ষোভ। আন্দোলন মোকাবিলায় তৎকালীন সরকারের কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও সংঘাতমুখী করে তোলে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের তদন্ত অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। তদন্তে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন, নির্বিচার আটক ও দমন-পীড়নের গুরুতর অভিযোগ উঠে আসে। নিহতদের মধ্যে ৪৪ জন পুলিশ সদস্যও ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ভারতে আন্দোলনের সূত্রপাত ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। পরীক্ষায় অনিয়ম, বেকারত্ব এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে উদ্বেগ তরুণ ও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে এক জায়গায় নিয়ে আসে। নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে প্রশাসনিক দায়িত্ব হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। অন্যদিকে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, এই প্রক্রিয়া নির্বাচনী প্রতিনিধিত্বকে প্রভাবিত করছে কি না। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ যাচাই যেমন জরুরি, তেমনি আন্দোলনের নামে সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগও প্রমাণের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

 

দিল্লির বিক্ষোভ ঘিরে বিদেশি প্রভাব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিত প্রচারণার অভিযোগও রাজনৈতিক বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিদেশে পরিচালিত কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট, সমন্বিত প্রচারণা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য রাজনৈতিক অসন্তোষকে বাড়িয়ে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আন্দোলনবিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের নেতারা। ২৪ জুলাই বিদেশি অর্থায়ন ও আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার অভিযোগে জাতীয় তদন্ত সংস্থার (এনআইএ) তদন্ত চেয়ে করা একটি আবেদন দিল্লি হাইকোর্ট গ্রহণ করেনি। তবে আদালতের এই সিদ্ধান্ত অভিযোগগুলোর সত্যতা প্রতিষ্ঠা করে না, আবার বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগও স্বয়ংক্রিয়ভাবে খারিজ করে না। এ ক্ষেত্রে অর্থায়নের নথি, যোগাযোগের তথ্য, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ ও সাংগঠনিক যোগসূত্রের মতো যাচাইযোগ্য প্রমাণ প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ভিডিও, বট অ্যাকাউন্ট কিংবা সমন্বিত প্রচারণার অস্তিত্ব পাওয়া গেলেও তার ভিত্তিতে কোনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা আন্দোলন সংগঠিত করেছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে, বিজেপিবিরোধী অবস্থান বা বিদেশি কোনো ব্যক্তির সমর্থনকে গোপন ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

 

বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান ভারতের রাজনৈতিক বিতর্কেও প্রভাব ফেলেছে। ১৪ অক্টোবর ২০২৬-এ অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও তরুণদের আন্দোলনের পরিচিত মুখ নেহা বোরা বাংলাদেশের জেন-জি আন্দোলনের প্রশংসা করে বলেছিলেন, এই আন্দোলন তাদের পথ দেখিয়েছে। বিজেপি তাঁর বক্তব্যকে ভারতে একই ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানোর আকাঙ্ক্ষার ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাখ্যা করে। একই সময়ে নেহা বোরা ও সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে এক সংবাদ সম্মেলনে আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ ‘সরকার পরিবর্তনের’ পক্ষে বক্তব্য দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ১৬ অক্টোবর দীপক স্পষ্ট করেন, তাঁদের দাবি সরকার পরিবর্তন নয়, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অপসারণ। ফলে ব্যক্তিবিশেষের বক্তব্য, বিজেপির ব্যাখ্যা এবং আন্দোলনের নেতৃত্বের ঘোষিত অবস্থানকে আলাদা করে দেখা জরুরি। সংসদীয় গণতন্ত্রে নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের দাবি বৈধ রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া বা সরকারের সমালোচনা করাও নিজে থেকে কোনো ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হতে পারে না। তবে রাজনৈতিক বক্তব্য আন্দোলনের লক্ষ্যকে কীভাবে প্রভাবিত করছে, তা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ রয়েছে।

 

ঢাকা ও দিল্লির পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় পার্থক্য দেখা যায় সহিংসতার মাত্রা এবং রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ায়। বাংলাদেশে আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ ব্যাপক প্রাণহানি ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের জন্ম দেয়। এর পরিণতিতে সরকারের পতন ঘটে এবং পরবর্তী সময়ে প্রতিশোধমূলক সহিংসতার ঘটনাও সামনে আসে। দিল্লিতে এমন মাত্রার প্রাণঘাতী সহিংসতা বা রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ভেঙে পড়ার পরিস্থিতি দেখা যায়নি। তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপও বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। ব্যারিকেড, ব্যাপক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন, বিক্ষোভকারীদের আটক এবং সমাবেশে বিধিনিষেধ আরোপ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০ অক্টোবর প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে আটক করা হয়েছিল, যাঁদের অধিকাংশকেই পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। সাংবাদিক ও আইনজীবীরাও আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। পুলিশের আচরণ নিয়ে উদ্বেগের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টেও বিষয়টি ওঠে। এসব ঘটনা দেখায়, সহিংসতা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপের জবাবদিহিও নিশ্চিত করা জরুরি। বিক্ষোভকারীদের সহিংসতা বা সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুরের অভিযোগ থাকলে তার আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তবে কয়েকজনের অপরাধের দায় শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর চাপিয়ে নির্বিচার বলপ্রয়োগের সুযোগ নেই।

 

ভারতের সংবিধান বাক্‌স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার দিয়েছে, যদিও জননিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষায় আইনসম্মত কিছু সীমাবদ্ধতা আরোপ করা যায়। দিল্লি পুলিশ আগের সংঘর্ষ, অনুমতিহীন মিছিল এবং সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলার আশঙ্কাকে তাদের প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে। সংবেদনশীল সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের নামে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের পথ সংকুচিত করাও গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একইভাবে, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে যোগাযোগে বিধিনিষেধের কারণে তথ্যপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল, অন্যদিকে ভিডিও ও স্বাধীন অনুসন্ধানের মাধ্যমে দমন-পীড়নের বিভিন্ন ঘটনা সামনে আসে। ভারতে মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও, সংবাদ প্রতিবেদন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের আচরণ এবং বিক্ষোভকারীদের ভূমিকা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বয়ান ছড়িয়েছে। তাই বিদেশি প্রভাব বা বিভ্রান্তিকর প্রচারণার অভিযোগ যেমন প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করা প্রয়োজন, তেমনি সরকারের সমালোচনা ও স্বাধীন সাংবাদিকতাকে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা থেকেও বিরত থাকা জরুরি।

 

ঢাকা ও দিল্লির অভিজ্ঞতা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগ এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নেই এসে মিলেছে। বাংলাদেশের অভ্যুত্থান দেখিয়েছে, দীর্ঘদিনের ক্ষোভের সঙ্গে কঠোর দমন-পীড়ন যুক্ত হলে পরিস্থিতি কীভাবে সরকারের বৈধতা ও স্থিতিশীলতাকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে। ভারতের ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের তুলনামূলক সীমিত মাত্রা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলেও আটক, বিধিনিষেধ এবং পুলিশের আচরণ নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। একইভাবে, বিদেশি অর্থায়ন বা সমন্বিত অপপ্রচারের অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণের ভিত্তিতে খতিয়ে দেখতে হবে, রাজনৈতিক সন্দেহকে প্রমাণের বিকল্প করা যাবে না। গণতন্ত্রের শক্তি রাজপথ নীরব রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং নাগরিকের ক্ষোভ শোনা, ক্ষমতার জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং আইন মেনে শান্তিপূর্ণ ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ অক্ষুণ্ন রাখার মধ্যেই তার প্রকৃত পরীক্ষা।

 

 



নিউজটি আপডেট করেছেন : News Room 3

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ