মুসলিম সমাজে মোনাফেক কারা, এদের স্বভাব সম্পর্কে কোরআনে যা বলা হয়েছে
নিজস্ব প্রতিবেদক
ইসলামি জীবনবিধানে ‘মোনাফেক’ শব্দটি অত্যন্ত ঘৃণিত। মুনাফিকরা হলো সেই সব ব্যক্তি যারা মুখে ইসলামের কথা বলে কিন্তু অন্তরে কুফরি বা অবাধ্যতা লালন করে। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন সুরায় মোনাফেকদের চরিত্র এবং তাদের পরিণাম সম্পর্কে সুস্পষ্ট বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।
আরব মরুভূমির এক ছোট্ট ও চঞ্চল প্রাণী ‘জারবোয়া’। খুব বেশি লাফায় বলে একে অনেকে মরু ইঁদুর বা ক্যাঙ্গারি ইঁদুর বলে। আত্মরক্ষার প্রয়োজনে এই প্রাণীটির এক অদ্ভুত প্রবৃত্তি হয়, যা প্রাচীনকাল থেকেই আরবদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল।
জারবোয়া যখন মাটির নিচে নিজের থাকার জন্য গর্ত তৈরি করে, তখন সে বিপদের সময় পালানোর জন্য একটি বিকল্প পথও খুঁড়ে রাখে। এই গোপন পথের মুখে সে মাটির খুব পাতলা একটি আস্তরণ দিয়ে রাখে, যেন বাইরে থেকে বোঝা না যায়। বিপদের আঁচ পেলে সে মাথা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে সেই পাতলা মাটির স্তর ভেঙে দ্রুত পালিয়ে যায়। আরবরা জারবোয়ার গর্তের এই প্রথম ও মূল পথকে বলত ‘কাসিয়া’ এবং দ্বিতীয় গোপন পথকে বলত ‘নাফিকা’। এই ‘নাফিকা’ শব্দ থেকেই ‘নিফাক’ বা মোনাফেকির ধারণাটি এসেছে। কারণ মোনাফেকদের চরিত্রও ঠিক এই প্রাণীর মতোই; তাদের বাইরে থাকে এক রূপ, আর ভেতরে থাকে গোপন গর্ত, যার মাধ্যমে তারা সুযোগ পেলে প্রতারণার আশ্রয় নেয়।
সহজ কথায়, যাদের ভেতরে এক আর বাইরে আরেক তারাই মোনাফেক। তারা মুসলিমদের সামনে নিজেদের বিশ্বাসী দাবি করে, কিন্তু অবিশ্বাসী বা কাফেরদের সাথে মিলিত হলে ইসলামের বিরোধিতা করে।
পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, নিশ্চয়ই মোনাফেককরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করবে।
মোনাফেকি কত প্রকার?
ইসলামি গবেষকদের মতে, মোনাফেকি মূলত দুই প্রকার: বিশ্বাসগত মোনাফেকি ও আমলগত বা কার্যগত মুনাফেকি।
১. বিশ্বাসগত মোনাফেকি
এটি সবচেয়ে বিপজ্জনক। এর ৬টি লক্ষণের যেকোনো একটি কারো মধ্যে থাকলে সে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে নিক্ষিপ্ত হবে:
-রাসূল (সা.)-কে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা।
-রাসূল (সা.) যা নিয়ে এসেছেন তার কোনো অংশকে মিথ্যা বলা।
-রাসূল (সা.)-কে ঘৃণা বা অপছন্দ করা।
-ইসলামের বিধানের কোনো অংশকে অপছন্দ করা।
-ইসলামের অবনতিতে খুশি হওয়া।
-ইসলামের জয়ে বা বিজয়ে অসন্তুষ্ট হওয়া।
২. আমলগত বা কার্যগত মোনাফেকি
হাদিসের আলোকে কার্যগত মোনাফেকি ৫টি চিহ্নের মাধ্যমে চেনা যায়:
-কথা বললে মিথ্যা বলা
-ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করা।
-আমানত রাখলে তাতে খিয়ানত করা।
-ঝগড়া করলে অকথ্য গালি দেওয়া।
-চুক্তি করলে তা ভঙ্গ করা।
-যদিও আমলগত নিফাক মানুষকে তাৎক্ষণিক কাফের করে দেয় না, তবে এটি ধীরে ধীরে ইমানকে ধ্বংস করে বিশ্বাসগত মোনাফেকীর দিকে নিয়ে যায়। তাই প্রতিটি মুমিনের উচিত এসব বৈশিষ্ট্য থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা।
মোনাফেকের ৪ বৈশিষ্ট্য:
উপরে জবাবের মাঝেই মোনাফেকদের প্রধান চারটি বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে।
১. ভেতরে এক, বাইরে অন্য: তারা মুখে যা বলে, অন্তরে তা বিশ্বাস করে না এবং কাজেও তা প্রমাণ করে না। তারা এমন সব নৈতিক আদর্শের বুলি আওড়ায়, যা নিজেরা কখনোই পালন করে না। আবার তারা এমন সব কাজের সমালোচনা করে, যা তারা নিজেরাই গোপনে করে বেড়ায়।
এই ধরনের মানুষেরা নিজেদের নৈতিকতার একটি ‘ভুল সংকেত’ সমাজের সামনে উপস্থাপন করে। এর ফলে সমাজ যখন তাদের আসল রূপটি ধরে ফেলে, তখন মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস ও সামাজিক সংহতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
নবীজি (সা.) বলেছেন, “মোনাফেকের নিদর্শন তিনটি: যখন কথা বলে মিথ্যা বলে, যখন প্রতিশ্রুতি দেয় ভঙ্গ করে এবং যখন তার কাছে আমানত রাখা হয়, সে তার খেয়ানত করে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩)
২. নেতিবাচক তৎপরতা: তারা দ্বিমুখী আচরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে এবং নৈতিক অবক্ষয় তাদের স্বভাবে পরিণত হয়। তারা অবলীলায় বড় বড় অপরাধ ও ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং মিথ্যা শপথ করে নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করে।
এরা মূলত সমাজের ভেতর গুপ্তঘাতক হিসেবে কাজ করে। মক্কার অবিশ্বাসীরা ছিল সরাসরি শত্রু, যাদের মোকাবিলা করা তুলনামূলক সহজ ছিল, কারণ তাদের অবস্থান ছিল দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। কিন্তু মদিনার মোনাফেকরা ছিল ঘাপটি মেরে থাকা শত্রু।
নবীজির ইন্তেকালের পর, ওহির আগমন বন্ধ হয়ে গেলে মোনাফেকদের এই চরিত্র আরও খোলামেলা রূপ নেয়।
সাহাবি হুজাইফা (রা.) সেই সময়ের সমাজচিত্র দেখে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “নবীজির যুগে যারা মোনাফেক ছিল, আজকের দিনের মোনাফেকরা তাদের চেয়েও জঘন্য। কারণ, তারা তাদের কপটতা গোপন রাখত, আর এরা প্রকাশ্যে তা করে বেড়ায়।” (ইবনে আবি শাইবা, আল-মুসান্নাফ, ৭/২৫৪, মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ, ২০০৪)
৩. সত্যের প্রতি সংশয়: তারা না পারে পুরোপুরি সত্য গ্রহণ করতে, না পারে পুরোপুরি তা বর্জন করতে। কোরআনের ভাষায়, “তারা এর মাঝখানে দোদুল্যমান; না এদের দিকে, না ওদের দিকে।” (সুরা নিসা, আয়াত: ১৪৩)
তাদের এই দিশেহারা অবস্থাটি বোঝাতে গিয়ে একটি চমৎকার উপমা দেওয়া হয়েছে। হাদিসে বলা হয়েছে, “মোনাফেকের উদাহরণ হলো দুই পালের মাঝে ঘুরে বেড়ানো একটি ভেড়ার মতো। সে একবার এই পালের দিকে যায়, আবার ওই পালের দিকে যায়; সে বুঝতে পারে না কোনটির অনুসরণ করবে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৮৪)
যখন মানুষের ভেতরের সত্তা এবং বাইরের প্রদর্শিত রূপের মাঝে এই মাত্রার বিরোধ তৈরি হয়, তখন তা আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং মানসিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। মুমিনদের সাফল্য দেখলে এরা ভেতরে ভেতরে তীব্র ক্ষোভে জ্বলতে থাকে।
কোরআনে তাদের এই অবস্থার চিত্রায়ন করা হয়েছে এভাবে, “আর যখন তারা একান্তে মিলিত হয়, তখন তোমাদের প্রতি আক্রোশে তারা নিজেদের আঙুলের অগ্রভাগ কামড়ায়। বলে দাও, তোমাদের আক্রোশেই তোমরা মরো।” (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১১৯)
আবার যখন কোনো কঠিন মুহূর্ত বা ত্যাগ স্বীকারের সময় আসে, তখন তারা মৃত্যুভয়ে গুটিয়ে যায়। যেমন বলা হয়েছে, “অতঃপর যখন কোনো সুনির্দিষ্ট সুরা অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যুদ্ধের কথা উল্লেখ থাকে, তখন যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে, তুমি তাদের দেখবে, মৃত্যুভয়ে মূর্ছিত ব্যক্তির মতো তারা তোমার দিকে তাকিয়ে আছে।” (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ২০)
৪. পার্থিব মোহ ও মরীচিকা: মোনাফেকি শূন্য থেকে জন্ম নেয় না। মানুষের বেপরোয়া আকাঙ্ক্ষা এবং নিরাপত্তা ও স্বীকৃতির আদিম প্রবৃত্তিগুলো যখন পথভ্রষ্ট হয়, তখনই কপটতার জন্ম হয়। মোনাফেকরা সবসময় শুধু নগদ লাভ ও স্বার্থের পেছনে ছুটে বেড়ায়। কোনো কাজ থেকে পার্থিব সুবিধা বা ক্ষমতা না পেলে তারা সেখানে পা মাড়ায় না।
কোরআনে বর্ণিত মুনাফিকদের প্রধান স্বভাবসমূহ:
১. মিথ্যা বলা: তারা কথায় কথায় মিথ্যা বলে। তারা আল্লাহ ও তার রাসুলকে বিশ্বাস করে বলে মিথ্যা শপথ করে।
২. প্রতারণা করা: তারা আল্লাহ ও মুমিনদের সাথে প্রতারণা করার চেষ্টা করে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা নিজেদেরই প্রতারিত করে।
৩. ইবাদতে অলসতা: তারা যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন অত্যন্ত অলসভাবে দাঁড়ায় এবং কেবল লোক দেখানোর জন্য ইবাদত করে।
৪. দ্বিধা-দ্বন্দ্বে থাকা: তারা না মুমিনদের দলে থাকে, না কাফেরদের দলে। তারা সবসময় দোদুল্যমান অবস্থায় থাকে।
৫. ফ্যাসাদ সৃষ্টি করা: তারা পৃথিবীতে শান্তি স্থাপনের কথা বললেও গোপনে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
পবিত্র কোরআনের সুরা বাকারার ৮ ও ৯ নম্বর আয়াতে মুনাফিকদের পরিচয় অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
আয়াত ৮: আরবি- وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آمَنَّا بِاللَّهِ وَبِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَمَا هُمْ بِمُؤْمِنِينَ
বাংলা উচ্চারণ: ওয়া মিনান-না-ছি মাই ইয়াকু-লু আ-মান্না- বিল্লা-হি ওয়া বিল ইয়াওমিল আ-খি-রি ওয়ামা- হুম বিমু’মিনী-ন।
বাংলা অর্থ: আর মানুষের মধ্যে এমন কিছু লোক রয়েছে যারা বলে, ‘আমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি ঈমান এনেছি’, অথচ তারা মুমিন নয়।
আয়াত ৯: আরবি- يُخَادِعُونَ اللَّهَ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَمَا يَخْدَعُونَ إِلَّا أَنْفُسَهُمْ وَمَا يَشْعُرُونَ
বাংলা উচ্চারণ: ইউখা-দিউ’নাল্লা-হা ওয়াল্লাযী-না আ-মানু-, ওয়ামা- ইয়াখদাউ’না ইল্লা- আনফুছাহুম ওয়ামা- ইয়াশউ’রুন।
বাংলা অর্থ: তারা আল্লাহ ও ঈমানদারগণকে ধোঁকা দিতে চায়, অথচ তারা কেবল নিজেদেরকেই ধোঁকা দিচ্ছে এবং তারা তা উপলব্ধি করতে পারে না।
নিফাক বা মোনাফেকি দূর করার ইসলামি উপায়:
নিজের ভেতর থেকে মুনাফেকির (নিফাক) ক্ষুদ্রতম অংশও দূর করা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সবসময় নিজেদের ভেতর নিফাক সৃষ্টি হওয়ার ভয়ে থাকতেন। নিচে পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে নিফাক দূর করার কার্যকরী উপায়গুলো আলোচনা করা হলো:
১. তওবা ও ইস্তিগফার: সবচেয়ে প্রথম কাজ হলো নিজের অতীতের ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে লজ্জিত হওয়া এবং আন্তরিকভাবে তওবা করা। প্রতিদিন বেশি বেশি "আস্তাগফিরুল্লাহ" পাঠ করা অন্তরের ময়লা পরিষ্কার করে।
২. তাকবীরে উলার সাথে নামাজ: হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি টানা ৪০ দিন জামাতের সাথে প্রথম তাকবীরের (তাকবীরে উলা) সাথে নামাজ আদায় করবে, আল্লাহ তাকে দুটি মুক্তি দেবেন-জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং নিফাক থেকে মুক্তি। (তিরমিজি: ২৪১)
৩. সত্য বলার অভ্যাস করা: মোনাফিকের প্রধান লক্ষণ হলো মিথ্যা বলা। তাই ছোট-বড় সব ক্ষেত্রে সত্য বলার কঠোর প্রতিজ্ঞা করতে হবে। এমনকি হাসি-ঠাট্টাতেও মিথ্যা পরিহার করা ইমানকে মজবুত করে।
৪. আমানত রক্ষা ও ওয়াদা পূরণ: কারো সাথে কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে তা রক্ষা করুন। কারো ধন-সম্পদ বা গোপন কথা আপনার কাছে থাকলে তা আমানত হিসেবে রক্ষা করুন। এই দুটি গুণ যার ভেতর থাকে, মুনাফেকী তার থেকে দূরে পালায়।
৫. গোপনে নফল ইবাদত ও দান: মোনাফিকরা লোক দেখানোর (রিয়া) জন্য ইবাদত করে। তাই নিফাক দূর করতে গোপনে দান করুন এবং রাতের গভীরে নফল নামাজ (তাহাজ্জুদ) পড়ুন, যা কেবল আল্লাহ আর আপনি জানবেন।
৬. বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করা: সুরা নিসায় বলা হয়েছে, মুনাফিকরা আল্লাহকে খুব অল্পই স্মরণ করে। তাই জিকির, তাসবিহ এবং কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে জিহ্বা ও অন্তরকে সবসময় সজীব রাখা নিফাক দূর করার মহৌষধ।
৭. মহানবীর (সা.) প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি: রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহকে অনুসরণ করা এবং তার প্রতি মহব্বত রাখা অন্তরের নিফাক পুড়িয়ে দেয়। দরুদ পাঠ করা এক্ষেত্রে অত্যন্ত সহায়ক।