ঢাকা , মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ , ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

​নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্য ফেরাতে রাবিতে দিনব্যাপী চিঠি উৎসব

চিঠির খামে পুরোনো দিনের সৃতি খুঁজছে রাবি শিক্ষার্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-১০-১৩ ১৭:১০:১৯
চিঠির খামে পুরোনো দিনের সৃতি খুঁজছে রাবি শিক্ষার্থীরা চিঠির খামে পুরোনো দিনের সৃতি খুঁজছে রাবি শিক্ষার্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক
একটা সময় প্রিয়জনের সাথে মানুষের দূরবর্তী যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল চিঠি। ডাকপিয়নের অপেক্ষায় থাকা, খামের ভাঁজে লুকিয়ে থাকতো প্রিয় মানুষের হাতের লেখা অজানা অনেক কথা। চিঠি ছিল দীর্ঘ অপেক্ষায় অনুভূতি প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম। এখন সময়ের পরিবর্তন ঘটেছে। সেই জায়গা দখল করেছে হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারসহ নানা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। এখন মুহূর্তেই বার্তা পৌঁছে যাচ্ছে। কিন্তু হারিয়ে গেছে সন্তানের থেকে মায়ের, প্রেমিকের থেকে প্রেমিকার চিঠি পাওয়ার সেই চিরচেনা অপেক্ষা। তবে হারিয়ে যাওয়া সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) আয়োজন করা হয়েছে চিঠি উৎসব। সেখানে কলম হাতে নিয়ে কেউ লিখছেন মাকে, কেউ প্রিয়জনকে, আবার কেউবা প্রকাশ করছেন মনের গোপন অনুভূতি।


মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিশ্ব ডাক দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একাডেমিক ভবনের সামনে দীনব্যাপী চিঠি উৎসব এবং স্টাম্প প্রদর্শনীর এমনই এক ব্যাতিক্রমি আয়োজন করেছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের লেখা চিঠি বিনামূল্যেই গন্তব্যে পোঁছে যাচ্ছে। 

চিঠি উৎসবে এসে সময়ের চাকায় পেছনে ফিরে যাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফাহিমা ইসলাম। মাকে চিঠি লিখতে গিয়ে তাঁর মনে হয়েছে, তিনি ফিরে গেছেন নব্বইয়ের দশকে। যে সময়ে প্রিয়জনের চিঠির অপেক্ষায় থাকত মানুষ, আর একটি চিঠি হাতে পেলেই আনন্দে মন ভরে উঠত। 

ফাহিমা ইসলাম বলেন, “এ আয়োজনটি আমার কাছে খুবই ভালো লাগছে। কারণ, আমরা কখনো এভাবে চিঠি লিখিনি। বর্তমানে আমরা আধুনিক যুগে বাস করছি, যেখানে চিঠি লেখার প্রচলন প্রায় হারিয়ে গেছে। আজকের আয়োজনে মাকে চিঠি লিখে মনে হচ্ছে, যেন নব্বইয়ের দশকে ফিরে গেছি। আগের দিনে মানুষ চিঠি লিখত, প্রিয়জনের চিঠির অপেক্ষায় থাকত এবং আবেগঘন মুহূর্তগুলো ভাগ করে নিত। আজ চিঠি লিখে মায়ের সঙ্গে সেই সময়ের আবেগ অনুভব করতে পারছি।”

তিনি আরও বলেন, “কেউ বাবা-মাকে, কেউবা প্রিয়জনকে চিঠি লিখছেন। সব মিলিয়ে এটি একটি সুন্দর মুহূর্ত। আমি মনে করি, এই সংস্কৃতি ফিরে আসা উচিত। অন্তত এ ধরনের দিবস উপলক্ষে হলেও চিঠি লেখার প্রচলন ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।”

শুধু স্মৃতির কাছে ফিরে যাওয়া নয়, চিঠি উৎসব অনেকের কাছে হয়ে উঠেছে মনের অব্যক্ত কথাগুলো প্রকাশের উপলক্ষ। মুখে বলা হয়ে ওঠেনি, এমন অনেক অনুভূতিই জায়গা করে নিচ্ছে কাগজের পাতায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুস সবুরের কাছে চিঠি লেখা তেমনই এক অনুভূতির প্রকাশ।

আব্দুস সবুর বলেন, “আজকের চিঠি উৎসবে চিঠি লিখতে পেরে নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সুপ্ত অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে পারছি, যা কখনো প্রকাশ করা হয়নি। এ ধরনের চিঠি উৎসব মাঝে মাঝে আয়োজন করা দরকার। চিঠি লেখার সংস্কৃতি আমাদের ঐতিহ্য। এটি ধরে রাখা প্রয়োজন।”

তিনি আরও বলেন, “আমরা অনেক সময় মুখে মনের কথা বলতে পারি না। প্রিয়জন বা মনের মানুষের কাছে লিখে অনুভূতি প্রকাশের আলাদা আনন্দ রয়েছে। তাই চিঠি লেখার সংস্কৃতি আমাদের ধরে রাখা উচিত।”

শিক্ষার্থীদের এমন আবেগ ও আগ্রহের মধ্য দিয়ে চিঠি উৎসব যেন নতুন করে মনে করিয়ে দিচ্ছে, প্রযুক্তির দ্রুতগতির যোগাযোগের বাইরেও অনুভূতি প্রকাশের নিজস্ব একটি জগৎ রয়েছে। যেখানে একটি চিঠি শুধু কয়েকটি বাক্যের সমষ্টি নয়; বরং তা হয়ে উঠতে পারে স্মৃতি, ভালোবাসা, অপেক্ষা আর না-বলা কথার একান্ত আশ্রয়।

আয়োজনটির উদ্দেশ্যও মূলত নতুন প্রজন্মকে সেই অনুভূতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া। রাজশাহীর পোস্টমাস্টার জেনারেল আল মাহমুদ বলেন, “একসময় মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল ডাকবিভাগ। সময়ের পরিবর্তনে চিঠি লেখার জায়গা দখল করে নিয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম। চিঠি পাওয়া, খুলে পড়া, জমিয়ে রাখা এবং মাঝেমধ্যে আবার পড়ার যে আনন্দ, তা এখন অনেকটাই হারিয়ে গেছে।”

তিনি বলেন, “আমরা চাই, মানুষ আবার সেই আনন্দ ও আবেগের জায়গায় ফিরে আসুক। চিঠি লেখার মধ্যে যে আনন্দ রয়েছে, তার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিতেই আমাদের এ আয়োজন। আজ শিক্ষার্থীরা আসছেন, ঘুরছেন ও চিঠি লিখছেন। ডাকবিভাগ চিঠিগুলো সংগ্রহ করে প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেবে। যারা চিঠি লিখতে চান, তারা বিনামূল্যে প্রিয়জন বা পছন্দের মানুষের কাছে চিঠি পাঠাতে পারবেন।”

আল মাহমুদ মনে করেন, বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে মুঠোফোনেই এখন মানুষ সহজে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারছে। এতে চিঠি লেখার প্রয়োজনীয়তা কমে গেলেও এর আবেগময় দিকটি নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই অজানা রয়ে গেছে। সেই আনন্দের সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়াই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

চিঠি উৎসবের পাশাপাশি আয়োজন করা হয়েছে ডাকটিকিট প্রদর্শনী। সেখানে বাংলাদেশের ডাকটিকিটের ইতিহাস, ডাকবিভাগের চিঠি প্রকাশের ইতিহাস এবং সংগৃহীত চিঠির ঐতিহাসিক নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে। প্রদর্শনী ঘুরে শিক্ষার্থীরা ডাকটিকিট ও চিঠির ইতিহাস সম্পর্কে জানার সুযোগ পাচ্ছেন।

আয়োজন সম্পর্কে রাজশাহীর পোস্টমাস্টার জেনারেল বলেন, “এ ছাড়া ডাকটিকিট প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের ডাকটিকিটের ইতিহাস জানার সুযোগ রয়েছে। এখানে ডাকবিভাগের চিঠি প্রকাশের ইতিহাস ও সংগৃহীত চিঠির ঐতিহাসিক নিদর্শন তুলে ধরা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা প্রদর্শনী ঘুরে ডাকটিকিট ও চিঠির ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারবেন।”

বর্তমানে চিঠির ব্যবহার কমে এলেও মানুষের অনুভূতি প্রকাশের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চিঠি উৎসব নব্বই দশকে চিঠি লেখার সেই অনুভূতিকেই নতুন করে সামনে এনেছে। কাগজ-কলমে লেখা চিঠিতে শিক্ষার্থীরা খুঁজছেন পুরোনো দিনের স্মৃতি। হয়তো চিঠি পৌঁছাতে ডিজিটাল বার্তার চেয়ে বেশি সময় লাগবে, কিন্তু চিঠির প্রতিটি শব্দে থেকে যাবে লেখকের আন্তরিকতা আর ভালোবাসার ছাপ। চিঠি উৎসবটি যেন হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ারই মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে।



 


নিউজটি আপডেট করেছেন : News Room 3

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ