অ্যানফিল্ডে ম্যানসিটির জন্য কেমন অভ্যর্থনা অপেক্ষা করছে?
অ্যানফিল্ডে ম্যানসিটির জন্য কেমন অভ্যর্থনা অপেক্ষা করছে?
নিজস্ব প্রতিবেদক
২০২৪ সালের ডিসেম্বরের ঘটনা। পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটি লিভারপুলের কাছে ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিল এবং অ্যানফিল্ডের দর্শকরা প্রতিপক্ষ কোচের উদ্দেশ্যে সুর তুলে গাইছিল, ‘আগামীকালেই তোমাকে বরখাস্ত করা হচ্ছে।’ কেউই অবশ্য সত্যিই বিশ্বাস করেনি যে তাকে বরখাস্ত করা হবে। কিন্তু তার দল তখন প্রিমিয়ার লিগে টানা চতুর্থ হারের দিকেই যাচ্ছিল। জবাবে লিভারপুলের দর্শকদের দিকে গার্দিওলা নিজের ছয়টি আঙুল তুলে না ধরে পারেননি। সিটির হয়ে তার জেতা ছয়টি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপাকে নির্দেশ করছিলেন তিনি। এখন প্রিমিয়ার লিগের আনা ১১৫টি আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের অধিকাংশেই একটি স্বাধীন কমিশন ক্লাবটিকে দোষী সাব্যস্ত করার পর অনেকেই হয়তো তাদের এই সাফল্যগুলোর প্রতিটি নিয়েই প্রশ্ন তুলবেন। শুক্রবার সিটির বর্তমান কোচ এনজো মারেস্কা
বলেছেন, ক্লাবের শিরোপাগুলো ‘একেবারেই’ কলঙ্কিত নয়। তবে রোববার তাকে ও তার খেলোয়াড়দের এক নতুন বাস্তবের মুখোমুখি হতে হবে। চলতি মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে সিটি প্রথম ৫টি ম্যাচের ৫টিতেই জিতেছে, আর মারেস্কা যদি এই ১০০% জয়ের ধারা বজায় রাখতে পারেন, তবে তা হবে এক বিশাল অর্জন। তবে আন্দোনি ইরাওলা ও লিভারপুলের জন্য এটি হবে নিজেদের মৌসুমকে নতুন করে চাঙ্গা করার একটি সুযোগ, যা অন্য যেকোনো ম্যাচের চেয়ে একেবারে আলাদা এক প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। রেডস প্রধান কোচ বলেন, ‘এটি একটি রোমাঞ্চকর ম্যাচ। আমরা ঘরের মাঠ অ্যানফিল্ডে লিগ টেবিলের শীর্ষে থাকা সিটির বিপক্ষে খেলছি, যারা তাদের সবকটি ম্যাচই জিতেছে। আমরা
জয়ের জন্যই খেলব, তারাও জয়ের জন্য খেলবে এবং এটি বেশ উন্মুক্ত একটি খেলা হবে। আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। আশা করি আমরা ম্যাচের উচ্চমান বজায় রাখতে পারব।’ লিভারপুলের দায়িত্ব নেওয়ার সময় তিনি এ ধরনের ম্যাচ উপভোগ করতে চেয়েছিলেন কি না জানতে চাইলে ইরাওলা যোগ করেন, ‘হ্যাঁ, আমরা এই ম্যাচটি খেলতেই এখানে এসেছি। আমরা জানি এটি চ্যালেঞ্জিং হবে। তারা খুবই ভালো দল, তবে আমরাও বেশ ভালো।’ ২০১৫ সালের পর এই প্রথম এই হাইভোল্টেজ ম্যাচে টাচলাইনে ইয়ুর্গেন ক্লপ কিংবা পেপ গার্দিওলার কাউকেই দেখা যাবে না। তা সত্ত্বেও এক উত্তপ্ত পরিবেশ অপেক্ষা করছে এবং লিভারপুলের চেয়ারম্যান টম ওয়ার্নার ম্যাচে উপস্থিত থাকবেন। লিভারপুল ২০১৩-১৪ মৌসুমে ব্রেন্ডন রজার্সের অধীনে এবং ২০১৮-১৯ ও ২০২১-২২ মৌসুমে ক্লপের অধীনে ৯৭ ও ৯২ পয়েন্ট পেয়েও সিটির থেকে মাত্র ১ পয়েন্টে পিছিয়ে থেকে প্রিমিয়ার লিগে রানার্স-আপ হয়েছিল। সিটির আপিলের রায়ের অপেক্ষা চলছে। সিটি নিজেদের নির্দোষ দাবি করলেও লিভারপুলের সমর্থকদের একটি অংশ এবং প্রাক্তন খেলোয়াড় ও স্টাফদের মনে ক্ষোভ রয়েই গেছে। রজার্স ও ক্লপের অধীনে লিভারপুলের গোলরক্ষক কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করা জন আখটারবার্গ দ্য অ্যাথলেটিক-কে বলেন, ‘যে স্মৃতি ও সাফল্য আপনি ভাবেন, যেখানে অন্যায়ভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে আপনাকে। আমরা একটি প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জিতেছিলাম (২০১৯-২০ মৌসুমে), কিন্তু খুব সামান্য ব্যবধানে সিটির কাছে তিনবার হেরে না গেলে এটি চারটি শিরোপা হতে পারত।’ ইরাওলা বলেন, ‘সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো সম্ভবত অনিশ্চয়তা। কী হতে চলেছে তা কেউ জানে না। আমাদের কাজ লিভারপুলের দিকে মনোযোগ দেওয়া এবং সেরা ক্লাব ও সেরা দল হয়ে ওঠা। সেটাই আমার মূল চ্যালেঞ্জ।’ ‘বিশ্বের অন্য কোনো স্টেডিয়ামের মতো নয়’ ম্যানচেস্টারের লাল অংশের (ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড) সঙ্গে লিভারপুলের ঐতিহাসিক
প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকলেও, ২০০৮ সালে আবু ধাবি গ্রুপ সিটির মালিকানা নেওয়ার পর থেকে এই দুই দলের লড়াই মাঠে যেমন জমজমাট রূপ নিয়েছে, তেমনই মাঠের বাইরেও বিভিন্ন ঘটনা ঘটিয়েছে। ২০১৮ সালে অ্যানফিল্ডে চ্যাম্পিয়নস লিগের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগের আগে সমর্থকরা সিটির বাসে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারার কারণে উয়েফা লিভারপুলকে ২০,০০০ ইউরো জরিমানা করেছিল। সেবার প্রথমার্ধে মাত্র ১৯ মিনিটের মধ্যে তিনটি গোল করে সিটিকে টুর্নামেন্ট থেকেই ছিটকে দিয়েছিল লিভারপুল। সেই মৌসুমেরই শুরুতে জানুয়ারিতে অ্যানফিল্ডে রোমাঞ্চকর ৪-৩ ব্যবধানের জয়ে সিটির অপরাজিত যাত্রার ইতি টেনেছিলেন ইয়ুর্গেন ক্লপের শিষ্যরা। ২০১৯ সালে গার্দিওলা বলেছিলেন, ‘এই মাঠের এমন কিছু বিশেষত্ব আছে যা বিশ্বের অন্য কোনো স্টেডিয়ামে পাবেন না। তারা একটি গোল করলে পরবর্তী পাঁচ মিনিটে আপনার মনে হবে আপনি আরও চারটি গোল হজম করতে যাচ্ছেন। তখন নিজেকে খুব অসহায় মনে হয় এবং মনে হয় প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা যেন চারপাশ থেকে ঘিরে ধরেছে।’ মার্সিসাইড পুলিশ জানিয়েছে, রোববারের ম্যাচের জন্য উপযুক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে। তবে বিবিসি স্পোর্ট নির্দিষ্ট বিবরণ জানতে চাইলে তারা তা খোলাসা করতে রাজি হয়নি। দলের বাস মাঠে পৌঁছানোর সময় সমর্থকদের বড় জমায়েতের সম্ভাবনা বাড়ছে এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যানফিল্ড রোডে ‘বাস গ্রিটিং’-এর প্রচারণা চালানো হচ্ছে। বাসের জন্য আলাদা কোনো রুট ব্যবহার করা হবে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়, তবে অতীতে অ্যানফিল্ডে এমনটি ঘটেছে। গ্যালারির ভেতরে ব্যানার ও পতাকার সমাহারের জন্য লিভারপুলের বিশেষ খ্যাতি রয়েছে এবং এবারও তার বিশাল প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ম্যাচ শুরুর আগের মিউজিক প্লেলিস্টের দিকে নজর রাখাও রোমাঞ্চকর হবে। সোশ্যাল মিডিয়ার একটি পোস্টে সমর্থকদের নকল টাকার বান্ডিল নিয়ে আসার ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে। প্রস্তুতির বিষয়ে লিভারপুলের অবস্থান একেবারে স্বাভাবিক।
পুলিশ ও নিরাপত্তা বিষয়ক আলোচনাগুলোকে প্রতিটি ম্যাচের আগের নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখছে তারা। তবে আসল সত্যি হলো, এটি এমন এক ম্যাচ ও আবহ তৈরি করতে যাচ্ছে, যার তুলনা অন্য কিছুর সঙ্গেই চলে না।
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স