১০০ কোটি টাকা রাজস্বের টার্গেট ঢাকা জেলা পরিষদের
নিজস্ব প্রতিবেদক
বছরের পর বছর দখল, অব্যবস্থাপনা ও স্থবিরতায় আটকে থাকা সম্পদকে রাজস্বের আওতায় এনে ঢাকা জেলা পরিষদকে নতুন করে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা আগের বছরের দ্বিগুণ করে ১০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। দখলমুক্ত জমি, মার্কেট ও বিভিন্ন স্থাপনা কাজে লাগিয়ে রাজস্ব বাড়ানোর পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যক্রমেও আনা হচ্ছে পরিবর্তন।
ঢাকা জেলা পরিষদের প্রশাসক ইয়াসিন ফেরদৌস মোরাদের দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার পর গত চার মাসে জেলা পরিষদের প্রায় ৭০ শতাংশ বেহাত সম্পত্তি উদ্ধার করা হয়েছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন মার্কেটের বকেয়া রাজস্ব আদায় এবং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা প্রকল্পগুলো সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, রাজস্ব বাড়াতে ইতোমধ্যে বেশকিছু বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে জেলা পরিষদ। এর মধ্যে রয়েছে ১২ বছর বন্ধ থাকা ২০ তলাবিশিষ্ট ঢাকা টাওয়ারের আগের টেন্ডার বাতিল করে নতুন টেন্ডারের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ, কেরানীগঞ্জের জিয়া অডিটোরিয়ামের জায়গায় বহুতল ভবন ও মার্কেট নির্মাণ, জিনজিরা অডিটোরিয়াম সংস্কার, সাভারে তিনটি ও হেমায়েতপুরে একটি অত্যাধুনিক মার্কেট নির্মাণ এবং কাঁটাবনে বহুতল ভবন ও কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ। এ ছাড়া কালীগঞ্জ জেলা পরিষদ মার্কেট থেকে রাজস্ব বাড়ানো এবং বেহাত হওয়া ৪০৭ একর জমি উদ্ধার করে বন্দোবস্ত দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ইয়াসিন ফেরদৌস মোরাদ বলেন, জেলা পরিষদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে চান তিনি। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে মার্কেটগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি আরো দাবি করেন, গত ১৫ বছর ধরে জেলা পরিষদের বিভিন্ন মার্কেট থেকে প্রতি বর্গফুটে ১০ থেকে ১২ টাকা রাজস্ব আদায় করা হতো। বর্তমানে তা বাড়িয়ে ১৫০ টাকা পর্যন্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি মার্কেটগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ বকেয়া আদায় করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
জেলা পরিষদের হিসাবে সাভার উপজেলায় ৯০ একর ২৭ শতাংশ, ধামরাইয়ে ৯৪ একর ৩২ শতাংশ, দোহারে ২৩ একর ৬৩ শতাংশ, নবাবগঞ্জে ৬৮ একর ৪১ শতাংশ, কেরানীগঞ্জে ৩৬ একর ৪৩ শতাংশ এবং ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন এলাকায় ৮৯ একর ২৩ শতাংশ জমি রয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৪০৭ একর জমি গত ১৭ বছরে বেদখলে ছিল বলে জেলা পরিষদ জানিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ জমি ইতোমধ্যে দখলমুক্ত করা হয়েছে বলে দাবি প্রশাসকের।
কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা মৌজায় জিয়া অডিটোরিয়ামের জমিও উদ্ধার করা হয়েছে। এক বছরের জন্য ওই জমি বন্দোবস্ত দিয়ে সাড়ে ৬ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে জেলা পরিষদ। এ জমির একটি অংশ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর নেওয়ায় ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। প্রশাসকের দাবি, আগের কর্মকর্তারা বিষয়টি জানতেন না বলে ওই অর্থ আদায় করা সম্ভব হয়নি।
ঢাকার কাঁটাবনেও জেলা পরিষদের ২৭ শতাংশ জমি রয়েছে। সে জমিতে ডিএনসিসির সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপস অডিটোরিয়াম নির্মাণের জন্য পাইলিং করেছিলেন। বর্তমানে জমিটি দখলমুক্ত করে সেখানে অডিটোরিয়ামসহ বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দখলমুক্ত জমির পাশাপাশি সম্পত্তি সুরক্ষাতেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ইয়াসিন ফেরদৌস মোরাদ বলেন, জেলা পরিষদের সব সম্পত্তি ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে প্রতিটি জায়গার তথ্য সংরক্ষণ করা হবে। এলোমেলো কাগজপত্র গোছানোর পাশাপাশি জমি-সংক্রান্ত মামলাগুলোর নথিও সংরক্ষণ করা হবে। আগামী ৫ থেকে ৬ মাসের মধ্যে অবশিষ্ট ৩০ শতাংশ বেদখল জমি উদ্ধারের লক্ষ্য রয়েছে।
এদিকে গত ৪ মাসে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জেলা পরিষদের উন্নয়নকাজে ৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রশাসক। এডিবি থেকেও ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার কাজ আসে।
ঢাকা টাওয়ার সম্পর্কে মোরাদ বলেন, ১২ বছর ধরে ২০ তলাবিশিষ্ট নির্মাণাধীন ভবনটির নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে। রাজউকের অনুমোদন ছিল না। গায়ের জোরে আওয়ামী লীগের সাবেক প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম কাজ পাইয়ে দিয়েছেন তমা কনস্ট্রাকশনকে। এখন আমরা রাজউকের অনুমতি নিয়েছি। পিডব্লিউডি, এলজিইডি ও জেলা পরিষদ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে সার্ভে শেষে দ্বিতীয় দফায় দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে। কেরানীগঞ্জের জিনজিরা কমিউনিটি সেন্টারের টেন্ডার ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। কদিনের মধ্যেই সেখানে কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে কেরানীগঞ্জের কালীগঞ্জ জেলা পরিষদ মার্কেট থেকে ইতোমধ্যে দেড় কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে সেখানে আবারও রাজস্ব আদায়ের অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছেন জেলা পরিষদ প্রশাসক।
ইয়াসিন ফেরদৌস মোরাদ বলেন, বিগত দুবছরে স্থবির ও বন্ধ থাকা কাজগুলো পুনরায় চালু করা হয়েছে। জনস্বার্থবিরোধী কার্যক্রম বাতিল করে প্রয়োজনীয় প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।