ঢাকা , বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬ , ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গ্রাহক হচ্ছে নিঃস্ব আর মালিকের চলছে বিলাসিতা

লেক আইল্যান্ড ঢাকার ভয়ংকর প্রতারণার ফাঁদে নিঃস্ব গ্রাহক

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৮-০২ ১৮:৫৭:৫৩
লেক আইল্যান্ড ঢাকার ভয়ংকর প্রতারণার ফাঁদে নিঃস্ব গ্রাহক লেক আইল্যান্ড ঢাকার ভয়ংকর প্রতারণার ফাঁদে নিঃস্ব গ্রাহক


নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রতারণা আর বিলাসিতা চলছে সমান তালে, গ্রাহক হচ্ছে নিঃস্ব আর মালিকের চলছে বিলাসিতা, বছরের পর বছর গ্রাহকের থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে মো: মোবারক হেসেনের মালিকানাধীন এমএইচ গ্রুপের লেক আইল্যান্ড, ঢাকা নামক আবাসন কোম্পানি। ঢাকার অদুরে সাভারের বিরুলিয়ায় অবস্থিত এই প্রজেক্ট, প্রাকৃতিক ভাবে উচু জমি হওয়ায় মুখরোচক বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে হাতিয়ে নিচ্ছে গ্রাহকের থেকে শত শত কোটি টাকা।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, স্থানীয় কিছু দূর্বত্তদের সহযোগিতায় জোর করে দখল করছে কৃষি ভুমি, সরকারি খাস জমি, ওয়াকফাকৃত মসজিদের জমি, বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে স্কুল, উচ্ছেদের চেষ্টা চলছে স্থানীয় বাসিন্দাদের, ধ্বংস হচ্ছে প্রকৃতিক পরিবেশ আর বিলীন হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী গোলাপগ্রাম, ঢাকার খুব কাছে হওয়া আর প্রাকৃতিক ভাবে উচু জায়গা হওয়ায় বছরের পর বছর ধরে মুখরোচক বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে সাধারন মানুষ বিনিয়োগ করছে তার সর্বোচ্চ পুজিটুকু। আর সেই বিনিয়োগের টাকায় চলছে কোম্পানির এমডি আর কিছু অসাধু কর্মকর্তার বিলাসিতা, কোম্পানির টাকায় কর্মকর্তাদের ওমরা করানোর পাশাপাশি অফিস থেকে ব্যবহারের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ি দেওয়া হয়। লোভনীয় বিজ্ঞাপন আর উচু জমি দেখিয়ে গত পাচঁ থেকে সাত বছর ধরে আগামী বছর প্রজেক্ট হ্যান্ডেড ওভার দেওয়া হবে চলছে এমন মুখরোচক বিজ্ঞাপন কিন্ত গত পাঁচ সাত বছর ধরে হাতে গোনা ২০-২৫ টা প্লট ডিমার্কেশন ছাড়া কিছুই করেনি কোম্পানি।

একজন ভুক্তভোগী গ্রাহকের সাথে কথা বলে জানা যায়, তিনি ২০১৯ সালে ০৫টি প্লট ক্রয় করেন, তারপর তার মাধ্যমে আরো প্রায় ২০টি প্লট বিক্রয় করে কেম্পানি, তখন কোম্পানি পক্ষ থেকে বলা হয়েছে ২০২২ সালের মধ্যে এ বি সি এবং ডি এই চারটি ব্লক হ্যান্ডেড ওভার করা হবে, এভাবে পর্যায়ক্রমে ২০২৬ সালের মধ্যে সম্পূর্ণ প্রজেক্টে হ্যান্ডেড ওভার করা হবে কিন্ত দৃশ্যমান কিছুই নেই শুধু কিছু প্লটে ব্রিক ওয়াল দিয়ে প্লট সাদৃশ্য ছাড়া কিছুই নেই। গ্রাহকের টাকা হাতিয়ে নিয়ে গড়েছে নিজেদের ভাগ্যের উন্নয়ন, প্রজেক্টের সামনে গড়েছে নিজের জন্য পাঁচ তলা বাংলো আর হরিনের খামার, অভিযোগ রয়েছে খামারে প্রতি বছর হরিন বাচ্চা প্রসব করে কিন্ত মোট হরিন বাড়ে না, কিছু অসাধু বন কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় খেয়ে ফেলে হরিনগুলো।

অভিযোগ রয়েছে, তার এক ছেলে মারা যাওয়ার পরে আরেক ছেলেকে কানাডা পাঠিয়ে সেখানে বিপুল পরিমাণ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এইভাবে চলছে সাধারণ মানুষের টাকা লুটপাট। একের পর এক গোলাপের বাগান ধ্বংস করা হচ্ছ, উঠছে সাইনবোর্ড। নলকূপ উপড়ে ফেলায় পানির অভাবে শুকিয়ে মরছে ফুলের চারা, বন্ধ হচ্ছে জীবিকা। এতে গোলাপ চাষের সঙ্গে জড়িত প্রায় দুই হাজার চাষি পেশা বদলে অন্য পথে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। একটু মুক্ত হাওয়া ও স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে সুযোগ পেলেই রাজধানীবাসী ছুটে যেতেন সেখানে। লাল, নীল, হলুদ, গোলাপি, বেগুনি-বিভিন্ন রং ও আকৃতির গোলাপের চাষ হতো এ গ্রামে। বিভিন্ন জাতের গোলাপের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল মিরিন্ডা গোলাপ, চায়না গোলাপ ও ইরানি গোলাপ। গোলাপের পাশাপাশি চাষ হতো জারবেরা, রজনিগন্ধা, গ্লাডিওলাস, চন্দ্রমল্লিকাসহ নানা ফুল। তবে এসব এখন অতীত হয়ে যাচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, আবাসন কোম্পানিটির নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী আছে। যারা জমি বিক্রিতে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করে এ বাহিনী। চাষিদের দাবি, লেক আইল্যান্ড গ্রুপের এ ক্যাডার বাহিনীর নেতৃত্বে আছেন হাকিম ও বারেক নামে দুই ব্যক্তি। তাদের নেতৃত্বে স্থানীয়দের হুমকি-ধমকি দিয়ে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করা হচ্ছে। গোলাপ গ্রাম মূলত কুমার খোদা ও শিশার চর-এই দুই মৌজায় বিস্তৃত। মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে একটি ছোট নদী, স্থানীয়ভাবে যা শিশাচর নদী নামে পরিচিত। নদীটি তুরাগ নদে গিয়ে মিশেছে। বর্ষাকালে আশপাশের গ্রামের পানি এ নদী দিয়ে তুরাগে গিয়ে পড়ে। আবার শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা সেই নদীর পানি বাগানে ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখন সেটিও অতীত। আবাসন কোম্পানি নদীর এক-তৃতীয়াংশ মাটি ফেলে ভরাট করে ফেলেছে। প্রতিদিনই এক্সক্যাভেটর দিয়ে নদী, জলাশয় ও আশপাশের জমিতে ফেলা হচ্ছে মাটি। প্লট বিক্রি করতে ‘লেক আইল্যান্ড ঢাকা’ কোম্পানিটি ব্রুশিয়ারে যে ম্যাপ তৈরি করেছে, তাতে স্থানীয় খাসজমির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বাড়িও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।


স্থানীয়দের কয়েকজন বলেন, এরা প্রথমে অল্প একটু জমি কিনে এলাকায় প্রবেশ করেছে। পরে কয়েকজন প্রভাবশালীর সহায়তায় পুরো এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছে। গোলাপ চাষের জমি প্রায় সবটাই দখল নিয়েছে। খাসজমিও নিয়েছে। এখন নজর পড়েছে স্থানীয় জনগণের ভিটেমাটির ওপর। তারা বলেন, কোম্পানিটি যে ম্যাপ বানিয়েছে, তাতে এ এলাকার মানুষের বাড়িঘরের জমিও রয়েছে।


স্থানীয় কৃষক মো: আব্বাস জানান, ২০১৩ সালে ৫০ শতাংশ জায়গা কেনার জন্য লেক আইল্যান্ড কোম্পানি ৫ লাখ টাকা বায়না করে। এরপর পেরিয়ে গেছে অনেক বছর। আর কোনো টাকা না দিয়েই দখলে নিয়েছে পুরো জমি। এরপর আব্বাস পাহলোয়ান মামলা করেন; আদালত তার পক্ষে রায় দিলেও এখনো জমি ফেরত দেয়নি কোম্পানিটি। গোলাপ গ্রামে এমন ভুক্তভোগীর সংখ্যা অনেক। অন্তত ১৫ জন ভুক্তভোগীর সঙ্গে আলাপ করেছে, যাদের সবাই জানান, লেক আইল্যান্ড প্রথমে সামান্য কিছু টাকা বায়না করে জমির দখল নেয়। এরপর আর টাকা দেয় না। আবার কেউ জমি দিতে না চাইলে পাশের জমিতে গভীর গর্ত করে দেয়। রাতের আঁধারে বিক্রি করে দেয় জমির মাটি।


একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে জমি ছাড়তে হয় কৃষককে। এমন আরেকজন ভুক্তভোগী কৃষক নাজিমউদ্দিন। তার প্রায় ৪০ শতাংশ জমি দখলে নিয়েছে কোম্পানিটি। ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ঘোরালেও জমি কিংবা টাকা-কোনোটিই বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে না। শুধু নদী বা কৃষকদের ব্যক্তিগত জমিই নয়, সরকারি খাসখতিয়ানভুক্ত কোর্ট অব ওয়ার্ডসের (নবাব স্টেট) সম্পত্তিও দখল করেছে কোম্পানিটি।

স্থানীয় আমিনবাজার ভূমি অফিসের তথ্যানুযায়ী, কোর্ট অব ওয়ার্ডসের ৬.১৫৭৫ একর জমির মধ্যে প্রায় ৪.৯০৭৫ একর বেদখল হয়ে গেছে। এর মধ্যে লেক আইল্যান্ড কোম্পানি সরাসরি ২.১৫ একর জমি দখল করেছে। সেখানে তারা নির্মাণাধীন ভবন, সেমিপাকা অফিসঘর ও টিনশেড পশুপালন কেন্দ্র নির্মাণ করেছে। কিছু অংশে বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ গাছও রোপণ করেছে। সরকারি ওই সম্পত্তির আরও ১.৩০ একর জমি দখলে নিয়েছে মো. শরীফ গং এবং ১.৫০ একর জমি দখলে রেখেছে সালাম গং পরিবার। তারা সেখানে বাউন্ডারি ওয়াল ও টিনের বেড়া নির্মাণ করেছে। অবশিষ্ট প্রায় ১.২০ একর জমি এখন পতিত অবস্থায় রয়েছে।


এক যুগ ধরে গোলাপ চাষের সঙ্গে যুক্ত সাদুল্লাহপুরের কৃষক মো. ইয়াসিন। তবে আবাসন কোম্পানির আগ্রাসনে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। ইয়াসিন বলেন, ‘কোম্পানি এমন অবস্থা তৈরি করছে যে, জমি বেচা ছাড়া উপায় নেই। তারা রাস্তা দিয়ে ক্ষেতে যেতে দেয় না, ফুল তুলতেও বাধা দেয়, এমনকি ক্ষেতের নলকূপও তুলে ফেলেছে। এখন জমি বেচা ছাড়া কিছু করার নেই।’ গত ১ জুন গোলাপ গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এক কৃষক গরুকে ঘাস খাওয়াচ্ছেন। কথা বলতে চাইলে তিনি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমি কথা বলেছি কোম্পানি যদি সেটা জানতে পারে, তাহলে গরু নিয়েও এখানে আসতে দেবে না। তারা অনেক ক্ষমতাশালী। পরিচয় গোপন করে ক্রেতা সেজে কথা হয় লেক আইল্যান্ড কোম্পানির মার্কেটিং বিভাগের হেড সাইফুল ইসলামের সঙ্গে।

জমি ক্রয়ের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্লট অনুযায়ী জমির দাম ৯ থেকে ২০ লাখ টাকা কাঠাপ্রতি। তবে একসঙ্গে বেশি জমি নিলে দাম কিছুটা কম রাখা যাবে। কাগজপত্রে কোনো সমস্যা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাগজপত্রে কোনো সমস্যা নেই।’


কৃষিজমি হওয়ায় আবাসিক প্লট রেজিস্ট্রেশনে সমস্যা হবে কি না জানতে চাইলে কোম্পানির এক প্রতিনিধি বলেন, এখানে আগে গোলাপের চাষ হতো। কৃষি এবং আরবান দুটাই আছে। যে কারণে রেজিস্ট্রেশনে কোনো সমস্যা নেই। যদি সব কৃষি হতো, তাহলে ঝামেলা হতো। এখানে শুধু গ্রাহকের টাকা হাতিয়ে নেয়া নয়, সাথে ধ্বংস করা হচ্ছে আবাদি জমি, প্রতারণা করা হচ্ছে স্থানীয় কৃষক এবং সাধারণ মানুষের সাথে, মিলছে না প্লট কিস্তি দিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর, মালিক পক্ষ বানাচ্ছে বাংলো আর গাড়ি সাধারণ মানুষদের জ্বলছে না হাড়ি। সরকারি আর ওয়াকফাকৃত জমির উপর চলছে আবাসিক বাণিজ্য সাথে নাম মাত্র টাকা দিয়া বায়না করে সেই জমি দেখিয়ে কোম্পানি নিজেদের পকেটে ঢুকাচ্ছে শত শত কোটি টাকা। এমন ভুমি দস্যুরা প্রশাসনের ভাই বা বন্ধু হয়ে যায় টাকার দাপটে।

জানা যায় যে, লেক আইল্যান্ড, ঢাকা কোম্পানির মালিকের দূর্নীতি নতুন কিছু নয় এর আগে তিনি যখন কনকর্ড গ্রুপে চাকুরী করেছেন, সেই কেম্পানির সাথে লেক সিটি কনকর্ড নিয়া দূর্নীতি করেছেন এবং সেই দূর্নীতির মামলা এখনো চলমান। প্রতারণা যার পেশা সে যেখানে যাবে সেখানেই প্রতারণা করবে কখনো মালিক হয়ে আবার কখনো কর্মচারী হয়ে।

এ ব্যপারে জানার জন্য কোম্পানির মালিক জনাব মো: মোবারক হোসেনকে একাদিক বার ফোন দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নি, তবে কোম্পানির এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর জনাব মেহেদী হাসানের সাথে কথা বললে তিনি কিছু বিষয় অস্বীকার করেন তবে গ্রাহকদের প্লট হ্যান্ডেড ওভার এর বিষয়ে করা অভিযোগের ব্যাপারটি তিনি স্বীকার করেন, তিনি বলেন বিভিন্ন প্রতিকুলতার জন্য তারা এখনো গ্রাহকের কাছে প্লট হস্তান্তর শুরু করতে পারেন নি। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন এবং বন বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষন পূর্বক তদন্ত সাপেক্ষে এসব কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহনের অনুরোধ জানাচ্ছি।


 

নিউজটি আপডেট করেছেন : Banglar Alo News Admin

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ