ঢাকা , রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬ , ২৯ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সাজা কমাতে চিফ প্রসিকিউটরের অনুরোধ, যুবলীগ নেতাকে ২ মাসের কারাদণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৪-১২ ২০:১৯:৪২
সাজা কমাতে চিফ প্রসিকিউটরের অনুরোধ, যুবলীগ নেতাকে ২ মাসের কারাদণ্ড সাজা কমাতে চিফ প্রসিকিউটরের অনুরোধ, যুবলীগ নেতাকে ২ মাসের কারাদণ্ড
নিজস্ব প্রতিবেদক
জুলাই গণহত্যার দায়ে হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘিরে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে বলে দাবি করা সাবেক যুবলীগ নেতা এম এইচ বাবু পাটোয়ারিকে আদালত অবমাননার দায়ে দুই মাসের সাজা দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল। তিনি সন্ত্রাসের দায়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ছিলেন।

রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এই রায় দেন। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

রায়ের আগে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হয়েও নজীরবিহীনভাবে আসামির পক্ষ নিয়ে বারবার ট্রাইব্যুনালকে সাজা কম দিতে অনুরোধ করেন। ট্রাইব্যুনাল প্রথমে বলে, আসামির অপরাধ অত্যন্ত গুরুতর। এ ধরনের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সাজা না দিলে ভুল বার্তা যাবে। আমরা চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি যে, আমরা সম্পূর্ণ স্বচ্ছ আছি এবং আমাদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে দেশি-বিদেশি কেউ প্রশ্ন তুলতে পারবেন না। যেহেতু এই পোস্টটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে, তাই তাকে ন্যূনতম সাজা হওয়া উচিত যাতে অন্যরা সতর্ক হয়। আমরা ১ বছর কারাদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু আপাদের অনুরোধ ও পারিপাশ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে তিন মাসের কারাদণ্ড দিলাম। এরপর চিফ প্রসিকিউটর আবার সাজা কমানেরা অনুরোধ করেন। পরে ট্রাইব্যুনাল পুনরায় ১ মাস কমিয়ে ২মাসের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। চিফ প্রসিকিউটর এভাবে আসামি পক্ষ নিয়ে বারবার সাজা কমানোর অনুরোধ উপস্থিত সবাইকে হতবাক করেছে। প্রশ্ন ওঠেছে রাষ্ট্রের নিযুক্ত আইনজীবী হয়ে তিনি এভাবে আসামির পক্ষ নিতে পারেন কিনা?

আসামির জবানবন্দি ও শুনানি
এদিন বিকেল সাড়ে ৩টার পর এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। প্রথমেই বাবুর স্ত্রী ইসমাত আরার জবানবন্দি নেওয়া হয়। তিনি এ ঘটনার জন্য নিজেকে অপরাধী দাবি করে ট্রাইব্যুনালের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চান। পরে নেওয়া হয় আসামির জবানবন্দি।

জবানবন্দিতে আসামি পাটোয়ারী বাবু নিজের ফেসবুক পেজ থেকে দেওয়া বিতর্কিত পোস্টটি পড়ে শোনান। এতে তিনি পোস্টটি হবহু বলেন, তিনি দেশরত্ন শেখ হাসিনাকে সাজানো মামলায় মৃত্যুদণ্ড দিতে বিভিন্ন দেশ ও গোষ্ঠীর নিকট থেকে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা খেয়েছে আসিফ নজরুল, শিশির মনির, তাজুল ইসলাম, বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদার। ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব করে কম্পিউটারের হার্ডড্রাইভ পরিবর্তন করে ইতিমধ্যে অবৈধ ক্যাঙ্গারো কোর্টের অবৈধ প্রসিকিউটর তাজুল পালিয়েছে! যেকোনো সময় অন্যরাও পালিয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।’তিনি আরও লেখেন, 'ভদ্রবেশী উচ্চশিক্ষিত এই সকল ধুরন্ধর জালিয়াতচক্র যদি বিনা বিচারে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়, তার দায়-দায়িত্ব সম্পূর্ণ বর্তমান সরকারকে নিতে হবে। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী কেউ আইন ও বিচারের ঊর্ধ্বে নয়। গত ২০ মাস অবৈধ সরকারের অবৈধ আইন উপদেষ্টা মিথ্যাবাদী আসিফ নজরুল, আইনজীবী শিশির মনির, প্রতারক অবৈধ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম ও বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদার এরা বাংলাদেশের বিচার আইন আদালত নিয়ে যে তামাশা করেছে অবশ্যই তারা শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।

পোস্টটি পড়ার পর ট্রাইব্যুনাল বলে, আপনি ১২ হাজার কোটি টাকা কথা লিখতে পারবেন? তাকে খাতা কলম দেওয়া হয় লেখার জন্য। সে কথা লিখলে আদালত বলে অংকে লিখেন। পরে তিনি লিখতে পারেননি। এরপর ১২ হাজার লিখতে বললে, ১ লক্ষ ২০ হাজার লিখেন।

আসামির জবানবন্দি শেষে এ মামলার বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার বক্তব্য শোনে ট্রাইব্যুনাল। তিনি জানান, আদালতের আদেশ অনুযায়ী গত ৭ এপ্রিল তারা মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় (শেনপাড়া) বাবুর বাসায় অভিযান চালান। তবে, সেখানে তাকে না পেয়ে তার স্ত্রীর কাছ থেকে মোবাইল ফোনটি জব্দ করা হয়। ডিবি ও মিরপুর মডেল থানা পুলিশের সহযোগিতায় পরিচালিত এই অভিযানের ধারাবাহিকতায় ৮ এপ্রিল বাবুর স্ত্রী ইসমাত জেরিনকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছিল। তখন তিনি চার দিনের মধ্যে তার স্বামীকে আদালতে উপস্থিত করার অঙ্গীকার করেছিলেন।

প্রসিকিউটর জোহা আরো জানান, জব্দ করা মোবাইল ফোনটি বর্তমানে ডিবি হেফাজতে রয়েছে, তবে তার ফেসবুক আইডিটি এখনও সক্রিয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা-কর্মীরা সাইবার স্কোয়াড নামে একটি গোপন গ্রুপ পরিচালনা করেন, যার অন্যতম সক্রিয় সদস্য ছিলেন দণ্ডিত বাবু। এই গ্রুপের মূল কাজই হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যমূলক অপপ্রচার চালানো।

শুনানিতে আসামিপক্ষের আইনজীবী ছিলেন নোমান হোসেন তালুকদার। প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তার সঙ্গে ছিলেন প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম, ফারুক আহাম্মদ, আবদুস সাত্তার পালোয়ান ও মঈনুল করিমসহ অন্যরা।

এ সময় আসামি দাবি করেন, অন্য একটি আইডি থেকে লেখাটি কপি করে তিনি নিজের অ্যাকাউন্টে শেয়ার করেছিলেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের উসকানিমূলক পোস্ট বা বক্তব্য দেবেন না বলে অঙ্গীকার করে তিনি ট্রাইব্যুনালের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এসময় যাচাই করলে দেখা যায় তিনি কপি করে পোস্ট করেননি। নিজের আইডিতে ৪ এপ্রিল পোস্ট করেছেন। যেখান থেকে কপি করার কথা বলেছেন তা একদিন পরে ৪ এপ্রিল পোস্ট করা হয়। তখন ট্রাইব্যুনাল বলে, আপনি এখনো মিথ্যা বলছেন। এরপর্ রায় ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল।

মামলার প্রেক্ষাপট
গত ৭ এপ্রিল আদালত অবমাননার অভিযোগ আমলে নিয়ে ট্রাইব্যুনাল বাবুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। রোববার দুপুরে তিনি সস্ত্রীক আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।



 

নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ