ঢাকা , শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬ , ২৭ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

জ্বালানি তেলের জন্য থমকে গেছে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের জীবন-জীবিকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৪-১১ ০১:৪৫:৪৭
জ্বালানি তেলের জন্য থমকে গেছে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের জীবন-জীবিকা জ্বালানি তেলের জন্য থমকে গেছে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের জীবন-জীবিকা
 
আনোয়ার সাঈদ তিতু, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
 
‘১৭ বছর হলো মোটরসাইকেলে ভাড়া মারি। আগে দিনে ৯০০ থেকে এক হাজার আয় হইছে। সেই টাকায় সংসার চালাইছি। কিন্তু তেল সংকটে এখন মোটরসাইকেল বন্ধ। হামার জাগাত অটো ঢুকছে। কিছু করার নাই। তেল না পাইলে গাড়ি কী দিয়ে চলবে? এখন তেলও নাই, হামাগো পেটে ভাতও নাই!’
 
কথাগুলো বলছিলেন কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার শুলকুর বাজার এলাকার মোটরসাইকেল চালক মোঃ আলম মিয়া। আগে এই বাজারে এলে একটুও বিশ্রাম নেওয়ার সময় পেতেন না তিনি। যাত্রীদের নিয়ে গন্তব্যে ছুটতেন চরের রাস্তা ধরে। কিন্তু জ্বালানি তেল (পেট্রোল বা অকটেন) না পেয়ে তাঁর মোটরসাইকেল বন্ধ। সেই সঙ্গে বন্ধ রোজগার। আলমের মতো কয়েকশ মোটরসাইকেল চালক এখন দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন।
 
কুড়িগ্রাম জেলার নদীবিধৌত এলাকাগুলো অধিকাংশ চর-দ্বীপচর। এসব দুর্গম চরাঞ্চলে যানবাহন বলতে শুধু মোটরসাইকেল আর ঘোড়ার গাড়ি। স্থানভেদে কোথাও শুধু মোটরসাইকেল যাতায়াত করতে পারে, আবার কোথাও ঘোড়ার গাড়ি। তেল না পেয়ে এখন মোটরসাইকেল বন্ধ।
 
গতকাল বৃহস্পতিবার কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার কালীগঞ্জ, কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার শুলকুর বাজার, পাঁছগাছি, নাগেশ্বরীর উপজেলার চর নারায়ণপুরসহ বেশ কয়েকটি চরে দেখা যায় হাতেগোনা কয়েকজন মোটরসাইকেল নিয়ে যাত্রীর অপেক্ষায় আছেন। তারা যাত্রীদের কাছে বেশি ভাড়া চাচ্ছেন। এ কারণে তেমন যাত্রীও মিলছে না।
 
চালকদের অভিযোগ, পেট্রোল পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কখনও ভোর থেকে বিকেল, কখনও পুরো দিন লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই মোটরসাইকেল চালানো ছেড়ে দিচ্ছেন। কেউ দিনমজুর হিসেবে কাজ করছেন, কেউ যুক্ত হচ্ছেন অস্থায়ী অন্য পেশায়।
 
কুড়িগ্রাম জেলার সদর উপজেলার পাঁচগাছী ইউনিয়নের জালালের মোড় ও শুলকুর বাজার থেকে উলিপুর উপজেলার কালীগঞ্জ পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সড়কে প্রতিদিন শত শত মোটরসাইকেল যাত্রী পরিবহন করে। অন্য কোনো যানবাহন চলাচল করতে না পারায় এই পথেই নির্ভরশীল ছিল স্থানীয় মানুষ। দূরত্ব অনুযায়ী যাত্রীদের কাছ থেকে ৫০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নিয়ে দিনে একজন চালক গড়ে ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা আয় করতেন। এর মধ্যে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা খরচ হতো জ্বালানির পেছনে। বাকি অর্থ দিয়েই চলত তাদের সংসার। সকাল হলেই মোড়ে মোড়ে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে থাকতেন চালকরা। কিন্তু এখন সব বন্ধ।
 
কালীগঞ্জের মোটরসাইকেল চালক মোঃ আবু হানিফ বলেন, ‘মোটরসাইকেলই ছিল একমাত্র ভরসা। গত পাঁচ বছর হলো এই আয় দিয়ে আমার চারজনের সংসার চলছে। এখন তেল নেই, আয়ও নেই।’
 
কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার চর নারায়ণপুরের চালক মোঃ মাঈদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার পরিবারে সাতজন সদস্য। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ গাড়ি চালানোর রোজগার দিয়ে চলে। আমি আজ ১২ দিন ধরে বসে আছি। ধার-দেনা করে চলছি। অন্য কাজ যে করব পরিবার ছেড়ে যাওয়ার সে উপায়ও নেই।’
 
কুড়িগ্রাম জেলা সদর উপজেলার শুলকুর বাজার হয়ে উলিপুর উপজেলার কালীগঞ্জে যাতায়াত করা নিয়মিত যাত্রী কলেজপড়ুয়া মোঃ আরিফ হোসেন বলেন, ‘আমি মোটরসাইকেলে কলেজে যাতায়াত করতাম। দুজন উঠলে ৮০ টাকা দিতে হতো। আমার ভাগে ৪০ টাকা পড়ত। তেল সংকটে মোটরসাইকেল চলাচল একেবারে কমে গেছে। যে চার-পাঁচটি মোটরসাইকেল চলে, তারা এখন জনপ্রতি ১৫০ টাকা করে ভাড়া চাচ্ছেন।’
 
কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোঃ বাবলু মিয়া বলেন, ‘আমার ইউনিয়নটি নদীদ্বারা বিছিন্ন। এ অঞ্চলে রাস্তা ভালো না থাকায় মোটরসাইকেলে করে যাতায়াত করে মানুষ। জ্বালানি সংকটের কারণে শত শত মোটরসাইকেল চালকের জীবিকা থমকে গেছে। অনেকে চালাতে না পেরে মানবেতর দিন পার করছে।’
 
স্থানীয় প্রশাসনের তথ্যমতে, কুড়িগ্রামে ২২টি ফিলিং স্টেশনে দৈনিক চাহিদা রয়েছে ডিজেল এক লাখ ২৬ হাজার ৬০৫ লিটার, অকটেন ৩১ হাজার ৭০ লিটার, পেট্রোল ৬৮ হাজার ৫২৫ লিটার এবং এলপিজি ৮২৫ লিটার। এর বিপরীতে জ্বালানি তেল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তিন ভাগের এক ভাগ সরবরাহ করছে।
 
 
 
 
 

নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ