পর্যটকদের আকর্ষণ: কুলাউড়ার মুঘল আমলের জীবন্ত নবাববাড়ি
পর্যটকদের আকর্ষণ: কুলাউড়ার মুঘল আমলের জীবন্ত নবাববাড়ি
এস. এম. জালাল উদদীন, মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধিঃ
মৌলভীবাজার জেলার উপজেলার ঐতিহ্যবাহী আজও ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসনকাল, এমনকি স্বাধীনতা- উত্তর সময় পর্যন্ত এই নবাববাড়ি শুধু একটি স্থাপনা নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক।
ইতিহাসের শেকড়: মুঘল আমল থেকে জমিদারির সূচনাঃ
মোগল সম্রাট -এর আমলে ইরান থেকে আগত শিয়া ধর্মপ্রচারক সাকি সালামত খান ও তাঁর বংশধররা এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। তাঁর পুত্র ইসমাইল খান পৃথ্বীমপাশায় ধর্ম প্রচার করেন এবং তাঁর নামেই এখানে একটি দিঘির নামকরণ করা হয়। পরবর্তীতে তাঁর বংশধরদের মাধ্যমে এই এলাকায় সামাজিক ও ধর্মীয় প্রভাব বিস্তার ঘটে। ব্রিটিশ আমলে মোহাম্মদ আলী খানের অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁর পুত্র গাওস আলী খানকে বিপুল পরিমাণ জমি দান করা হয়, যার মাধ্যমে এখানে জমিদারি প্রথার প্রতিষ্ঠা ঘটে।
১৮৫৭ সাবিদ্রোহ ও রাজনীতির ইতিহাসঃলের -এর সময় গাওস আলী খান গোপনে বিদ্রোহীদের সহায়তা করেন। যদিও ব্রিটিশরা তাঁকে গ্রেফতার করে, প্রমাণের অভাবে পরে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এছাড়া তাঁর উত্তরসূরিরা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, কৃষি উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
স্থাপত্য ও ঐতিহ্যের নিদর্শনঃ
পৃথ্বীমপাশা নবাববাড়ি শুধু একটি বাসস্থান নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ঐতিহাসিক কমপ্লেক্স। এখানে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন প্রাসাদ, নকশা খচিত ইমামবাড়া, প্রাচীন মসজিদ, সুবিশাল দীঘি ও শানবাঁধানো ঘাট, ঐতিহাসিক মাজারসমূহ
এই স্থাপনাগুলোতে মুঘল ও উপমহাদেশীয় স্থাপত্যশৈলীর অনন্য সংমিশ্রণ দেখা যায়।
ঐতিহাসিক ঘড়িঘর ও নগর উন্নয়নঃ
নবাব ১৮৭৪ সালে সুরমা নদীর তীরে একটি ঐতিহাসিক ঘড়িঘর নির্মাণ করেন, যা আজও নামে পরিচিত। এই ঘড়িঘরটি তৎকালীন সময়ে শহরের সময় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। তিনি শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জনকল্যাণমূলক নানা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সিলেট অঞ্চলের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নে অবদানঃ
নবাব আলী আমজাদ খান ১৯০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন মৌলভীবাজার আলী আমজাদ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, পৃথ্বীমপাশা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, নারী শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার প্রসারে তাঁর অবদান আজও স্মরণীয়।
উত্তরসূরি ও আধুনিক সময়ঃ
বর্তমানে এই ঐতিহ্যবাহী নবাব এস্টেটের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন , যিনি একাধিকবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং এলাকায় জনকল্যাণমূলক কাজ করে যাচ্ছেন।
এই নবাববাড়িতে অতীতে বহু খ্যাতিমান ব্যক্তির আগমন ঘটেছে।
পর্যটনের সম্ভাবনাঃ
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং জীবন্ত ঐতিহ্যের কারণে পৃথ্বীমপাশা নবাববাড়ি এখন পর্যটকদের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্য। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এখানে এসে ইতিহাসের স্পর্শ অনুভব করছেন। কুলাউড়ার পৃথ্বীমপাশা নবাববাড়ি শুধু একটি স্থাপনা নয়, এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যের এক অনন্য নিদর্শন। যথাযথ সংরক্ষণ ও পর্যটন উন্নয়নের মাধ্যমে এটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স