ঢাকা , বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০২৬ , ৫ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

গৌরীপুরে গরিবের চাল সচ্ছলদের কবজায়, ‘ঘরে লয়, দুয়ারে বেচে’

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০৩-১৯ ১৩:৩৪:৩৮
গৌরীপুরে গরিবের চাল সচ্ছলদের কবজায়,  ‘ঘরে লয়, দুয়ারে বেচে’ গৌরীপুরে গরিবের চাল সচ্ছলদের কবজায়, ‘ঘরে লয়, দুয়ারে বেচে’
গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি :

ময়মনসিংহের গৌরীপুরে পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে অতি দরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ভিজিএফ (ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং) এর চাল নিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও হরিলুটের অভিযোগ উঠেছে। দুস্থদের জন্য সরকারের দেওয়া এই উপহারের চাল ইউনিয়ন পরিষদের ফটকেই নামমাত্র মূল্যে বিক্রি করে দিচ্ছে একটি চক্র। স্থানীয়দের ভাষায়—চাল ‘ঘরে লয়, আর দুয়ারেই বেচে’। অভিযোগ উঠেছে, প্রকৃত অভাবীদের বদলে সচ্ছল ব্যক্তিরা কার্ড পাওয়ায় এবং শক্তিশালী সিন্ডিকেটের প্রভাবে গরিবের এই হক নিয়ে এমন বাণিজ্য চলছে।


বুধবার (১৮ মার্চ) উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে ভিজিএফ চাল বিতরণ কার্যক্রমে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়।
অচিন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদের সামনে দেখা যায়, ৩-৪ জনের একটি সিন্ডিকেট প্রকাশ্যেই চাল কিনছে।  হাবিবুর রহমান নামের এক ব্যক্তি জানান, তিনি কার্ড প্রতি ২২০ টাকা দরে চাল কিনছেন। ওজনে কম হওয়ার অজুহাতে তিনি চালের দাম কমিয়ে দিচ্ছেন। আগে ১০ কেজি হতো এখন তো ৮-৯ কেজি হয়। মোবারকপুরের সাইদুল ইসলাম বলেন, ঘরে লয়, দুয়ারে (দরজায়) এসে বেচে ২-৩শ টাকা নিয়ে যায়। অন্যদিকে সহনাটী ইউনিয়নে চাল কেনার অভিযোগে ইউনিয়ন ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বুরহানকে স্থানীয় বিএনপি নেতারা নিষেধ করলেও তিনি তা উপেক্ষা করেন। পরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে তিনি চাল কেনা বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, শাহগঞ্জের রহিমা খাতুন ও নুরজাহানের মতো অনেকেই চাল বিক্রি করে দিচ্ছেন। তাঁদের ভাষ্য, চালের মান মোটা হওয়ায় এবং দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার ঝক্কি এড়াতে তাঁরা ২৫০ টাকার কার্ড ২০০ টাকায় বিক্রি করছেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ফজলুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যারা উপোস থাকে তারা চাল পায় না। যাদের পাকা দালান আছে, তারাই রাজনৈতিক প্রভাবে কার্ড পেয়েছে। তারা চাল নিয়ে কী করবে? তাই বিক্রি করে দিচ্ছে।’
মইলাকান্দা ইউনিয়নের চাল ক্রেতা ফজলুল হক জানান, প্রতিজনের চাল ২৫০টাকা (প্রতিকেজি চাল ২৫টাকা) দামে ক্রয় করছেন। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ৩০-৪০জনের চাল কিনেছেন। তিনি নিজেও প্রতিবন্ধী। তাই এ ব্যবসা করছেন। কাউরাট গ্রামের আছিয়া খাতুন জানান, আমি চাল উত্তোলন করেছি। ৪জনের সংসার। তাই আরও ১২জনের চাল কিনেছি।

একাধিক সূত্র জানায়, ইউনিয়ন পরিষদের নামে বরাদ্দকৃত চালের কার্ড বিতরণ করেছেন দলীয় লোকজন। সিংহভাগ বরাদ্দের কার্ড তারা নিয়ে গেছেন। অপর একটি সূত্র জানায়, গরীরের এ চাল ক্রয়ে অসাধু একাধিক মিল মালিকও জড়িত রয়েছেন। তাদের হাত ধরে, এ চাল আবারও ঢুকছে খাদ্য গুদামে। অভিযোগ উঠেছে, এই স্বল্পমূল্যে কেনা চাল অসাধু মিলমালিকদের হাত ঘুরে আবারও সরকারি খাদ্য গুদামে ঢোকার প্রক্রিয়া চলছে। অথচ সরকারি হিসাবে এই চালের ক্রয়মূল্য প্রতি কেজি ৫০ টাকা, যা বাইরে বিক্রি হচ্ছে মাত্র ২০-২৫ টাকায়।

ইউনিয়ন পরিষদের সামনেই চাল ক্রয় প্রসঙ্গে অচিন্তপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জায়েদুর রহমান জানান, আমি বারবার বলার পরেও তাদেরকে সরানো যাচ্ছে না। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলাল উদ্দিন নিশ্চিত করেন, ঈদুল ফিতর উপলক্ষে উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে ২৫ হাজার ৮১১টি পরিবারের জন্য ১০ কেজি করে মোট ২৫৮.১১০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফিয়া আমীন পাপ্পা বলেন, ‘ঘটনা জানার পরপরই সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুনন্দা সরকার প্রমার নেতৃত্বে পুলিশসহ একটি টিম ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
ওবায়দুর রহমান

নিউজটি আপডেট করেছেন : [email protected]

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ