ঢাকা , মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬ , ১৫ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হারিয়ে যাওয়া একুশে ফেব্রুয়ারি

নিজস্ব প্রতিবেদক
আপডেট সময় : ২০২৬-০২-২১ ১৫:২৭:১৯
হারিয়ে যাওয়া একুশে ফেব্রুয়ারি হারিয়ে যাওয়া একুশে ফেব্রুয়ারি
নিজস্ব প্রতিবেদক
এখন যে একুশে দেখি, বিশেষ করে গত দশক দুয়েক থেকে—তা আমরা, একুশের প্রজন্ম যে ঐতিহ্যবাহী একুশে পালন করে এসেছি ছোটবেলা থেকেই, তা থেকে বহু যোজন দূর মনে হয়।

 
আমার জন্মের মাস দেড়েকের ভেতরই ঘটে, ঢাকেশ্বরীতে আমাদের বাসারই নিকট, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারির সেই বিষাদময় ঘটনা। ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের কবল থেকে প্রায় সদ্যই মুক্ত হওয়া, নিজেরই স্বাধীন দেশে, নিজের মুখের ভাষার মর্যাদা রক্ষার দাবিতে মিছিল করে নিজেদেরই গণপ্রতিনিধিদের গণপরিষদে গিয়ে তার কথা বলতে যাওয়ার যাত্রায়, পরিষদের অদূরেই পৌঁছে যাওয়া নিরস্ত্র নাগরিকের ওপর নিজেরই দেশের শান্তিরক্ষা বাহিনীর গুলিতে অশান্তির পথ খুলে দেওয়া রক্তপাতে নিরস্ত্র দেশপ্রেমিকদের শহীদ হওয়ার ঘটনা।

 
সক্রিয় ভাষাসৈনিক তরুণ বাবা-মায়ের নবজাত সন্তান আমি জীবনের সেই শুরুতেই শ্বাস নিই ২১ ফেব্রুয়ারির সেই গোলাগুলির বারুদের ঘ্রাণমাখা বাতাসেই, বলা চলে। আমার রক্ত-মাংস, হৃদয়-মন-মস্তিষ্কে সেই একুশের চেতনা মিশে আছে সহজাতই।

বাল্যকাল থেকেই ভাবগম্ভীরভাবে, বিনম্র স্মরণে, কৃতজ্ঞতায় একুশে পালনের আচার-অনুষ্ঠানগুলোয় যোগ দিয়েছি। খালি পায়ে ভোরে আজিমপুর কবরস্থানে খোদার দেওয়া ভাষার মর্যাদা রক্ষার অধিকার আদায়ে প্রাণ দেওয়া পিতৃতুল্য শহীদদের জিয়ারতে গিয়ে, দোয়া-দরুদ পড়ে, অশ্রুসিক্ত নয়নে বেরিয়ে এসে হেঁটে গিয়েছি সবাই শহীদদের শহীদ হওয়ার স্মৃতিমণ্ডিত জায়গাটিতে, যার চিহ্ন ধরে রাখার জন্য বেঁচে যাওয়া ভাষা সংগ্রামী বাবা-চাচারা একটি মিনার তুলেছিলেন।

বলা হতো,শহীদ মিনার।’ উদ্দেশ্য ছিল—ইতিহাসে প্রথম মিনারের গড়ন যিনি, নবীজির মামা ও ‘সাহাবি’ আবু ওয়াক্কাস (রা.), উচ্চতর ধর্মীয় মূল্যবোধ শেখাতে বাংলাদেশের উপকূল ঘেঁষে অবশেষে চীনের ক্যান্টনে গিয়ে সমুদ্রতীরে সুউচ্চ মিনার গড়ে তাতে আলোর মশাল জ্বালিয়ে অন্ধকার সমুদ্রের পথভোলা নাবিকদের পথের দিশা দিতেন; আর তার ওপর থেকে আজান দিয়ে লোককে ‘ফালাহ’, তথা মঙ্গলের দিকে ডাক দিয়ে জানান দিতেন যেভাবে, হৃদয়-মনের আঁধার দূর করতে—সেভাবেই নিরস্ত্র সেই শহীদ ভাষাসৈনিকদের স্মৃতির চিহ্ন সেই কাঁচা মিনারটিও জাতিকে পথ দেখাবে, মঙ্গলময় মূল্যবোধে উজ্জীবিত করে ন্যায্য অধিকার রক্ষার প্রেরণা জোগাবে, জাগরূক রাখবে।

এভাবেই বাংলার এই জাতীয় পার্বণের সূচনা হয়। ভাষাসৈনিক মা-বাবার কাছ থেকে, তাদের সহযোদ্ধা ‘চাচা’দের কাছে যা শুনেছি, তা থেকে জানি।

আজকের একুশে আড়ম্বরপূর্ণ হৈ-হট্টগোল, পদক বিতরণ, তা অর্জনের প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নামে যুব-যুবতীর অশ্লীল মিলনমেলা—এসবই চোখে পড়ে। সে সময়ের সেই আন্তরিক, ভাবগম্ভীর ও শোকাহত হৃদয়ের বেদনা আর অধিকার আদায় ও রক্ষার প্রত্যয়ের কিছুই দেখি না। হয়তো আছে—হলে এত কম, যে অন্যসব অবান্তরের ভিড়ে তা চোখে পড়ে না।

যে ঐতিহ্যের প্রকাশ ও ফল ছিল একুশের পার্বণ, পার্বণের সে প্রাণধারাহীন কলস মাত্র রয়ে গেছে মনে হয়। এই কলসে অনেক রঙ ঢেলে মাখিয়ে উৎসব করা হচ্ছে। আমাদের শৈশব, কৈশোর, যৌবনের ঐতিহ্যমণ্ডিত একুশে যেন হারিয়ে গেছে। তার পুনরুজ্জীবন দরকার, জাতির স্বাধীন এবং মর্যাদাবান হিসেবে বেঁচে থাকার স্বার্থেই।



 

নিউজটি আপডেট করেছেন : nafizhasan889900@gmail.com

কমেন্ট বক্স

এ জাতীয় আরো খবর

সর্বশেষ সংবাদ