গাইবান্ধা প্রতিনিধি
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, 'আমরা কারো রক্তচক্ষুকে ভয় করি না, ভয় করি শুধু আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে। বাংলাদেশে কোনো আধিপত্যবাদের ছায়া আমরা দেখতে চাই না। তবে বিশ্বের সব সভ্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাই এবং প্রতিবেশীদের প্রতিবেশী হিসেবেই দেখতে চাই। আমরা কারো ওপর খবরদারি করতে চাই না, আবার ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশের ওপর কেউ খবরদারি করুক সেটাও মেনে নেব না।'
শনিবার (২৪ জানুয়ারি) গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার এস এম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে দশ দলীয় ঐক্য জোট আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, কাউকে ভাতার লোভ দেখিয়ে ভোট চাইবো না। আমরা কাজ দিয়ে দেশের বেকারত্ব দূর করতে চাই। জামায়াত ক্ষমতায় গেলে বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য সম্মানজনক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।
জামায়াত আমির বলেন, জামায়াতের নেতাকর্মীরা দীর্ঘদিন জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেও দেশেই ছিল। দেশ ছেড়ে কোথাও মুচলেকা দিয়ে পালিয়ে যায়নি। যে দলের নেতারা দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবাসে, তারা দেশ ছেড়ে পালায় না। জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা আপনাদের ভালোবাসায় আবদ্ধ। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমরা আপনাদের সঙ্গেই থাকতে চাই।
কৃষি খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘কৃষিকে আর পুরোনো ধাঁচে চালানো হবে না। আধুনিকায়ন, আধুনিক লজিস্টিক ব্যবস্থা ও সংরক্ষণ সুবিধা নিশ্চিত করে কৃষকের হাতে ন্যায্যমূল্য তুলে দেওয়া হবে। উৎপাদনের পর কৃষিপণ্যের সঠিক মূল্য পাওয়া যায় না, সংরক্ষণের অভাবে অনেক সময় ফসল নষ্ট হয়ে যায়। এসব সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে ফসল ও সবজির ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা হবে। সারাদেশে পর্যায়ক্রমে ফসল ও সবজি সংরক্ষণাগার গড়ে তোলা হবে, যাতে সারা বছর মানুষ ন্যায্য দামে কৃষিপণ্য পায়।'
চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, জামায়াত নির্বাচিত হলে যারা চাঁদাবাজিতে জড়িত, তাদের কাজ দিয়ে সম্মানিত করা হবে। তাদের আর চাঁদাবাজি করতে হবে না। আমরা কাউকে ভাতা নয়, কাজ দেব। মানুষকে সম্পদে পরিণত করাই আমাদের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, ‘ভয় পেও না চাঁদাবাজ। তোমরাও এই সমাজের মানুষ। তোমাদের সম্মানজনক কাজ দেব। সমাজে মাথা উঁচু করে চলতে পারবে। তোমার মাকে কেউ আর চাঁদাবাজের মা বলবে না, তোমার স্ত্রীকেও কেউ চাঁদাবাজের স্ত্রী বলে খোটা দেবে না।’
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে বিচার অর্থের বিনিময়ে কেনা যায় না, যেখানে ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবার অধিকার সমান হবে এবং ধর্মে ধর্মে কোনো সংঘাত থাকবে না।
নদী ও আঞ্চলিক উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিগত ৫৪ বছরে দেশের নদীগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের অন্যান্য নদীগুলোকে প্রবাহমান করতে উদ্যোগ নেওয়া হবে। নদীর জীবন ফিরে এলে নর্থ বেঙ্গলের জীবনও ফিরে আসবে ইনশাআল্লাহ। আমাদের লক্ষ্য গোটা নর্থ বেঙ্গলকে একটি কৃষিভিত্তিক রাজধানীতে রূপান্তর করা।
সমাবেশে ডা. শফিকুর রহমান ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মর্যাদা রক্ষায় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জোয়ার তুলতে হবে। সেই হ্যাঁ ভোটের জোয়ারে অতীতের বস্তাপচা রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেসে যেতে হবে। হ্যাঁ ভোট জয়যুক্ত না হলে রংপুরের মেধাবী শিক্ষার্থী আবু সাঈদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। আবু সাঈদরা বুক পেতে দিয়েছিল স্বৈরাচার হটানোর জন্য।
গাইবান্ধা জেলার উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি ইপিজেড নির্মাণ, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন, বালাশীঘাট থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত টানেল নির্মাণ, প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গড়ে তোলা, রাজধানীর মতো শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং চরাঞ্চলের কৃষিপণ্য সংরক্ষণ করে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন।
জনসভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, জাগপা সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি জেনারেল সিগবাতুল্লাহ সিবগা, এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল ইসলাম জুয়েলসহ দশ দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা।
গাইবান্ধা-৩ (পলাশবাড়ী-সাদুল্লাপুর) আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী অধ্যক্ষ মাওলানা নজরুল ইসলাম লেবুর সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেন জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর ও গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ডা. আব্দুর রহিম সরকার, জেলা জামায়াতের আমীর ও গাইবান্ধা-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী আব্দুল করিম, নায়েবে আমীর ও গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী অধ্যাপক মাজেদুর রহমান, নায়েবে আমীর ও গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি-সাঘাটা) আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়ারেস, জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জহুরুল হক সরকার, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল, গাইবান্ধা জেলা শিবিরের সভাপতি ফেরদৌস সরকার রুম্মান এবং এলডিপির জেলা সভাপতি শরিফুল ইসলাম প্রমুখ।
জনসভা শেষে জামায়াতে ইসলামীর আমির আনুষ্ঠানিকভাবে গাইবান্ধার পাঁচটি সংসদীয় আসনের প্রার্থীদের হাতে দলীয় প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ তুলে দেন এবং তাদের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেন।