মিঠাপুকুরে বিষাক্ত গুড় তৈরির মহোৎসব: নেপথ্যে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট
আপডেট সময় :
২০২৬-০১-০৯ ১৪:৫২:৪৭
মিঠাপুকুরে বিষাক্ত গুড় তৈরির মহোৎসব: নেপথ্যে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট
রংপুর প্রতিনিধি:
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার শুকুরের হাট ও তৎসংলগ্ন এলাকা এখন বিষাক্ত ও ভেজাল গুড় তৈরির ‘অঘোষিত রাজধানী’। উপজেলার গেনার পাড়া ও ফুলচৌকি খামার পাড়া গ্রামের ঘরে ঘরে চিনি ও ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে তৈরি হচ্ছে ভেজাল গুড়, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আখের নামগন্ধহীন এই গুড় তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে কাপড়ের রং, চুন ও ক্যানসার সৃষ্টিকারী মারাত্মক সব কেমিক্যাল। অভিযোগ উঠেছে, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ‘মাসোয়ারা’ বাণিজ্যের কারণে প্রশাসনের নাকের ডগায় চলছে এই মরণঘাতী কারবার।
সরেজমিনে তদন্তে দেখা যায়, কারখানাগুলোতে আখের কোনো অস্তিত্ব নেই। চিনির সঙ্গে মেশানো হচ্ছে পচা মিষ্টির শিরা, টেক্সটাইল ডাই (কাপড়ের রং) এবং লিভার-কিডনি ধ্বংসকারী বিভিন্ন রাসায়নিক। নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উৎপাদিত এই বিষাক্ত মিশ্রণই বাজারে ‘খাঁটি আখের গুড়’ নামে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। মূলত আসন্ন রমজানকে কেন্দ্র করে এই অসাধু ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা বহুগুণ বেড়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ভেজাল কারবারের মূল নিয়ন্ত্রক মিল্লাত ট্রেডার্সের মালিক মুকুল মিয়া। স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি ক্ষুদ্র উৎপাদকদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ‘মাসোয়ারা’ হিসেবে পৌঁছে দেন। এই অদৃশ্য শক্তির প্রভাবেই বারবার অভিযান সত্ত্বেও কারখানাগুলো বন্ধ হচ্ছে না। বিএসটিআইয়ের কোনো অনুমোদন ছাড়াই রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভুয়া চালান ব্যবহার করে এই গুড় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
২০২১ সাল থেকে এ পর্যন্ত বেশ কয়েকবার অভিযান চালিয়ে কয়েক লক্ষ টাকা জরিমানা এবং প্রায় ৫০ লক্ষ টাকার মালামাল নষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু অভিযানের রেশ কাটতে না কাটতেই আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠে চক্রটি। স্থানীয় কৃষক সাইদুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রশাসন এসে জরিমানা করে যায়, কিন্তু দুদিন পরই আবার আগের মতো গুড় বানানো শুরু হয়। আমাদের চোখের সামনে মানুষকে বিষ খাওয়ানো হচ্ছে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভেজাল গুড় সেবনের ফলে দেশে ক্যানসার ও কিডনি রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন- ২০১৩’ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, শুধু জরিমানা নয়, এই অবৈধ কারখানাগুলো স্থায়ীভাবে গুঁড়িয়ে দিয়ে মালিকদের জেলহাজতে পাঠালেই এই মরণফাঁদ থেকে মুক্তি সম্ভব।
মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোঃ পারভেজ জানান, “আমি নতুন যোগ দিয়েছি। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য নিয়ে কাউকেই ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না। খুব শীঘ্রই কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন এই প্রভাবশালী সিন্ডিকেট ভেঙে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে কি না।
নিউজটি আপডেট করেছেন :
[email protected]
কমেন্ট বক্স