নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় অটোরিকশা আজ একটি অত্যন্ত পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত যানবাহন। শহর থেকে গ্রাম, অলিগলি থেকে মহাসড়কের সংযোগ সড়ক সবখানেই অটোরিকশার উপস্থিতি চোখে পড়ে। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, নারী, শিশু, প্রবীণ প্রতিদিন লাখো মানুষ এই যানবাহনের ওপর নির্ভর করে চলাচল করেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মানুষের যাতায়াত সহজ করার উদ্দেশ্যে চালু হওয়া এই যানবাহনের একটি বড় অংশ বর্তমানে অনিয়ন্ত্রিত, ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করেছে। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যম খুললেই কোথাও না কোথাও অটোরিকশা দুর্ঘটনায় প্রাণহানি, গুরুতর আহত বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের খবর দেখা যায়।
এসব দুর্ঘটনা কেবল সংখ্যা নয়; প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের কান্না, একটি স্বপ্নের মৃত্যু এবং রাষ্ট্রের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তাই এখন সময় এসেছে এই সংকটকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে নয়, বরং একটি জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করার। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অটোরিকশা চলাচলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাব আজ ভয়াবহ জননিরাপত্তা সংকটে রূপ নিয়েছে। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, কক্সবাজারসহ দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশার দৌরাত্ম্য দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। নির্ধারিত রুট উপেক্ষা করে চলাচল, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বেপরোয়া গতি, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং অবৈধ প্রতিযোগিতা যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা। প্রশাসনের চোখের সামনে এসব অনিয়ম চললেও কার্যকর ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান নয়।
ফলে প্রতিটি সড়ক ধীরে ধীরে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। আজ যদি কঠোর নিয়ন্ত্রণ, নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে অটোরিকশা দেশের অন্যতম বড় সড়ক নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হবে। তখন প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণহানি, পঙ্গুত্ব এবং অসহায় পরিবারের আহাজারি আমাদের জাতীয় ব্যর্থতার নির্মম সাক্ষী হয়ে থাকবে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক চালকের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। সড়ক আইন, ট্রাফিক সংকেত, নিরাপদ গতি কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান ছাড়াই অনেকেই যাত্রী পরিবহন করছেন। বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানোর ঘটনাও অস্বাভাবিক নয়। এর ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। একজন অদক্ষ চালকের হাতে একটি অটোরিকশা মুহূর্তেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত হতে পারে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো ফিটনেসবিহীন যানবাহন। অনেক অটোরিকশার ব্রেক, স্টিয়ারিং, টায়ার, লাইট কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ দীর্ঘদিন ধরে ত্রুটিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। নিয়মিত পরীক্ষা বা রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই এসব যান সড়কে চলাচল করছে। সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটিও কখনো কখনো বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ফিটনেস সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোরতা এবং নিয়মিত তদারকি অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে অনেক এলাকায় যাত্রী নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে চালকদের মধ্যে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখা যায়। আগে যাত্রী তুলতে গিয়ে হঠাৎ ব্রেক করা, বিপজ্জনকভাবে ওভারটেক করা, মোড়ে বেপরোয়া গতিতে প্রবেশ করা কিংবা চলন্ত অবস্থায় যাত্রী ওঠানো-নামানো এসব ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। কয়েক মিনিট সময় বাঁচানোর এই প্রবণতা অনেক সময় একটি পরিবারের সারাজীবনের শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অটোরিকশা স্ট্যান্ড ব্যবস্থাপনাও একটি বড় সমস্যা। অনেক এলাকায় সড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করে অবৈধ স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। এতে যানজট সৃষ্টি হয়, পথচারীদের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং জরুরি যানবাহনের পথও সংকুচিত হয়ে পড়ে। হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাজার এলাকার সামনে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা আরও বেশি দেখা যায়। এসব অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ এবং নির্ধারিত স্থান নির্ধারণ করা জরুরি। দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালকদের দায়ী করলেই হবে না; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কোথায় লাইসেন্সবিহীন চালক গাড়ি চালাচ্ছেন, কোথায় ফিটনেসবিহীন অটোরিকশা চলছে, কোথায় অবৈধ স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে এসব বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি থাকা উচিত।
আইন কাগজে-কলমে থাকলেই হবে না, তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো বড় দুর্ঘটনার পর কয়েকদিন অভিযান চালানো হয়, জরিমানা করা হয়, কিছু যানবাহন জব্দ করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পরই পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এই সাময়িক অভিযান সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ধারাবাহিক নজরদারি এবং কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা। সরকারের উচিত অটোরিকশা খাতকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা। নিবন্ধনবিহীন অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করতে হবে। চালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত দক্ষতা মূল্যায়ন এবং বৈধ লাইসেন্স নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি অটোরিকশার নির্দিষ্ট রুট, নম্বর এবং পরিচয় নিশ্চিত করলে আইন প্রয়োগ সহজ হবে। প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়াতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সিসিটিভি নজরদারি, ডিজিটাল ট্রাফিক মনিটরিং এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় জরিমানার ব্যবস্থা চালু করা গেলে শৃঙ্খলা অনেকাংশে ফিরে আসবে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ এবং সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অটোরিকশা চালকদের মানবিক দিকটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। অনেক চালক সীমিত আয়ের কারণে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালান। অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, ক্লান্তি এবং মানসিক চাপ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই তাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সচেতনতা কর্মসূচি এবং পেশাগত মানোন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে। অতিরিক্ত যাত্রী বহনকারী অটোরিকশায় না ওঠা, অতিরিক্ত গতিতে চালাতে উৎসাহ না দেওয়া, প্রয়োজনে আইন লঙ্ঘনের প্রতিবাদ করা এবং নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এসব ছোট ছোট পদক্ষেপ বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাড়ানো উচিত। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং নাগরিক সমাজকে এ বিষয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ নিরাপদ সড়ক কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। আজ উন্নয়নের নানা সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন সড়ক, সেতু, উড়ালসেতু এবং অবকাঠামো নির্মিত হচ্ছে। কিন্তু যদি সড়কে মানুষের জীবন নিরাপদ না থাকে, তবে সেই উন্নয়নের সুফল অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। উন্নত রাষ্ট্র গড়তে হলে নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে। এখন আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। যেসব অটোরিকশা ফিটনেসবিহীন, নিবন্ধনহীন কিংবা নিয়মিত আইন লঙ্ঘন করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ, প্রশিক্ষিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ চালকদের উৎসাহিত করতে হবে। সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে, একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না; এটি একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেয়, অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সমাজে দীর্ঘস্থায়ী বেদনার সৃষ্টি করে। তাই অটোরিকশা খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা আজ সময়ের দাবি নয়, জাতীয় প্রয়োজন। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। জনগণের জীবন রক্ষায় এখনই কঠোর, কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কারণ প্রতিটি নাগরিকের জীবন অমূল্য, আর সেই জীবন রক্ষার প্রশ্নে কোনো ধরনের অবহেলা কিংবা আপস করার সুযোগ নেই। লেখক মোস্তানছিরুল হক চৌধুরী যুগ্ম সদস্য সচিব- নাগরিক ছাত্র ঐক্য কেন্দ্রীয় সংসদ ই-মেইল:
বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন ব্যবস্থায় অটোরিকশা আজ একটি অত্যন্ত পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত যানবাহন। শহর থেকে গ্রাম, অলিগলি থেকে মহাসড়কের সংযোগ সড়ক সবখানেই অটোরিকশার উপস্থিতি চোখে পড়ে। কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, নারী, শিশু, প্রবীণ প্রতিদিন লাখো মানুষ এই যানবাহনের ওপর নির্ভর করে চলাচল করেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, মানুষের যাতায়াত সহজ করার উদ্দেশ্যে চালু হওয়া এই যানবাহনের একটি বড় অংশ বর্তমানে অনিয়ন্ত্রিত, ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রাণঘাতী রূপ ধারণ করেছে। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যম খুললেই কোথাও না কোথাও অটোরিকশা দুর্ঘটনায় প্রাণহানি, গুরুতর আহত বা স্থায়ী পঙ্গুত্বের খবর দেখা যায়।
এসব দুর্ঘটনা কেবল সংখ্যা নয়; প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে একটি পরিবারের কান্না, একটি স্বপ্নের মৃত্যু এবং রাষ্ট্রের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তাই এখন সময় এসেছে এই সংকটকে সাময়িক সমস্যা হিসেবে নয়, বরং একটি জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করার। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অটোরিকশা চলাচলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণের অভাব আজ ভয়াবহ জননিরাপত্তা সংকটে রূপ নিয়েছে। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, কক্সবাজারসহ দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশার দৌরাত্ম্য দিন দিন উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। নির্ধারিত রুট উপেক্ষা করে চলাচল, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বেপরোয়া গতি, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং অবৈধ প্রতিযোগিতা যেন নিত্যদিনের বাস্তবতা। প্রশাসনের চোখের সামনে এসব অনিয়ম চললেও কার্যকর ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান নয়।
ফলে প্রতিটি সড়ক ধীরে ধীরে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে। আজ যদি কঠোর নিয়ন্ত্রণ, নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে অটোরিকশা দেশের অন্যতম বড় সড়ক নিরাপত্তা সংকটে পরিণত হবে। তখন প্রতিদিন অসংখ্য প্রাণহানি, পঙ্গুত্ব এবং অসহায় পরিবারের আহাজারি আমাদের জাতীয় ব্যর্থতার নির্মম সাক্ষী হয়ে থাকবে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক চালকের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। সড়ক আইন, ট্রাফিক সংকেত, নিরাপদ গতি কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান ছাড়াই অনেকেই যাত্রী পরিবহন করছেন। বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানোর ঘটনাও অস্বাভাবিক নয়। এর ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। একজন অদক্ষ চালকের হাতে একটি অটোরিকশা মুহূর্তেই মৃত্যুফাঁদে পরিণত হতে পারে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো ফিটনেসবিহীন যানবাহন। অনেক অটোরিকশার ব্রেক, স্টিয়ারিং, টায়ার, লাইট কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ দীর্ঘদিন ধরে ত্রুটিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। নিয়মিত পরীক্ষা বা রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই এসব যান সড়কে চলাচল করছে। সামান্য যান্ত্রিক ত্রুটিও কখনো কখনো বড় দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ফিটনেস সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোরতা এবং নিয়মিত তদারকি অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে অনেক এলাকায় যাত্রী নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে চালকদের মধ্যে এক ধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা দেখা যায়। আগে যাত্রী তুলতে গিয়ে হঠাৎ ব্রেক করা, বিপজ্জনকভাবে ওভারটেক করা, মোড়ে বেপরোয়া গতিতে প্রবেশ করা কিংবা চলন্ত অবস্থায় যাত্রী ওঠানো-নামানো এসব ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটছে। কয়েক মিনিট সময় বাঁচানোর এই প্রবণতা অনেক সময় একটি পরিবারের সারাজীবনের শোকের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অটোরিকশা স্ট্যান্ড ব্যবস্থাপনাও একটি বড় সমস্যা। অনেক এলাকায় সড়কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ দখল করে অবৈধ স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে। এতে যানজট সৃষ্টি হয়, পথচারীদের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং জরুরি যানবাহনের পথও সংকুচিত হয়ে পড়ে। হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বাজার এলাকার সামনে এ ধরনের বিশৃঙ্খলা আরও বেশি দেখা যায়। এসব অবৈধ স্ট্যান্ড উচ্ছেদ এবং নির্ধারিত স্থান নির্ধারণ করা জরুরি। দুর্ঘটনার জন্য শুধু চালকদের দায়ী করলেই হবে না; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। কোথায় লাইসেন্সবিহীন চালক গাড়ি চালাচ্ছেন, কোথায় ফিটনেসবিহীন অটোরিকশা চলছে, কোথায় অবৈধ স্ট্যান্ড গড়ে উঠেছে এসব বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি থাকা উচিত।
আইন কাগজে-কলমে থাকলেই হবে না, তার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো বড় দুর্ঘটনার পর কয়েকদিন অভিযান চালানো হয়, জরিমানা করা হয়, কিছু যানবাহন জব্দ করা হয়। কিন্তু কিছুদিন পরই পরিস্থিতি আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়। এই সাময়িক অভিযান সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ধারাবাহিক নজরদারি এবং কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা। সরকারের উচিত অটোরিকশা খাতকে একটি সুশৃঙ্খল কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসা। নিবন্ধনবিহীন অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করতে হবে। চালকদের বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, নিয়মিত দক্ষতা মূল্যায়ন এবং বৈধ লাইসেন্স নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিটি অটোরিকশার নির্দিষ্ট রুট, নম্বর এবং পরিচয় নিশ্চিত করলে আইন প্রয়োগ সহজ হবে। প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়াতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে সিসিটিভি নজরদারি, ডিজিটাল ট্রাফিক মনিটরিং এবং আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় জরিমানার ব্যবস্থা চালু করা গেলে শৃঙ্খলা অনেকাংশে ফিরে আসবে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ এবং সিটি করপোরেশনের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। অটোরিকশা চালকদের মানবিক দিকটিও বিবেচনায় রাখা জরুরি। অনেক চালক সীমিত আয়ের কারণে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালান। অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা, ক্লান্তি এবং মানসিক চাপ দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই তাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, সচেতনতা কর্মসূচি এবং পেশাগত মানোন্নয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। যাত্রীদেরও সচেতন হতে হবে। অতিরিক্ত যাত্রী বহনকারী অটোরিকশায় না ওঠা, অতিরিক্ত গতিতে চালাতে উৎসাহ না দেওয়া, প্রয়োজনে আইন লঙ্ঘনের প্রতিবাদ করা এবং নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দেওয়া এসব ছোট ছোট পদক্ষেপ বড় পরিবর্তন আনতে পারে। বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচি বাড়ানো উচিত। গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং নাগরিক সমাজকে এ বিষয়ে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ নিরাপদ সড়ক কেবল সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি পুরো সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব। আজ উন্নয়নের নানা সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন সড়ক, সেতু, উড়ালসেতু এবং অবকাঠামো নির্মিত হচ্ছে। কিন্তু যদি সড়কে মানুষের জীবন নিরাপদ না থাকে, তবে সেই উন্নয়নের সুফল অনেকটাই ম্লান হয়ে যায়। উন্নত রাষ্ট্র গড়তে হলে নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে। এখন আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। যেসব অটোরিকশা ফিটনেসবিহীন, নিবন্ধনহীন কিংবা নিয়মিত আইন লঙ্ঘন করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বৈধ, প্রশিক্ষিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ চালকদের উৎসাহিত করতে হবে। সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। মনে রাখতে হবে, একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না; এটি একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দেয়, অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং সমাজে দীর্ঘস্থায়ী বেদনার সৃষ্টি করে। তাই অটোরিকশা খাতে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা আজ সময়ের দাবি নয়, জাতীয় প্রয়োজন। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। জনগণের জীবন রক্ষায় এখনই কঠোর, কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কারণ প্রতিটি নাগরিকের জীবন অমূল্য, আর সেই জীবন রক্ষার প্রশ্নে কোনো ধরনের অবহেলা কিংবা আপস করার সুযোগ নেই। লেখক মোস্তানছিরুল হক চৌধুরী যুগ্ম সদস্য সচিব- নাগরিক ছাত্র ঐক্য কেন্দ্রীয় সংসদ ই-মেইল: