বিশেষ প্রতিবেদক
দেশে সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর মজুত প্রায় শেষের পথে। পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রীর ক্ষেত্রে অন্তত ছয় মাসের বাফার স্টক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে জন্মনিয়ন্ত্রণের বড়ি, ইনজেকশন, ইমপ্লান্ট, আইইউডি ও কনডম-কোনোটিরই পর্যাপ্ত মজুত নেই। দেশজুড়ে সরকারিভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর সরবরাহ সংকটে জন্মহার বাড়ার শঙ্কা বাড়ছে। দীর্ঘ দেড় বছরেরও বেশি সময় ধরে চলছে এ সংকট। ফলে ইতিমধ্যে দেশে পাঁচ ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণের সরবরাহ প্রায় ৭৮ শতাংশ কমে গেছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মাঠপর্যায় থেকে চাহিদা দিলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অর্থাভাব ও ক্রয় প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে সময়মতো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। মূলত অর্থ সংকট, ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা এবং বাজেট বাস্তবায়নের বিলম্বের কারণে সরকারিভাবে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সরবরাহে তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এতে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার কমে যাওয়া এবং প্রজনন হার বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তাতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি এবং ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভধারণের সংখ্যাও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশের শত শত উপজেলায় এখন মজুত শূন্য। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ৩৭৮টি উপজেলায় কনডম নেই, ৩৬৭টি উপজেলায় ওরাল পিলের মজুত শেষ। ৪১৮টি উপজেলায় জরুরি জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি (ইসিপি) নেই। ৩১১টি উপজেলায় তিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি সুরক্ষাদানকারী ইমপ্লান্ট নেই এবং ৩৯৭টি উপজেলায় ১০ বছর কার্যকর আইইউডি নেই। এছাড়া ৪৭৭টি উপজেলায় ইনজেক্টেবল জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর মজুতও শেষ হয়ে গেছে। শুধু জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণ নয়, অধিকাংশ উপজেলায় এখন মজুতশূন্য মাতৃস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় মিসোপ্রোস্টল, অক্সিটোসিন, আয়রন-ফলিক অ্যাসিড ও ম্যাগনেসিয়াম সালফেটের মতো ওষুধও।
সরকারি খাত থেকে দেশের সক্ষম দম্পতিদের প্রায় ৩৭ শতাংশ জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী পেয়ে থাকে। এনজিওদের কাছ থেকে পায় ৩ শতাংশ এবং বাকি ৬০ শতাংশ বেসরকারি খাত থেকে সংগ্রহ করে। বর্তমানে সরকারিভাবে পাঁচ ধরনের জন্মনিয়ন্ত্রণ উপকরণের মধ্যে ইনজেক্টেবলের সরবরাহ পাঁচ লাখে নেমে এসেছে। ২০২২ সালে যা ছিল ১১ লাখ ৪০ হাজার-প্রায় ৫৬ শতাংশ কমেছে। মুখে খাওয়ার পিলের সরবরাহ ৮৮ লাখ ৯০ হাজার থেকে কমে হয়েছে ১৮ লাখ ৯০ হাজার-প্রায় ৭৯ শতাংশ কম। ইমপ্লান্টের সরবরাহ ২৯ লাখ ৮৩ হাজার থেকে মাত্র ৯ হাজার ৭৫২টিতে নেমেছে-প্রায় ৯৭ শতাংশ কম। জরায়ুর ভেতরে স্থাপনযোগ্য গর্ভনিরোধক যন্ত্র (আইইউডি) ১৯ হাজার ৬৯১ থেকে কমে ৭ হাজার ২৮৩ হয়েছে-প্রায় ৬৩ শতাংশ কম। সরকারি সেবার এমন অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে দেশের জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনায় বিরূপ প্রভাব পড়ার ঝুঁকি বাড়বে।
বিনামূল্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং স্যাটেলাইট ক্লিনিকে সাধারণত কনডম, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, ইনজেকশন, ইমপ্লান্টসহ বিভিন্ন পরিবার পরিকল্পনা সামগ্রী সরবরাহ করা হয়। কিন্তু বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠানে তীব্র সংকট বিরাজ করছে। ফলে প্রয়োজনীয় সামগ্রী না পেয়ে সেবাগ্রহীতারা অনেকেই বাজার থেকে টাকা দিয়ে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে নিয়মিতভাবে এসব সামগ্রী পাওয়া গেলে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ বিশেষভাবে উপকৃত হন।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সাধারণত দরিদ্র মানুষ জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সংগ্রহ করেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানে সংকট দেখা দিলে প্রয়োজনের সময় তাঁরা দোকান থেকে কিনবেন-এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে দরিদ্র পরিবারগুলোতে বাড়তে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ঝুঁকি। পাশাপাশি জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সংগ্রহের সময় মানুষ সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে কিছু স্বাস্থ্যসেবা বা পরামর্শও নিয়ে থাকেন। আগে স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) আওতায় অপারেশন প্ল্যান (ওপি) থেকে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও মাতৃস্বাস্থ্যের জরুরি উপকরণ কেনা হতো। তবে ২০২৫ সালে ওপি ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নতুন প্রকল্প অনুমোদন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ এবং অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হয়। ফলে কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে ক্রয় কার্যক্রম। জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী সংকটের কারণে প্রজনন হার বাড়ার শঙ্কা রয়েছে। ১৯৮১ সালে দেশে মোট প্রজনন হার (টিএফআর) ছিল ৫ দশমিক ০৭। ১৯৯৪ সালে তা কমে ৩-এ নেমে আসে। ২০১২ সালে তা ছিল ২ দশমিক ৩ এবং ২০২২ সাল পর্যন্ত একই অবস্থায় ছিল। সাম্প্রতিক জরিপে এটি কিছুটা বেড়ে ২ দশমিক ৪-এ উন্নীত হয়েছে বলে জানা গেছে।
জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর একটি পূর্ণাঙ্গ ক্রয়চক্র সম্পন্ন করতে কমপক্ষে ১২০ দিন সময় লাগে। কিন্তু তা সময়মতো শুরু করা সম্ভব হয়নি। ২০২৩ সাল থেকেই এ সংকট দেখা দেয়। সর্বশেষ ওপি বন্ধ হয়ে গেলে সংকট প্রকট হয়। তবে সংকট মোকাবিলায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী কেনার জন্য এক হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ওই অর্থ দিয়ে কনডম, পিল, ইনজেকশন, ইমপ্লান্ট, আইইউডিসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনা হবে। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; সময়মতো ক্রয়, পর্যাপ্ত মজুত এবং কার্যকর সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি।
এ প্রসঙ্গে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. জিন্নাত রেহানা জানান, “২০২৩ সালে জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর বড় ধরনের ক্রয়ের অনুমোদন না পাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হয়। ২০২৪ সালের জুনে অপারেশন প্ল্যান (ওপি) মেয়াদোত্তীর্ণ হলে সংকট আরও তীব্র রূপ নেয়। তবে সরকার নতুন করে বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে এবং এ খাতে উল্লেখযোগ্য অর্থ সংস্থান করা হয়েছে। আমরা দ্রুত ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মাঠপর্যায়ে সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা করছি।”
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অর্থ ছাড় ও প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্বের কারণে সংকট দীর্ঘায়িত হয়েছে। এখন নতুন প্রকল্প অনুমোদন হয়েছে এবং ক্রয় প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। আশা করা যাচ্ছে, কয়েক মাসের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।”
জনসংখ্যা ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, “জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রীর চাহিদা কমে যায়নি। কিন্তু সামগ্রী হাতের কাছে না পেলে জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনায় সমস্যা সৃষ্টির আশঙ্কা আছে। সরকারি সরবরাহ ব্যবস্থা দুর্বল হলে দরিদ্র মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ বাড়লে মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়ে।”
আরেক বিশেষজ্ঞ ডা. নাসির আহমেদ বলেন, “পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি একসময় দেশের অন্যতম সফল কর্মসূচি ছিল। কিন্তু ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘসূত্রতা এবং অগ্রাধিকারের অভাবের কারণে এখন সংকট তৈরি হয়েছে। মাঠকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেবা দিতে পারেন না, কারণ তাঁদের হাতে সামগ্রী নেই। এতে কর্মসূচির বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষুণ্ন হচ্ছে।”
পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের লজিস্টিকস ও সাপ্লাই ইউনিটের পরিচালক মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, “আমরা জরুরি ভিত্তিতে কিছু সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি। ওরাল পিল ও কনডমের কিছু অংশ শিগগিরই মাঠপর্যায়ে পৌঁছাবে। তবে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক করতে আরও কিছু সময় লাগবে।”
মাঠপর্যায়ের একজন পরিবার কল্যাণ কর্মী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, “আগে নিয়মিত সামগ্রী পেতাম। এখন কয়েক মাস ধরে হাতে কিছুই নেই। গ্রামের মানুষ এসে জিজ্ঞাসা করেন, আমরা লজ্জায় পড়ি। অনেকে বাজার থেকে কিনতে পারেন না। ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের খবর পাচ্ছি।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সংকট মোকাবিলায় শুধু বাজেট বরাদ্দই যথেষ্ট নয়। সময়মতো ক্রয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা, সরবরাহ শৃঙ্খল শক্তিশালী করা, মাঠকর্মীদের সক্রিয় রাখা এবং বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো জরুরি। অন্যথায় দেশের দীর্ঘদিনের পরিবার পরিকল্পনা সাফল্য হুমকির মুখে পড়তে পারে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপ অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।