কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি
ঈদ মানেই নতুন পোশাক, রঙিন মুহূর্ত আর সুস্বাদু খাবারের আয়োজন। তবে সেই চিরচেনা আনন্দকে ভিন্ন স্বাদে রাঙিয়ে তুলেছে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার তুমলিয়া ইউনিয়নের ফিরিন্দা গ্রামের এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ-“দু’নয়নের ভর্তা উৎসব”।
পবিত্র ঈদুল ফিতরের তৃতীয় দিন, সোমবার (২৩ মার্চ) সকাল থেকে দিনব্যাপী ফিরিন্দা গ্রামে অনুষ্ঠিত এ উৎসব যেন বাঙালির চিরায়ত খাদ্যসংস্কৃতিকে নতুনভাবে তুলে ধরার এক প্রাণবন্ত আয়োজন হয়ে ওঠে। আর এই ভর্তা উৎসব কে কেন্দ্র করে ফিরিন্দা গ্রামের পোড়াবাড়ি সেজেছিল ভিন্ন রকম একসাথে। বাঙালি আর ঐতিহ্যের ছোঁয়া।
যেখানে ঈদের খাবারের তালিকায় সাধারণত মাংস, পোলাও কিংবা রিচ খাবারের প্রাধান্য থাকে, সেখানে ভর্তাকে কেন্দ্র করে এমন বিশাল আয়োজন ছিল সত্যিই ব্যতিক্রম। এক-দুই ধরনের নয়, বরং প্রায় অর্ধশতাধিক ভর্তার সমাহার সাজানো হয় সারিবদ্ধ টেবিলে-যা দর্শনার্থীদের কাছে ছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
আলু, বেগুন, ইলিশ, শুঁটকি, সিম, ধুন্দুল, কচুর মুখি, পটল, পুঁইশাক, মুগ ডাল, বাঁধাকপি, পেঁপে-সরিষা, কচু, কাঁঠাল বিচি, লাল মরিচ, কাঁচা মরিচ, ঢেঁড়স, বরবটি, বাদাম, রসুন, ডিম, লাউ পাতা, মসুর ডাল, মিষ্টি কুমড়া, টমেটো, কালোজিরা, তিল, তিসি, ধনিয়া পাতা, করলা, কাঁচকলা, পেঁয়াজ, চিংড়ি, শিং, শোল, টাকি-এমন নানা উপাদানে তৈরি ভর্তা যেন গ্রামীণ রান্নার ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রদর্শনী হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে পরিবেশন করা হয় খুদের ভাত, যা উৎসবের স্বাদকে আরও বাড়িয়ে দেয়।
ফিরিন্দা ও সানাইয়া যুব সমাজের উদ্যোগে, ‘দু’নয়ন কল্যাণ ট্রাস্ট’ ও ‘দু’নয়ন স্পোর্টিং ক্লাব’-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ উৎসব শুধু খাবারেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি হয়ে ওঠে স্মৃতি, আবেগ আর সামাজিক বন্ধনের এক মিলনমেলা।
উপজেলার বোয়ালী গ্রাম থেকে আসা দর্শনার্থী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “এমন আয়োজন আগে দেখিনি। ছোটবেলার গ্রামের স্বাদ যেন আবার ফিরে পেলাম।”
অন্যদিকে কালীগঞ্জ পৌরসভার মুনশুরপুর থেকে আসা মো. মেহেদী হাসান জানান, “ঈদের আনন্দকে এই আয়োজন ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।”
উৎসবের উদ্যোক্তা খায়রুল ইসলাম নয়ন বলেন, “আমাদের লক্ষ্য ছিল বাঙালির ঐতিহ্যবাহী ভর্তাকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা এবং সামাজিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করা।”
স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। স্থানীয় ইব্রাহিম মিয়া ও মাহবুব হোসেন বাবলু বলেন, “মানুষকে একত্রিত করে, সম্পর্ক গড়ে তোলে-যা বর্তমান সময়ে খুবই প্রয়োজন।”
ফিরিন্দার তরুণ ইমরান হোসেন মনে করেন, “আমাদের সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে এমন আয়োজন জরুরি। ভবিষ্যতেও আমরা এটি চালিয়ে যেতে চাই।”
সমাজসেবক মোহাম্মদ নাজমুল হাই মামুনের ভাষায়, “এটি শুধু খাবারের উৎসব নয়, বরং আমাদের ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির প্রতিচ্ছবি।”
সব মিলিয়ে, “দু’নয়নের ভর্তা উৎসব” প্রমাণ করেছে-আনন্দের জন্য আড়ম্বর নয়, প্রয়োজন আন্তরিকতা, ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসা এবং একসঙ্গে থাকার মানসিকতা। ভর্তার সরল স্বাদই এখানে ছড়িয়ে দিয়েছে গভীর সম্প্রীতির এক উষ্ণ বার্তা।