সংসদের শোক প্রস্তাবে নেই সিলেটের বর্ষীয়ান নেতাদের নাম, বিভাগ জুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া

আপলোড সময় : ১৪-০৩-২০২৬ ০২:১৩:১৩ অপরাহ্ন , আপডেট সময় : ১৪-০৩-২০২৬ ০২:১৩:১৩ অপরাহ্ন


এস. এম. জালাল উদ্দীন, মৌলভীবাজার জেলা প্রতিনিধিঃ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে প্রয়াত ৩১ জন সংসদ সদস্যের স্মরণে শোক প্রস্তাব গৃহীত হলেও সেখানে সিলেটের কয়েকজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রী-সংসদ সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় সিলেটজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিষয়টি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) জাতীয় সংসদের স্পিকার আবদুল হাফিজ-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনের শুরুতেই প্রয়াত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের স্মরণে শোক প্রস্তাব পাঠ করা হয়। সংসদের প্রথম দিনের এ অধিবেশনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াসহ দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, সাবেক রাষ্ট্রপতি, সারাদেশের সাবেক সংসদ সদস্য এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহিদদের স্মরণে শোক প্রস্তাব আনা হয়।

তবে শোক প্রস্তাবে সিলেট অঞ্চলের কোনো বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, কবি-সাহিত্যিক বা সমাজসেবকের নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম সফল অর্থমন্ত্রীসহ কয়েকজন অভিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানের নাম অনুপস্থিত থাকায় এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।

সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের নামও শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তিনি দেশের ইতিহাসে ১২ বার জাতীয় বাজেট পেশকারী একজন প্রাজ্ঞ ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থমন্ত্রী হিসেবে পরিচিত। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে মুক্তবাজার অর্থনীতি, ভ্যাট ব্যবস্থা চালু, শিল্পায়ন ও আর্থিক খাত সংস্কারের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির ভিত মজবুত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

সাবেক এমপি হারিছ চৌধুরী

শোক প্রস্তাবে স্থান পায়নি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সচিব ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হারিছ চৌধুরীর নামও। তিনি বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। জকিগঞ্জ-কানাইঘাট এলাকায় বিদ্যুৎ ও শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে বলে স্থানীয়রা উল্লেখ করেন।

সাবেক এমপি এম ইলিয়াস আলী

শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি নিখোঁজ বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য এম ইলিয়াস আলীর নামও। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে তিনি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ভারতীয় সীমান্ত আগ্রাসন ও টিপাইমুখ বাঁধের বিরুদ্ধে জনমত গঠনের ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে তিনি নিখোঁজ হন, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি আলোচিত ঘটনা।

সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরী

চারবারের সংসদ সদস্য ও চারদলীয় জোট সরকারের সাবেক প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরীর নামও শোক প্রস্তাবে স্থান পায়নি। তিনি খাদ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে তথ্য মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।

তার নির্বাচনি এলাকা মৌলভীবাজার-১ (বড়লেখা-জুড়ী) আসনে শিক্ষা ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে তার অবদান স্থানীয় মানুষের কাছে এখনো স্মরণীয়। আইনজ্ঞ ও রাজনীতিবিদ হিসেবে দেশ-বিদেশে তিনি সুপরিচিত ছিলেন।

এ ছাড়া শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি সিলেট-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক দিলদার হোসেন সেলিম, যুক্তরাজ্য বিএনপির সভাপতি ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মরহুম কমর উদ্দিনসহ নিখোঁজ ছাত্রদল নেতা ইফতেখার হোসেন দিনারের নাম।

প্রতিক্রিয়া

শোক প্রস্তাবে এসব বর্ষীয়ান নেতাদের নাম অন্তর্ভুক্ত না হওয়ায় সিলেট অঞ্চলের মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের জন্য যাদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য, সময়ের প্রবাহে তাদের অনেকের অবদান যেন ধীরে ধীরে আড়াল হয়ে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি, জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের আহ্বায়ক, কবি ও বাচিকশিল্পী সালেহ আহমেদ খসরু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে একটি কবিতার মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি লেখেন—

“ভাই ওয়াসিম, আমি কেবল কাঁদতে জানি
বদলাতে জানিও না পারার প্রশ্ন কোথায়
আবারও আজ শুধুই কাঁদি, কেবল কাঁদি
ভালো থেকো জ্বলজ্বল কর অনির্বাণ শিখায়
এইটুকু শিখেছি—বলে দিলাম, এই অমাবস্যায়।”

তিনি বলেন, বিষয়টি হয়তো ইচ্ছাকৃত নয়, কিন্তু তবুও এটি অনেককে ব্যথিত করেছে। শহিদদের সম্মান কমে না, তবুও প্রশ্ন থেকে যায়।

অন্যদিকে কাতার বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও মৌলভীবাজার জেলা বিএনপির সাবেক উপদেষ্টা শরীফুল হক সাজু বলেন, মৌলভীবাজারসহ পুরো সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে সাবেক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট এবাদুর রহমান চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী ও সম্মানিত একজন রাজনীতিবিদ। তার নির্বাচনি এলাকায় শিক্ষা ও সড়ক উন্নয়নে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় সংসদের বহুল আলোচিত এই অধিবেশনে তার মতো একজন বর্ষীয়ান নেতার নাম শোক প্রস্তাবে না থাকা শুধু বড়লেখা-জুড়ী নয়, পুরো সিলেটবাসীর জন্যই কষ্টের বিষয়।

শরীফুল হক সাজু আশা প্রকাশ করে বলেন, আগামী সংসদ অধিবেশনে সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান, নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলী, সাবেক মন্ত্রী এবাদুর রহমান চৌধুরী ও হারিছ চৌধুরীসহ সিলেটের বর্ষীয়ান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের যথাযথ সম্মান জানিয়ে শোক প্রস্তাব গৃহীত হবে।

সম্পাদকীয় :

প্রকাশক ও সম্পাদক

মোঃ গোলাম মাওলা শাওন

মোবাইল : ০১৭১১-০০৬২১৪

অফিস :

প্রধান কার্যালয়


৩১/১ শরীফ কমপ্লেক্স দশম তলা পুরানা পল্টন ঢাকা ১০০০

মোবাইল : ০১৯৯৯-৯৫৩৯৭০

ই-মেইল : [email protected]