মোঃ আব্দুল্লাহ আল মুকিম রাজু
আজ পবিত্র শবে বরাত। শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত এই রাত গ্রামবাংলার মানুষের কাছে শুধু একটি ধর্মীয় উপলক্ষ নয়—এটি স্মৃতি, আবেগ, বিশ্বাস আর মানবিকতার এক গভীর মিলনমেলা। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রামের আকাশে অন্যরকম নীরবতা নেমে আসে। মসজিদের মাইক থেকে ভেসে আসে কোরআন তিলাওয়াতের সুর, আর ঘরে ঘরে শুরু হয় ইবাদত ও দোয়ার প্রস্তুতি।
বয়স্করা নামাজের জায়নামাজ পেতে বসেন, তরুণরা কোরআন শরিফ হাতে নেয়, আর মায়েরা রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়েন রুটি আর হালুয়া তৈরিতে। শবে বরাতের এই রাত গ্রামবাংলায় প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এমনভাবেই পালিত হয়ে আসছে।
ক্ষমা ও ভাগ্যলেখার রাত
ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পবিত্র রাতে মহান আল্লাহ তায়ালা বান্দার গুনাহ মাফ করেন এবং আগামী এক বছরের হায়াত-মউত, রিজিক ও তাকদির নির্ধারণ করেন। তাই গ্রামের সাধারণ মানুষ এই রাতটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পালন করেন। অনেকেই চোখের জলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, কেউ দোয়া করেন সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে, কেউ আবার অসুস্থ স্বজনের সুস্থতা কামনা করেন।
কবরস্থানে নীরব কান্না
শবে বরাতের রাতে গ্রামের কবরস্থানগুলোও হয়ে ওঠে জীবন্ত। হাতে মোমবাতি বা মোবাইলের আলো নিয়ে মানুষ প্রিয়জনের কবর জিয়ারতে যান। নিঃশব্দে হাত তুলে দোয়া করেন—“হে আল্লাহ, তাদের কবরকে জান্নাতের বাগান বানিয়ে দাও।” এই দৃশ্য গ্রামবাংলার শবে বরাতের এক আবেগঘন অধ্যায়।
বাড়ি বাড়ি রুটি–হালুয়া: গ্রামীণ মানবিকতার অনন্য রূপ
গ্রামবাংলায় শবে বরাত মানেই রুটি আর হালুয়ার ঘ্রাণে ভরা রাত। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই সাদা আটা দিয়ে রুটি বানানো হয়, সঙ্গে মিষ্টি হালুয়া। এই খাবার শুধু নিজের পরিবারের জন্য নয়—প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, গরিব মানুষ আর পথচারীদের জন্যও রাখা হয়।
অনেক এলাকায় শিশু-কিশোররা দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি গিয়ে রুটি–হালুয়া সংগ্রহ করে। কারও হাতে প্লাস্টিকের থলে, কারও হাতে গামছা। হাসি, দৌড়ঝাঁপ আর কোলাহলে গ্রামের রাত হয়ে ওঠে উৎসবমুখর। বৃদ্ধরা বলেন, “এই রীতি আমাদের শৈশবের স্মৃতি, এটা ভালোবাসার বন্ধন।”
দান-সদকা ও সহমর্মিতা
শবে বরাতকে কেন্দ্র করে অনেক পরিবার দরিদ্র মানুষকে খাবার, কাপড় কিংবা নগদ অর্থ দান করেন। কেউ চুপিচুপি চাল-ডাল দিয়ে যান প্রতিবেশীর ঘরে, কেউ মসজিদে সদকা রেখে আসেন। এতে গ্রামের সামাজিক বন্ধন আরও শক্ত হয়।
ধর্মীয় আলেমদের আহ্বান
স্থানীয় আলেমরা বলেন, শবে বরাতের মূল শিক্ষা হলো আত্মশুদ্ধি ও ইবাদত। আতশবাজি, উচ্চ শব্দ বা অপচয় পরিহার করে ইবাদত, দোয়া ও মানবিক কাজে অংশ নেওয়াই এই রাতের প্রকৃত সৌন্দর্য।
শেষ কথা
শবে বরাত গ্রামবাংলায় শুধু একটি রাত নয়—এটি বিশ্বাসের আলো, স্মৃতির কান্না, আর রুটি–হালুয়ার ভাগাভাগির মধ্য দিয়ে ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়ার এক মানবিক অধ্যায়। এই পবিত্র রাতে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও কল্যাণ কামনায় আল্লাহর দরবারে দোয়া করছেন ধর্মপ্রাণ মানুষ।