ক্ষমতার বারান্দায় সাংবাদিকতার আসন নয়
ক্ষমতার বারান্দায় সাংবাদিকতার আসন নয়
লেখক: মাহফুজ রাজা সাংবাদিকতা কি এখন সত্য বলার পেশা, নাকি সম্পর্ক রক্ষার কৌশল? প্রশ্নটি অস্বস্তিকর, কিন্তু সময় এসেছে প্রশ্নটি করার। কারণ, যে সমাজে সাংবাদিকের হাতে কলমের চেয়ে ফুলের তোড়া বেশি মানিয়ে যায়, সে সমাজে সংবাদপত্রের কালি ধীরে ধীরে ফিকে হতে শুরু করে। একজন সরকারি কর্মকর্তার পদোন্নতি অবশ্যই তাঁর কর্মজীবনের সাফল্য। সেই খবর প্রকাশ করা সাংবাদিকের দায়িত্ব।
কিন্তু সেই সংবাদ প্রকাশের পর দল বেঁধে ফুল নিয়ে অভিনন্দন জানানো কি সাংবাদিকতার নৈতিক দায়িত্ব? নাকি এটি এমন এক সংস্কৃতি, যেখানে সৌজন্যের আড়ালে নিরপেক্ষতা নীরবে বিদায় নেয়? সাংবাদিক রাষ্ট্রের কর্মচারী নন, কোনো কর্মকর্তার শুভেচ্ছাদূতও নন। তিনি জনগণের প্রতিনিধি। তাঁর দায়িত্ব ক্ষমতার প্রশংসা করা নয়; ক্ষমতাকে জবাবদিহির আওতায় রাখা।
অথচ আজ অনেক জায়গায় মনে হয়, সংবাদ সংগ্রহের চেয়ে সম্পর্ক সংগ্রহই যেন বড় হয়ে উঠেছে। কিছু সাংবাদিকের দিন শুরু হয় সরকারি দপ্তরে, শেষও হয় সরকারি দপ্তরে। দেখে মনে হয়, নিউজরুম নয়—অফিসের বারান্দাই যেন তাঁদের স্থায়ী কর্মস্থল। চায়ের কাপ বদলায়, আড্ডার সঙ্গী বদলায়, কিন্তু চেয়ার বদলায় না। এমন দৃশ্য যখন সাধারণ মানুষ প্রতিদিন দেখে, তখন তারা প্রশ্ন করতেই পারে—যিনি প্রতিদিন ক্ষমতার পাশে বসেন, তিনি কি সত্যিই ক্ষমতার বিরুদ্ধে লিখতে পারবেন? একটি পুরোনো প্রবাদ আছে—"যার লবণ খাও, তার বিরুদ্ধে কথা বলা কঠিন।" বাস্তবতাও তাই বলে। যে হাত থেকে ফুল গ্রহণ করা হয়, সেই হাতের অনিয়ম নিয়ে কলম চালাতে অনেকের হাত কেঁপে ওঠে।
তখন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা হারিয়ে যায়, জায়গা নেয় তোষামোদ। একসময় সাংবাদিকের নাম শুনলে মানুষ শ্রদ্ধায় মাথা নত করত। কারণ, সাংবাদিক ছিলেন ভয়হীন। তিনি সুবিধার জন্য নয়, সত্যের জন্য পরিচিত ছিলেন। মামলা হয়েছে, হুমকি এসেছে, চাকরি গেছে—তবু কলম বিক্রি হয়নি। আজ সেই সম্মান কমেছে কেন? কারণ, কিছু মানুষ সাংবাদিকতাকে পেশা নয়, পরিচয়ের ব্যবসায় পরিণত করেছেন। প্রেসকার্ডকে ব্যবহার করছেন প্রভাব বিস্তারের অস্ত্র হিসেবে। ফলে একজনের ভুলের দায় বইতে হচ্ছে শত শত সৎ সাংবাদিককে। এখানে একটি কঠিন সত্য বলতেই হয়—যে মানুষ নিজের লোভকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, সে কখনোই স্বাধীন সাংবাদিক হতে পারে না। ক্ষুধা থাকা অপরাধ নয়; কিন্তু যদি সেই ক্ষুধা বিবেককে খেয়ে ফেলে, তাহলে সাংবাদিকতা আর জনসেবা থাকে না, সেটি হয়ে যায় ব্যক্তিসেবার মাধ্যম।
সাংবাদিকের সবচেয়ে বড় পুঁজি কোনো মন্ত্রী, এমপি, ইউএনও, ডিসি বা এসপির ফোন নম্বর নয়। তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসই তাঁকে সম্মান দেয়, সাহস দেয়, গ্রহণযোগ্যতা দেয়। আর সেই বিশ্বাস একবার হারিয়ে গেলে, হাজার প্রেসকার্ড, শত ফুলের তোড়া কিংবা ক্ষমতাবানদের সঙ্গে হাজার ছবি তুলেও তা ফিরিয়ে আনা যায় না। ভালো কাজের প্রশংসা করুন, উন্নয়নের সংবাদ প্রকাশ করুন, সফল কর্মকর্তার সাফল্য তুলে ধরুন—এগুলোই সাংবাদিকতার দায়িত্ব। কিন্তু এমন কোনো সংস্কৃতির অংশ হবেন না, যেখানে সাংবাদিক আর ক্ষমতার মধ্যকার প্রয়োজনীয় দূরত্ব হারিয়ে যায়। মনে রাখবেন, সাংবাদিকের কলম যদি ক্ষমতার দিকে ঝুঁকে পড়ে, তবে জনগণের কণ্ঠস্বর নিঃশব্দ হয়ে যায়। ইতিহাস সাক্ষী—যে সাংবাদিক ক্ষমতার খুব কাছে গেছেন, তিনি হয়তো সাময়িক সুবিধা পেয়েছেন; কিন্তু জনগণের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারেননি। আর যিনি সত্যের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তিনি হয়তো কষ্ট পেয়েছেন, কিন্তু সময় তাঁকেই সম্মান দিয়েছে।
ফুল শুকিয়ে যায়, পদোন্নতি বদলে যায়, ক্ষমতার চেয়ারও একদিন অন্যের হয়। কিন্তু একজন নির্ভীক সাংবাদিকের লেখা ইতিহাসের পাতায় থেকে যায়।
নিউজটি আপডেট করেছেন : lifestyledesign847@gmail.com
কমেন্ট বক্স